“হারিয়ে যাবার মানেই হলো, নিজেকে আবার খুঁজে পাওয়া”, আমার যাত্রাপথে অর্নবের এই গানটা শুনছিলাম, আর মনে হচ্ছিল আসলেই যেন আমি নিজেকেই খুঁজে পাচ্ছি। কারণটা হলো, আমার এই যাত্রা ছিল অনেকটা নিরুদ্দেশ যাত্রার মতই। মাত্র মাস তিনেক আগে, গত মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে আমার এ যাত্রা শুরু হয় অনেকটা হঠাৎ করেই।
সাধারণত বড় কোন ভ্রমণে বের হবার আগে আমাদের বেশ কিছু জিনিস আগে থেকেই গুছিয়ে নিতে হয়, যেমন প্ল্যানিং করা, কোথায় যাব, কত দিনের জন্য যাব ঠিক করা, হোটেল-মোটেল গাড়ি বুকিং দেয়া, ইত্যাদি ইত্যাদি। অবশ্যই অনেক বড় এবং বিচিত্র ছিল এই ভ্রমণ। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে সময় ও দূরত্ব খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, কারণ এরকম বড় দূরত্বের অজানা নতুন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ড্রাইভ করার অভিজ্ঞতা আমার আগে থেকেই বেশ কিছুটা ছিল। আমি এই ভ্রমণকে হলিডে বলবনা, বরং একে এক চরম এক্সপেডিশন বলা যেতে পারে। প্রথম দিকে মনের মধ্যে সংশয় ছিল আমি পারবো তো। কারণ এবার এ ভ্রমণের যাত্রী ছিলাম একদম আমি একা।
যাহোক ভ্রমণের মূল বর্ণনায় আসি। আমি নিজের গাড়ি বাসায় রেখে সহজে ভাড়া পাওয়া একটা ক্যাম্পারভ্যান নিয়ে মূলত “উলুরু”র উদ্দেশ্যে রওনা দেই। যদিও প্রথমদিকে ক্যাম্পারভ্যানটা ভাড়া নেই বারো দিনের জন্য, কিন্তু যাত্রাপথের শেষের দিকে আরো দুদিনের জন্য এক্সটেইনড করি। প্রথম দিন সিডনি থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় গ্রোসারী ও অন্যান্য সব বাজার করেই বেরিয়ে পড়ি এবং সরাসরি চলে যাই “ওয়াগা-ওয়াগা”তে। সিডনি থেকে আমার প্ল্যানিং এর বিপরীতে কিছুটা দেরিতে বের হওয়াতে “ওয়াগা-ওয়াগা”তে পৌঁছাতে রাত হয়ে যায়। কিন্ত খুব কম সময়ের মধ্যেই রাতের খাবার রান্না করে ফেলি ক্যাম্পার ভ্যান এর ভেতরেই। পরের দিন সকাল সকাল রওনা দেই “মিলডুরা”র উদ্দেশ্যে এবং মাঝবেলার মধ্যে পৌঁছে যাই। আমি “মিলডুরা”তে এর আগেও একবার এসেছিলাম ২০২১ সালের ডিসেম্বরে। তখন “মেলবোর্ন” থেকে “ব্রোকেনহিল” এ যাবার পথে এখানে এক রাতের জন্য যাত্রা বিরতি নিয়েছিলাম।


আমার এ ভ্রমণের মূল উদ্দেশ্য ছিল মূলত “উলুরু” নামের লাল পাহাড়, যা অস্ট্রেলিয়ার একটি ব্যাপক পরিচিত প্রাকৃতিক নিদর্শন, তাকে কাছ থেকে দেখা এবং এটার চারপাশে হাইকিং করা। আমি যেহেতু “উলুরু” যাবার উদ্দেশ্যেই বের হই, তাই যাত্রাপথে অন্যান্য শহরগুলো ঘুরে দেখার খুব বেশি ইচ্ছে ছিল না। “মিলডুরা” শহরটি ঠিক নিউ সাউথ ওয়েলস ও ভিক্টোরিয়া রাজ্যের বর্ডারে অবস্থিত পশ্চিমাঞ্চলের একটি শহর, যদিও শহরটির অবস্থান ভিক্টোরিয়া রাজ্যে। স্কুল হলিডে’তে প্রচুর মানুষ “মিলডুরা”তে অবসরকালীন সময় কাটাতে যায়। শহরটির উত্তর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া “মারে” নদীতে বিশাল আকারের দোতলা রিভার-বোট ভাড়া নেয়া যায় ছুটি কাটানোর জন্য। সুন্দর আবহাওয়া থাকায় আমি কিছুক্ষণ নদীর পাশের এলাকা ঘুরে দেখি এবং আমার সাথে ক্যাম্পারভ্যানে নিয়ে আসা বরশি দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করি। পাশাপাশি কিছু রান্নাও করে নেই।


পরেরদিন সকালে “মিলডুরা”য় আমার হলিডে পার্ক থেকে চেইক আউট করে সরাসরি “পোর্ট অগাস্টা”য় রওয়ানা দেই। “পোর্ট অগাস্টা” সাউথ অস্ট্রেলিয়ার একটি বন্দরনগর। এখানে আসার জন্য আমাকে ভিক্টোরিয়া থেকে বর্ডার অতিক্রম করে সাউথ অস্ট্রেলিয়ায় আসতে হয়েছে। বর্ডারে কোয়ারান্টাইন চেকপোস্ট আছে যেন সাউথ অস্ট্রেলিয়ায় অন্য রাজ্য থেকে কোন ফলজাতীয় খাবার না আসে। “পোর্ট অগাস্টা” থেকে পরের দিন সকালে রওনা দেই “কুবার পেডি”র উদ্দেশ্যে। এই “পোর্ট অগাস্টা” থেকে “কুবার পেডি”র রাস্তাটি “স্টুয়ার্ট হাইওয়ে” নামে পরিচিত এবং এটি নর্দার্ন টেরিটোরির “অ্যালিস স্প্রিং” হয়ে “ডারউইন” পর্যন্ত বিস্তৃত।
“স্টুয়ার্ট হাইওয়ে” এক ভিন্ন ধরনের রাস্তা। হাজার হাজার মাইল ধরে এই হাইওয়ে চলে গেছে অস্ট্রেলিয়ার ঠিক মাঝ বরাবর বিস্তর মরুভূমির ভেতর দিয়ে এবং উত্তর প্রান্তের সাথে দক্ষিণ প্রান্তের যোগাযোগ ঘটিয়েছে। ১৮৬১ সালে জন ম্যাকডোয়াল স্টুয়ার্ট নামের এক স্কটিশ এক্সপ্লোরার প্রথমবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ থেকে উত্তর প্রান্তে ভ্রমণ করে এবং তারই নামেই এই হাইওয়ের নামকরণ করা হয়। এই “স্টুয়ার্ট হাইওয়ে”তে “রোড ট্রেইন” নামের এক ধরনের বিশাল সেমি ট্রেইলার গাড়ি চলে যা একসাথে তিনটি-চারটি পর্যন্ত ট্রেইলার ট্রেইল করে নিয়ে যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার অন্যান্য হাইওয়েতে সাধারণত এত বিশাল সাইজের সেমি টেইলার চোখে পড়ে না। আমি আমার এ ভ্রমণে একটি ব্যাপার খেয়াল করেছি যে, কখনো “স্টুয়ার্ট হাইওয়ে”তে কোন “রোড ট্রেইন”এর পেছনে গাড়ি চালালে, তারা সামনে রাস্তার নিরাপদ অবস্থা দেখে ডান দিকের ইনডিকেটর সিগনাল দেয়, এতে তারা পেছনের গাড়িদের সহায়তাকারি নির্দেশনা দেয়, যেন গাড়িগুলি তাদেরকে নিরাপদে ওভারটেক করতে পারে। আমার জন্য এটি একেবারেই একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং “স্টুয়ার্ট হাইওয়ে”তে ড্রাইভিং এর জন্য অবশ্যই একটি বিশাল হেল্প। “স্টুয়ার্ট হাইওয়ে”তে প্রায়ই চোখে পড়ে বিভিন্ন ধরনের গাড়ি রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে, সাধারনত সেডান বা হেচব্যাক জাতীয় গাড়ি বেশি দেখা যায়। বিভিন্ন সময়ের দুর্ঘটনা বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে এই গাড়িগুলি পরিত্যক্ত হয়েছে, কিন্তু হাজার মাইলের দুরত্বে এই গাড়িগুলিকে তার মালিকদের জন্য ট্রেইল করে নিয়ে যাওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়াতে মালিকরা গাড়িগুলিকে এভাবেই ছেড়ে চলে যায়। দেখলাম অনেক পরিত্যক্ত গাড়িতে আবার কারো আঁকা আর্টওয়ার্কও শোভা পাচ্ছে। কোন এক টিভি চ্যানেলে “স্টুয়ার্ট হাইওয়ে”র এই পরিত্যক্ত গাড়ির উপরে মনে হয় একটা ডকুমেন্টারিও দেখেছিলাম।








মাসুদ পারভেজের আরো লেখা পড়তে
ঘুরুঞ্চি ম্যাগাজিনের সকল কর্মকান্ড নট ফর প্রফিট, স্বেচ্ছাসেবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বর্তমানে সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। আপনি এ সকল কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে চাইলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।
ঘুরুঞ্চির ওয়েবসাইট পরিচালনা করতে আমাদের সপ্তাহে ৮-১২ ঘন্টা কাজ করতে হয়। বর্তমানে আমাদের কাজ শুধুমাত্র স্বেচ্ছাসেবক এবং স্ব-অর্থায়নের উপর নির্ভর করে। আপনারা ঘুরুঞ্চিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে, অনুদান দিয়ে, স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে সাহায্য করতে পারেন।
ঘুরুঞ্চির ভ্রমণ ছবি ব্লগের প্রায় ৭,০০০ ছবি থেকে আপনার পছন্দসই ছবি পেপার প্রিন্ট, ফাইন আর্ট প্রিন্ট, ওয়াল আর্ট এবং ডেস্ক আর্ট হিসাবে কেনার ব্যবস্থা রয়েছে। আপনারা ছবি কেনাকাটা করলে আমরা অল্প পরিমাণ কমিশন পাব।
আমরা আপনার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞ।