প্রতি বছর বড় দিনের ছুটিতে কোথাও না কোথাও যাওয়া হয়। এবার অবশ্য যেতে পারবো ভাবিনি, ভাগ্যে মিলে গেলো।২০২০ একটা অন্য রকম বছর! তাই এবারের ছুটির গল্প আর ছবিগুলি একসাথে রাখা ফরজ মনে করলাম। আমাদের ট্যুর প্ল্যান এক সপ্তাহের ছিলো। ডিসেম্বর ২৬ থেকে শুরু। আমরা আমরাই – দুই বাচ্চা আর আমরা দুই বন্ধু! স্বামী স্ত্রীতে তো আর বেশি দিন একটানা ২৪/৭ ঘণ্টা থাকা যায় না, ঝগড়া-ঝাটি, মান-অভিমান হয়ে যায়! তাই বন্ধু বললাম আর কি… ফিরে এসে না হয় আবার স্বামী স্ত্রী হয়ে যাবো!
বহু দিন পরে এরকম একটা ট্যুর। যদিও আমরা গত ১০-১২ বছরে বহু ট্যুর করেছি তবুও এই ট্যুর অন্য রকম। এই ট্যুরের ভিতরের গল্পও একদম আলাদা। এমন আর কোনোদিন হবে না আমার বিশ্বাস। তাইতো এই ইউনিক ট্যুরের গল্প বলতেই হবে আমাকে যাতে যতদিন বেঁচে থাকি কিছু ভুলে না যাই।
আমার চাকরীর সুবাদে আমরা ভিক্টোরিয়ার সাউথ ওয়েস্ট রিজিওনালে থাকি। এদিক থেকে মাউন্ট গ্যাম্বিয়ার একটু কাছেই হয়। সকাল সকাল বের হতে চেয়েও নয়টা বেজে গেলো। গাড়িতে তেল নিয়ে রওনা দিলাম। রিয়াদ একটু বিরক্ত। ও আরো ভোরে বের হতে চেয়েছিলো। বললাম, তেমন দেরি কই, আমরা আমরাই তো! যেতে যেতে ফেইসবুকে চোখ দিতে আমার মেডিকেল কলেজের অত্যন্ত প্রিয় এক আপুর ভ্রমণ কাহিনী চোখে পরল। জানতে পারলাম সাউথ অস্ট্রেলিয়াতে ঢুকতে পুলিশ ওয়েবসাইটে অনলাইন ফরম পূরণ করতে হয় কোভিড সেইফটির জন্য।সাথে সাথে ওয়েবে ঢুকে ফরম ফিলাপ করছি, আমার বড় ছেলে বলল, ‘মা আইজুর জুতা নাই পায়ে!’ ওমা দেখি সত্যিই তো। ছোট ছেলের পায়ে জুতা কই? ততক্ষণে ৩০ মিনিট রাস্তা পার হয়ে গেছি। রিয়াদ গাড়ি ঘোরালো। আমি আর ভয়ে ওর দিকে তাকালাম না।
ছেলের জুতা নিয়ে, অনলাইনে চেক ইন করে আবার রওনা দিতে দিতে ১১টা। রিয়াদ গম্ভীর মুখে স্টিয়ারিং এ আর আমরা মা-ছেলেরা টুকটাক কথা বলে পরিবেশ হাল্কা করতে চেষ্টা করছি। গাড়ি বোঝাই নানান জিনিস পত্র। জুহায়র বলল,’ মা আসো রিডল খেলি।’ আমার ছেলে রিডল বা ধাঁধা খুব পছন্দ করে। ও ওর বই থেকে অনেক গুলি রিডল জিজ্ঞেস করল। আমরা কিছুই ঠিক মতো উত্তর দিতে পারলাম না। সে খুব মজা পেলো। আর ছোটোটা তো দুধ ভাত। ওকেও কিছুক্ষণ পর পর প্রশ্ন করি সহজ সহজ যাতে ও মনে করে ওকেও খেলায় নিচ্ছি আমরা।
মোবাইলে ম্যাপ খোলা ছিলো, পথ ছিলো সোজা মাউন্ট গ্যাম্বিয়ার বরাবর। রাস্তা দেখিয়ে আমার ড্রাইভার সাহেবকে ওশেন ড্রাইভে ঢুকিয়ে দিলাম। দূরত্ব আরো ৩০ মিনিট বেড়ে গেলো কিন্তু এতে করে ভিক্টোরিয়ার সাউথ অস্ট্রেলিয়ার বর্ডার টাউন নেলসনে একটু সময় থামা গেলো। সুন্দর ছিমছাম টাউনটা অক্সবো লেইক আর সমুদ্রের পারে। অল্প সময়ের ব্রেকে লেইকের পারে দাড়িয়ে বুক ভরে একটা শ্বাস নিলাম যেনো মুক্তির আনন্দে। মনে মনে বললাম,’ হে আল্লাহ! সত্যি সত্যি এই অতিমারী থেকে মুক্তি দিয়ে দাও পৃথিবীর মানুষদের।
মাউন্ট গ্যাম্বিয়ারে ঢুকেই হোটেলে জিনিস পত্র রেখে খেতে গেলাম। দুপুর প্রায় তিনটার কাছাকাছি তেমন খাবারের দোকান খোলা থাকার কথা না। হোটেল থেকে একটু সামনে একটা ম্যাক্সিকান দোকান খোলা পেয়ে ঢুকে গেলাম। ভাগ্য ভালো ওদের খাবার তখনও ছিলো। লাঞ্চে করতে করতে গুগল করে দেখে নিলাম কোথায় কোথায় যাবো।
খাবার শেষ করে প্রথমে গেলাম কেইভ গার্ডেনে।এটা আসলে একটা ছোটো সিঙ্কহোল। ওখানে সুন্দর একটা বাগান। অনেক বৃষ্টিতে ওই গার্ডেনে ন্যাচারাল ঝর্ণা সৃষ্টি হয়। তবে আমরা সামারে গেলাম বিধায় পানির দেখা পেলাম না। কেইভ গার্ডেনে অল্প সময় থেকে চলে গেলাম ভ্যালি লেইকে। এমনি একটু দেখতে গিয়ে দেখি ওখানে এলাহী কাণ্ড। লেইকে চলছে নানান এক্টিভিটি আর পাশে বাচ্চাদের খেলার পার্কটা বেশ বড়। আর যায় কোথায় ছেলেরা হুর হুর করে পার্কে চলে গেলো। আমরা বসে বসে লেইকের সৌন্দর্য দেখতে লাগলাম। ওখানে বসে বসে দূরের পাহাড়ের উপর একটা টাওয়ার চোখে পরলো।
বাচ্চাদের খেলা শেষ হলে আমরা ওই পাহাড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। লেইকের পার ধরে ফেরার সময় আমি আর আমার ছেলে ঘাসের ফাঁকে পরা হাঁসের পালক কুড়ালাম কিছুক্ষণ। পথের ধারে একটা লাঠি পেয়ে ওটাও কুড়িয়ে নিলাম। খাড়া পাহাড়ে লাঠি থাকলে ভালো। সেন্টিনারী টাওয়ার ১৯০৪ সালে তৈরি, সি লেভেল থেকে ১৯০ মিটার উপরে আর ওখান থেকে মাউন্ট গ্যাম্বিয়ার সিটি ও এর ভলকানিক ল্যান্ডসকেইপ দেখা যায়। কার পার্ক থেকে খাড়া ৫০০ মিটার উপরে সেন্টিনারী টাওয়ার।দূরত্ব বেশি না হলেও খাড়া হওয়াতে উঠতে বেশ কষ্ট হলো। ভাগ্যিস লাঠিটা ছিলো। সবাই পালা করে করে কিছুদূর লাঠিতে ভর দিয়ে উঠলাম। শেষ মাথায় গিয়ে ঠাণ্ডা বাতাসে চেয়ারে বসে দেখলাম ব্লু লেইক ও ভ্যালি লেইক সহ ৩৬০ ডিগ্রি ভলকানিক ল্যান্ডস্কেইপ। সুন্দর, খুব সুন্দর করে সাজানো প্রকৃতি।
সিভিয়ার ওয়েদার ওয়ার্নিং ছিলো সেদিন.. আকাশ একদম অন্ধকার সাথে বাতাসও বেশ। কিন্তু তাই বলে থামলে চলবে? গাড়িতে উঠেই রবী কবির ভাষায় বললাম…
“যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,
সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,
যদিও সঙ্গী নাহি অনন্ত অম্বরে,
যদিও ক্লান্তি আসিছে অঙ্গে নামিয়া,
মহা আশঙ্কা জপিছে মৌন মন্তরে,
দিক্-দিগন্ত অবগুণ্ঠনে ঢাকা–
তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।”
নাস্তা করে চলে গেলাম আম্পারস্টোন সিংকহোলে। সিংকহোলের অন্য নাম দ্যা সাংকেন গার্ডেন বাংলায় নিমজ্জিত বাগান। বহু বছর আগে লাইমস্টোন দ্রবীভূত হয়ে ভেতরে গর্ত তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে গর্তের উপরের অংশ নিচের দিকে দেবে গিয়ে সিংকহোলটি তৈরি করে। এই সিংকহোলেই পরিকল্পিত উপায়ে বাগনটি করা। খুবই সুন্দর বাগান। তবে টুরিস্ট অনেক, অল্প জায়গায় কেমন ঠেলাঠেলি হয়ে যাচ্ছিলো। যা হোক এই বাগানের আরেকটা ব্যাপার পরে জানলাম সন্ধ্যায় ওখানে অনেক পসাম নামে। ওই পসামদেরকে খাওয়ানোর অনুমতি আছে শুনলাম। আমরা যেতে পারিনি সন্ধ্যায়। কেউ চাইলে যেতে পারেন, বাচ্চারা বেশ মজা পাবে।
বৃষ্টি আসার আগেই বাগান দেখে ফিরে এলাম। ফেরার পথে ইনফরমেশন সেন্টারে যখন থামলাম ততক্ষণে বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেছে। কিছু তথ্য সংগ্রহ করে প্রথমে গেলাম এন্গেলব্রেচেট (বেশ কঠিন উচ্চারণ, ঠিক হলো কিনা জানি না) কেইভে। গিয়ে শুনি কোভিড রেসিট্রিকশনের কারণে এখন সীমিত আকারে লোকজন ভেতরে ঢুকতে পারে এবং বুকিংও অনেক আগে থেকে দিতে হয়। কি করা! কেইভ না দেখে ফিরে এলাম। এর পর বৃষ্টির মাঝে কই যাবো ভাবতে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম পোর্ট ম্যাকডোনেল যাই। মাত্র ২৫ মিনিটের ড্রাইভ।
যাবার রাস্তাটা বেশ সুন্দর।বৃষ্টির কারণে আরো বেশি সুন্দর লাগছিলো। তবে পৌঁছে প্রচণ্ড বাতাস আর বৃষ্টির কারণে গাড়ি থেকে নামা গেলো না। গাড়িতে বসেই সাউদার্ন সাগরের সৌন্দর্য দেখলাম। বৃষ্টিভেজা দিনে সমুদ্র দেখার অন্যরকম মজা আছে। একটা কথা বলে রাখি সাউথ অস্ট্রেলিয়ার এই দিককার অংশকে বলে লাইমস্টোন কোস্ট। পোর্ট ম্যাকডোনেল সাউথ অস্ট্রেলিয়ার সাউথ ইস্টের সবচেয়ে শেষ পয়েন্ট , এর পরই ভিক্টোরিয়ার অংশ শুরু।
গাড়ি থেকে নেমে ঘুরতে পারিনি তাই ভাবলাম লাঞ্চটা অন্তত করে যাই। গত তিন বেলা সাধারণ খাবার খেয়ে যেটুকু অর্থ বাঁচিয়েছিলাম সেটুকু দিয়ে পোর্ট ম্যাকডোনেলের বিখ্যাত লবস্টার খাওয়া হলো। জীবনে প্রথম লবস্টার, বেশ মজাই লাগলো।তবে ছেলেরা খাবার নিয়ে ঝামেলা শুরু করলো। বড় ছেলে ফিশ ফ্রাই খাবে না আর ছোটো ছেলে খাবারই খাবে না। কি একটা অবস্থা! মা-বাবা হবার একটা কঠিন সমস্যা হলো ছেলে পেলে ঠিক মতো না খেলে কিছুই ভালো লাগে না।শেষ পর্যন্ত একটু সময় লাগলেও দুজনই খেলো।
পোর্ট ম্যাকডোনেল থেকে ফেরার পথে নামবো না নামবো না করেও কৌতূহল দমন করতে না পেরে নামলাম মাউন্ট চ্যাঙ্ক পাদদেশে। মাউন্ট চ্যাঙ্ক একটা ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি।বেশি না, মাত্র ১০০ মিটার উপরে। যেতে আসতে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরত্ব। তবে খাড়া আছে বেশ।তবুও বৃষ্টি বাতাস উপেক্ষা করে পাহাড় ঠেলে উপরে উঠে আগ্নেয়গিরি মুখে একটা উঁকি দিয়েই নেমে গেলাম। আরো ২/৩ কিলোমিটার ভেতরে যাওয়ার ট্রেইল আছে কিন্তু ছোটোটাকে এই ঠাণ্ডা বাতাসে কন্ট্রোল করা বেশ মুশকিল হচ্ছিলো।অবশ্য সে নিজেই পুরোটা উঠেছে ও নেমেছে। নামতে নামতেই ঝুম বৃষ্টিতে সপরিবারে কাক ভেজা হয়ে গেলাম। তারপরও কোনো রকম আছাড় না খেয়ে নিরাপদে গাড়িতে ফিরে এসে মনে হলো কষ্ট হলেও একটা কাজের কাজ হয়েছে।
ভিজে যাওয়াতে হোটেলে ফেরা জরুরী হয়ে পড়লো।ফিরে খানিকটা রেস্ট। ছেলেরা অনেকদিন পর বাবা-মা কে একসাথে বেশ ভালো মুডে পেয়ে খুব খুশি। ছোটো ছেলেটা খুব বাপ নেওটা। বাপের পায়ে দোল খেতে চাইলো। বাবাও ‘দ দ, দুক্কুনি দ…’ করে দোল দিলো।ছেলের বাবা যখন ছোটোটাকে পায়ে দোলাচ্ছিলো তখন বড়টাও দোল খেতে চাইলো। আমার বড় ছেলেটা খুব দ্রুত বড় হয়ে গেছে। মনে হয় কখন যে এত বড় হলো বুঝতেই পারিনি। ও এখন গায়ে গতরে বড় কিন্তু মন তো অনেক ছোটোই.. বাবা কি আর ছেলেকে না করতে পারে, ছেলেদের খুশির জন্যই তো এত কিছু, তাই ওর বাবা ওকেও দোলা দিলো একটু।
খানিক পরে আমরা আমাদের শেষ আকর্ষণ ব্লু লেইক দেখতে গেলাম। মাউন্ট গ্যাম্বিয়ারের প্রধান বিখ্যাত জায়গা। হঠাৎ করে তাকালে মনে হবে কেউ যেনো একটা বিশাল নীল রং এর ডিব্বা উপুত করে এই লেইকে ফেলে দিয়েছে।
মাউন্ট গ্যাম্বিয়ারের একটি বিলুপ্ত আগ্নেয়গিরির মুখে লেইকটি। প্রতি বছর নভেম্বরে লেইকের হাল্কা নীল রং অজানা কারণে প্রায় রাতারাতি একদম গাঢ় নীল রং ধারণ করে।





Previous
Next
লেইকের চারপাশে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটারের হাঁটা। আমরা খুব জোশ নিয়ে শুরু করে অর্ধেক পর্যন্ত গিয়ে ফিরে এলাম। সাহেব কিন্তু খুবই মন খারাপ করেছেন ফিরে আসায়। কিন্তু কি করা? প্রথম ভাগে পাহাড় চরে আসায় তখন পা আর চলছিলো না। তাকে একটু খুশি করার জন্য বললাম হোটেলে ফিরে খিচুড়ী রেঁধে খাওয়াবো।
ফেরার পথে আমার ছেলে জুহায়রের সাথে অনেক কথা হলো। বাংলাদেশে আমাদের এক্সটেন্ডেড পরিবার ও খুব মিস করে। ও সবাইকে চেনে জানে। খুব ছোটো থেকে ওর মা ওকে ওর পরিবার দাদা নানা, জেঠা-ফুফু, খালা-মামা সবার কথা বলেছে। তাই ও নিজেকে ওর বাংলাদেশের পরিবারের সাথে খুব কানেক্টেড মনে করে। সবার কথা বলার পর ও বলল, আলহামদুলিল্লাহ মেজো বাবা মানে ওর মেজো জেঠা এখন একটু ভালো। আমি তখন ওকে জানালাম ওর ছোটো ফুফু হাসপাতালে, কোভিডের সাথে লড়াই করছে, ফুফুর মেয়ে ওর সবচেয়ে ছোটো কাজিনও হাসপাতালে। শুনে ওর মনটা খারাপ হলো বটে তবুও মা হিসেবে আমি মনে করি ওকে এসব জানানো প্রয়োজন। পরিবারের কেবল আনন্দটা জানলে কি হয়, কষ্টও জানতে হয়।আজকে আবারো ওকে মনে করিয়ে দিলাম কিছুদিন আগে ওর বড় মা, আমার বড় জা আমাদের ছেড়ে গেছেন। জীবনে আনন্দ থাকবে কিন্তু তাই বলে আমরা আমাদের কাছের মানুষদের ভুলে যেতে পারি না। এই কোভিড আর কোভিডের কারণে সৃষ্ট জটিলতা শুধু আমাদের না সারা বিশ্বে বহু পরিবারকে এলোমেলো করে দিয়ে গেছে। আমার ছোটো ছেলেটি তার গভীরতা একটু একটু করে বুঝতে শিখছে।
সকালটা খুবই সুন্দর ছিলো সেদিন। আমরা হোটেল ছেড়ে দিয়ে ব্রেকফাস্ট কিনে ভ্যালি লেইকে গিয়ে বসলাম। নাস্তা খেয়ে বাচ্চারা পার্কে খেলাধূলা করল। আমাদের সাউথ অস্ট্রেলিয়া আসার কথা ছিলো ২০২০ এর এপ্রিলে। কিন্তু করোনার লকডাউনের জন্য সম্ভব হয় নাই। এখন এই ডিসেম্বরে এসে দেখছি অনেক মানুষ সবখানে। ভয় লাগছে না যে তা নয়।
ভ্যালি লেইকের পারে বসে আমার খুব লিখতে ইচ্ছা হলো অনেকদিন পর। কিন্তু আমি বসে বসে ছেলেদের খেলা দেখলাম আর দূর থেকে সেন্টিনারি টাওয়ারের দিকে তাকিয়ে আমার ভাবনার অতল সাগরে ডুবে থাকলাম কিছুক্ষণ। সময় বহিয়া চলে, মনের অগোচরে।তাই মাউন্ট গ্যাম্বিয়ার পেছনে ফেলে আসার আগে ব্লু লেইকের নীল জলরাশির দিকে আরেকটি বার নজর না দিয়ে আসতে পারলাম না।
আমাদের এবারের ট্যুর প্ল্যান সাউথ অস্ট্রেলিয়ার সাউথ-ওয়েস্ট সাউদার্ন ওশেন বরাবর।এবারে ডেস্টিনেশন কিংস্টন এসই। যেতে যেতে রাস্তার দুপাশে বিশাল বিশাল পাইনের বন।হেক্টরের পর হেক্টর জমিতে অস্ট্রেলিয়ান সরকার পাইনের বন তৈরি করেছে। তারই মাঝে ১১০কিমি/ঘণ্টায় রাস্তা।পাইনের ঘন বন চিরে যেনো হুঁশশ করে চলে যাওয়া!
যাবার পথে টেন্টানোলা কেইভটা পরলো। রিয়াদ বলল,’আগের কেইভটা দেখতে পারি নাই। এটা খোলা থাকলে দেখবো।’ গিয়ে শুনি ওদের ট্যুর সকালে বুকড্ কারণ কোভিড প্রোটকলে বেশি মানুষ এক সাথে যেতে পারে না। রিয়াদ সেটা না দেখে যাবে না ঠিক করেছে বিধায় আমাদের ওখানে পরের গ্রুপের জন্য অপেক্ষা করতেই হলো। একঘন্টা সময় হাতে, তাই আমরা ‘চানাচিট্টা’ (আমার ছোটো ছেলের ভাষায়) খেতে খেতে জঙ্গলে হাঁটতে গেলাম। তবে যথারীতি তাকে কন্ট্রোল করা মুশকিল। ওইটুকু সময়ের মাঝে কখন যে রিয়াদ ওকে ধরতে গিয়ে আমার সামনেই ধুম করে পরে গেলো বুঝতেই পারলাম না।আমি ওকে মাটিতে বসা দেখে অবাক হয়ে উঠে দাঁড়াতে বললাম, ও জানালো ওর হাঁটু মচকে গেছে। যাহোক কোনো মতে উঠে হাল্কা করে পা ফেলতে পারলো।আমি যে লাঠিটা ভ্যালি লেইকে কুড়িয়ে নিয়েছিলাম সেটা কাজে লেগে গেলো ওর।ছেলেদের নিয়ে এবার আমি আগে আগে চললাম।আর ও বেচারা মন খারাপ করে পেছন পেছন লাঠিতে ভর দিতে দিতে ফিরে এলো।
অবশেষে আমরা কাঙ্ক্ষিত কেইভ দেখে আর দেরি করলাম না। ন্যাচারালী তৈরি কেইভটা খুবই সুন্দর। ৫০০ বছরের বেশি পুরানো হবে। একটা গর্তের ভেতরে হাজার বছর ধরে বৃষ্টির পানি চুইয়ে ডলোমাইট লাইমস্টোন ফর্মেশনের মাধ্যমে এই অনন্য স্টেলেক্টাইটগুলি তৈরি হয়েছে। ছোট্ট এক ইঞ্চি এর মত সূচালো অংশ যাকে আমরা স্টেলেক্টাইট বলছি তা তৈরি হতে নাকি বহু বছর লেগে যায়।৯০ বছর বয়সী একটাতে টার্গেট করে ছবি তুলে এনেছি।জুহায়র ওর গ্র্যান্ড চাইল্ড নিয়ে আবার গিয়ে দেখে আসতে পারবে কত বড় হলো, ইনশাল্লাহ। দেখে মনে হলো কষ্ট করে অপেক্ষা করাটা স্বার্থক হয়েছে।
ওখান থেকে রওনা হয়ে আমরা বীচপোর্ট নামে একটা ছোট্ট শহরে ব্রেক নিয়ে লাঞ্চ করলাম। এরপর বীচে একটু সময় কাটানো। বিচপোর্টের বিচটা একদম অন্যরকম মনে হলো। অস্ট্রেলিয়ার কোস্টাল লাইনে বীচগুলি সবই খুব সুন্দর। গত ১০ বছরে বহু বীচ দেখেছি, মনে হয় একেকটা একেক রকম। সব সময়ই সুন্দর লাগে। তবে পার্থক্য আগে বীচ আর সমুদ্র দেখতে ভালো লাগতো বেশি, এখন আমার প্রিয় মানুষদের সাথে একসাথে থাকতে ভালো লাগে। ওরা সাথে থাকলে সারা পৃথিবী এমনিতেই সুন্দর।
রিয়াদের পায়ে হাল্কা ব্যথা ছাড়া আর তেমন সমস্যা না হলেও আমরা স্লো ডাউন করলাম। ওখান থেকে কেইপ জাফা যাবার প্ল্যান ছিলো, বাদ দিলাম। না হয় দেখলাম না আর কি কিছু জায়গা প্রিয় বন্ধুর কথা চিন্তা করে, কি হবে? Not the end of the world! আসার পথে বাউয়েন্স সি ড্রাইভ দিয়ে এলাম। অসম্ভব সুন্দর সিনিক ভিউ। তবে মোবাইলে চার্জ চলে যাওয়াতে বেশি ছবি তোলা গেলো না।
এরপর পরই সোজা এসে যখন কিংস্টন পৌঁছালাম তখন প্রায় সন্ধ্যা। কিংস্টনে ঢুকে আমার খিদা ও ঘুম দুটো একসাথে পেয়ে গেলো। আসে পাশে কোথায় কি পাবো ভাবছিলাম। দেখলাম হোটেল রেস্তোরা খোলা আছে। ওখানেই ঢুকে গেলাম। ওখানে বসেই সাগরে সানসেট দেখলাম। মনে হলো সেদিনের সূর্যাস্ত অদ্ভুত সুন্দর আভা ছড়িয়ে গেলো।
সকালে হোটেল থেকে বের হতেই দশটা বেজে গেলো। খাবার দোকান তেমন খোলা নেই দেখে একটা দোকানে যা পেলাম খেয়ে প্রথমেই গেলাম পিংক বীচে। সাউথ অস্ট্রেলিয়ার এই অংশটাকে যে লাইমস্টোন কোস্ট বলে তা আগেই বলেছি। এদিকটায় প্রাকৃতিক ভাবে লাইমস্টোন তৈরি হয়ে হয়তো সাগর পারটা সাদাটে হয়ে থাকে। ঠিক জানি না। তবে এই দিকের সৈকতে গাড়ি চালানো যায়। আমার অনেক দিনের ইচ্ছা সাগর সৈকতে গাড়ি চালানোর, মুভিতে দেখা। কিন্তু আমার গাড়ি নিয়ে উঠতে সাহস পেলাম না বিধায় নিজেরাই গেলাম।
এক সময় আমি আর জুহায়র ভাবলাম একটু দূরে পিয়ার পর্যন্ত যাবো কোস্ট লাইন ধরে। রিয়াদকে সকালে ফার্মেসি থেকে একটা নি-সাপোর্ট কিনে দিয়েছি, সাথে ব্যথার ওষুধ। পায়ে সাপোর্ট পরে বেশ চলছে ও। তবুও কম হাঁটানোর জন্য ওকে আইজ্যাকসহ গাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম। আমি আর জুহায়র বীচ ধরে হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণ শেল কুড়ালাম। তারপর জুহায়র বললো,’ মা, গান করি আসো!’ তাতে একটা সমস্যা হলো, আমি যা জানি তা ও জানে না আর ও যা জানে সেসব গান আবার আমি জানি না।
অত:পর আমাকে আমার জানাগুলি গাইতে বললো।আমি আমার ছেলেবেলাতে খেলাঘর নামের একটা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে শেখা তিনটা গাইলাম,
‘সাগর পাড়িতে ঝর জাগে যদি
জাগতে দাও, জাগতে দাও, জাগতে দাও..
বজ্রের গানে গানে কণ্ঠ মিলিয়ে
শপথ নাও, শপথ নাও, শপথ নাও!
আমার তরীকে ডুবতে দেবো না
দেবো না, দেবো না, দেবো না..
জীবনকে ছেড়ে মরণ নেবো না,
নেবো না, নেবো না, নেবো না!
ঝরের পাহাড়কে চুরমার করে,
এগিয়ে যাও, এগিয়ে যাও, এগিয়ে যাও…’







Previous
Next
এরপর গাইলাম, ‘আমরা করবো জয়! We shall overcome’ এটার ইংলিশ অংশটাতে জুহায়রও গলা দিলো! শেষে গাইলাম ‘ আমরা সবাই রাজা, আমাদেরই রাজার রাজত্বে..!’
গান গাইতে গাইতে কিংস্টন পিয়ারে পৌঁছে গেলাম। রিয়াদের ওখানে মিট করার কথা। ফোন দিলে ছোটটাকে নিয়ে টয়লেট খুঁজতে গেছে বলে জানালো ও। আমরা দুই মা-ছেলে পিয়ারে উঠে অনেক গুলি ছবি নিলাম। এরপর বাকি দুজন এলে গেলাম ‘বিগ লবস্টার – দ্যা লেরী’ র সাথে ছবি তুলতে। সেখানে ছবি টবি তুলে রেস্তোরায় থেকে টেক ওয়ে লাঞ্চ নিয়ে রওনা দিয়ে দিলাম পরবর্তী ডেস্টিনেশনে।যেতে যেতে মনে হলো কিংস্টন আসলে খুবই সুন্দর জায়গা ছিলো।
দ্যা কুরং সাউথ অস্ট্রেলিয়ার সাউথ ইস্টে মারি নদীর মুখ থেকে শুরু হওয়া একটা লেগুন বা উপহ্রদ। কিংস্টন থেকে ভিক্টোরিয়া হারবার যাবার পথে এই লেগুনের পাশ দিয়ে যাবো আগেই ভেবে রেখেছিলাম। লেগুনটা বিশাল লম্বা। প্রায় ১৫০ কিলোমিটার হবে। কুরং ন্যাশনাল পার্কের মাঝে দিয়ে গেছে এই লেগুন।
আমরা ভেবেছিলাম সোজা দেড়শো কিলোমিটার একটানে ড্রাইভ করে কুরং ন্যাশনাল পার্কের মাথায় মেনিঙ্গি শহরে চলে যাবো। কিন্তু মাঝে একটা টয়লেট ব্রেক নিতে গিয়ে পার্কের অনেকটা ভেতরে ঢুকতে হলো।ঢুকেই মনে হলো বাংলাদেশের চলন বিলে চলে এসেছি। যদিও চলন বিলে যাওয়া হয় নাই তবে দেখে মনে হলো দেশের বড় বড় খাল-বিলের সাথে বেশ মিল। শান্ত নীরব জায়গায় অনেক রকম পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। এমন কি ইমু পাখিও দেখলাম জঙ্গলের ভেতরে। থামবো না ভেবেছিলাম, অথচ ওখানে বসেই লাঞ্চ করা হলো। খুবই সুন্দর চারপাশে।এত বড় বিল বা উপ হ্রদের ছবি মোবাইলে তেমন ধরতে পারি নাই। ক্যামেরাতে পাখিদের ওড়াওড়ির কিছু ছবি তুলেছি মাত্র।
কুরং লেগুন থেকে রওনা দিয়ে মেনিঙ্গিতে পৌঁছে আরেকটা ব্রেক নিলাম। মেনিঙ্গি একটা ছোটো শহর লেইক আলবার্ট এর পাশে। লেইক আলবার্ট আর লেইক আলেক্সান্ড্রিনা দুটো বিশাল বিশাল লেইক পাশাপাশি।লেইক আলেক্সান্ড্রিনার এক সাইডের অংশ সাউদার্ন ওশেনের সাথে লাগোয়া আর আরেক অংশে বিখ্যাত মারি নদীর সংযোগ।
লেইক আলবার্টের পাশ দিয়ে যাবার সময় বাচ্চাদের পার্ক দেখে একটু থামতে হলো। সারাক্ষণ ড্রাইভ আর সাইট সিয়িং করলে কি হয়? বাচ্চারা তো বিরক্ত হয়ে যায়। অবশ্য গাড়িতে নানা রকম এক্টিভিটির ব্যবস্থা আছে। ওয়ার্ড গেইম, কার গেইম, আই স্পাই, মিউজিক , বই পড়া, রিডল, ব্রেইন টিজার!
পথিমধ্যে একটা জায়গা যেটাকে বলে পিংক লেইক ওখানে থামলাম। লেকে জন্মানো একোয়াটিক উদ্ভিদ অতিরিক্ত সূর্যের আলো থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য ডুনালিয়েলা সেলিনা কেরোটিন নামের কেমিক্যালের তৈরি করে যা রোদের আলোয় গোলাপী আভা দেয়। পিংক বা হাল্কা গোলাপী এই আভাটা শুধু মাত্র গ্রীষ্মে লেইকটা শুকিয়ে গেলে দেখা যায়।
মেনিঙ্গি পার হয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নারুং নামের একটা জায়গায় যাবার জন্য রওনা হলাম। নারুং এ এর আগে ২০১৩ সালেও একবার গিয়েছিলাম। তখন সাথে অভিযাত্রী দল ছিলো। আমি গাইডার এবং প্ল্যানার হিসেবে পথ দেখিয়ে লেইক আলেক্সান্ড্রিনা আর লেইক আলবার্ট এর সংযোগস্থল নারুংএ নিয়ে গিয়েছিলাম। তখন অত কিছু বুঝতাম না, জানতাম না। সাউথ অস্ট্রেলিয়ার এদিককার রাস্তার চারপাশটা খুবই রুক্ষ। এই রুক্ষতায় কারো কোনো আইডিয়া না থাকায় সবাই খুবই বিরক্ত হয়েছিলো আমার উপর। আমিও বুঝি নাই, এই দুই লেইকের সংযোগ স্থলে একটা ফেরী ছাড়া আর কিছু দেখা যাবে না। তাই আমিও মনে মনে একটু দমে গিয়েছিলাম। এবারে জেনে বুঝেই আবারো গেলাম।
লেইক আলেক্সজান্ড্রিনার রহস্য হলো এই লেইক সাউদার্ন সাগরে গিয়ে উন্মুক্ত হয় মারি মাউথে। মারি মাউথ যেখানে তার একপাশে কুরং লেগুন দিয়ে দ্যা কুরং আর লেইক আলেক্সড্রিনা পাশাপাশি এবং এই লেইকে এসে শেষ হয়েছে মাইটি মারি নদী, অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘতম নদী। কথা হলো এই নদীর সাথে আমার কি সম্পর্ক? এই মারি নদী ভিক্টোরিয়ান আলপস্ পর্বতে শুরু হয়ে সাউথ অস্ট্রেলিয়াতে শেষ হয়েছে এবং আসার পথে সোয়ান হীল হয়ে এসেছে। সোয়ান হিল আমার প্রথম কাজের জায়গা যেখানে ২০১৪-২০১৫তে ১৮ মাস ছিলাম অনেকটা একা একাই। এই মাইটি মারির পারে কত যে একাকী সন্ধ্যা পার করেছি তার হিসাব কে রাখে?
নারুং ফেরি থেকে ভিক্টর হারবার যাবার পথে টালিম-বেন্ড পরে। টালিম বেন্ডে মারি নদীর শেষ অংশটা যেখানে নদী আর লেইক মিশেছে। আসার পথে সেখানে ফুয়েল ব্রেকের কারণে সেটাও দেখা হলো। এরপর ডাইরেক্ট ভিক্টোরিয়া হারবারের পথে। একটু টয়লেট ব্রেক নিতে গিয়ে স্ট্রাথালবাইন বলে একটা শহরের অসম্ভব সুন্দর একটা লোকেশনে থামি। থেমে মনে হলো এই ছোটো শহরটায় না থামলে এর ইউনিক সৌন্দর্য দেখাটা মিস হয়ে যেতো।
খুবই হ্যাপেনিং একটা জায়গা। আমরা কাছেই একটা হোটেলে উঠেছিলাম। কিন্তু বরাবরের মতো সকাল সকাল উঠতে পারি নাই।
১০টার দিকে কাছের ম্যাকডোনাল্ড থেকে ব্রেকফাস্ট কিনে হারবার পার্কে গিয়ে বসলাম।বাতাসটা বেশ ঠাণ্ডা ছিলো, তাই দ্রুত খাবার খেয়ে বাচ্চাদের পার্কে খেলতে পাঠালাম। পাশেই ছোটো ছোটো এমিউজমেন্ট একটিভিটি। বাম্পার কার দেখে বাচ্চারা ওখানে যেতে চাইলো। তাই আমি ওদের নিয়ে বাম্পার কারে উঠলাম। ছোটটা একটু ভয় পেয়েছিলো।সে আর কোথাও চড়তে রাজি হলো না। অগত্যা আমি আর জুহায়র সিজলার নামে কি একটাতে চরলাম। মারেম্মা! মাথা তো মাথা পেটের নাড়িভুড়িও বের হয়ে যাবার দশা হলো। জুহায়র মজা পেলেও আমি কানে ধরলাম, আর কখনও উঠবো না!
ভিক্টর হারবার পার্ক থেকে হাঁটা ব্রিজ দিয়ে গ্রানাইট আইল্যান্ড যাওয়া যায়। আগের বার যখন এসেছিলাম তখন গ্রানাইট আইল্যান্ড পুরোটা হেঁটে ঘুরে এসেছিলাম।এবার আর পুরোটা দেখার প্ল্যান নাই।তবে ছোট্ট আইল্যান্ডটা খুব সুন্দর আর একে ঘিরে আছে অনেক একটিভিটি। ব্রিজটাতে ঘোড়ায় টানা গাড়ি চলে। বীচে আছে ক্যামেল রাইড। অবশ্য ক্যামেলগুলা দেখে আমার খুব চিমা চিমা লাগলো। অস্ট্রেলিয়ায় সব কিছু এত পুষ্ট কিন্তু এই উট গুলি এত চিমা কেন বুঝলাম না! আমরা কোনো রাইডে গেলাম না। হেঁটেই ব্রিজ পার হয়ে আবার ফিরে এলাম। আমাদের অভিযাত্রী দলে তিনজন ইনজুরড্ পারসন (একজন রিয়েল, বাকি দুইজন হুদোসুন!) তাই যত সংক্ষেপে ঘুরা যায় আর কি। ব্রিজের উপর হাঁটার সময় পাশেই সাগরের অগভীর পানিতে সামুদ্রিক ঘাস দেখা যায়। ওই সব জলজ উদ্ভিদের ভেতরে ভেতরে অনেক রকম মাছ ঘুরা ফিরা করে। আমরা লাকিলি জলজ ঘাসের ভেতর একটা স্ট্রিং রে স্পট করে ফেললাম ফেরার পথে।
ভিক্টর হারবার থেকে বের হতে হতে দেরি হয়ে গেলো। বুঝতে পারছিলাম না ডানে পোর্ট এলিয়ট যাবো নাকি বামে কেইপ জার্ভিস যাবো। শেষে ডানেই গেলাম পোর্ট এলিয়ট। পৌঁছে বেশি সুবিধা করতে পারলাম না। বাচ্চা দুটি ঝামেলা শুরু করে দিলো আর বাচ্চাদের বাপের মেজাজ গেলো বিগড়ে। আমি একমাত্র মহিলা কাকে বাদ দিয়ে কাকে শান্ত করি নাকি সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখার সাধ মেটাই!
পোর্ট এলিয়টে একটা উঁকি দিয়ে গাড়িতে চড়ে বসলাম। বাচ্চাদের শান্ত করে রিয়াদকে পটিয়ে নিয়ে গেলাম গোলওয়া। গোলওয়াও খুবই হ্যাপেনিং জায়গা। গোলওয়া থেকে ভিক্টর হারবার পর্যন্ত হিস্টোরিক সি-সাইড স্টিম ট্রেইন যায়।ক্রিসমাস ভিড় আর কোভিড রেস্ট্রিকশনের জন্য সব টিকেট আগেই বুকড্ আউট হয়ে যাওয়াতে আমরা আর ট্রেইনে চড়তে পারলাম না। তবে গোলওয়ার আসল বিশেষত্ব হলো হিন্ডমার্শ আইল্যান্ড। গোলওয়া থেকে ব্রিজ পার হয়ে এই আইল্যান্ড যাওয়া যায়। আমরা ব্রিজ পার হয়ে মাইটি মারি মাউথ দেখতে গেলাম। আবারো মারি নদী।ব্যাপার আমার খুবই ইন্টারেস্টিং লাগলো। একটা নদী ট্র্যাক করে তার শেষ দেখা। তাও আবার অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় নদী বলে কথা।
আসলে এমনে চিন্তা করলে মারি মাউথ আহা মরি কিছু নয়। সেখানে প্রমত্তা সাগরে নদীর বিলীন হওয়া দেখা, অসাধারণ অনুভূতি। ভাবছি সুযোগ হলে মারি নদীর উৎপত্তিস্থলটাও দেখে আসবো, ইনশাল্লাহ। মারি মাউথ দেখতে গিয়ে অনেকটা সময় ব্যয় হয়ে গেলো।
তবে এত দূর এসে কেইপ জার্ভিস যাবো না মানতে পারলাম না বিধায় তখনই রওনা দিয়ে দিলাম। কেইপ জার্ভিস থেকে ক্যাঙ্গারু আইল্যান্ডের ফেরি ছাড়ে। আমরা দেরিতে ট্যুর প্ল্যান করায় বুকিং পাইনি ক্যাঙ্গারু আইল্যান্ডের। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর জন্য গেলাম ফেরি ঘাটে। জায়গাটা সুন্দর, পথটাও। যেতে আসতে আরো অনেক বীচ ঘাট পরে। সময়ের কারণে সব বাদ দিয়ে ডাইরেক্ট কেইপ পর্যন্ত গেলাম। ঠিক তখনি একটা ফেরি আসছিলো ক্যাঙ্গারু আইল্যান্ড থেকে। টুক করে ছবি তুলে নিলাম।
বেশি ক্ষণ থাকা গেলো না প্রচণ্ড বাতাসের জন্য।ফেরার পথে রেপিড বীচ বলে একটা জায়গায় একটু থামি। বীচটা একেবারেই অন্যরকম। পাথুরে বীচ আর পেছনে বিশাল পাহাড়। মনে হলো এই বীচের পারেই আসলে সারাদিন কাটিয়ে দেয়া যায়।কিন্তু তা তো সম্ভব না। তাই হোটেলের পথে রওনা দিতে হলো।
বীচ ড্রাইভ দিয়ে একপাশে সাউদার্ন সাগরের নীল জলরাশি আর অন্যপাশে পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে মনে হলো সাউথ অস্ট্রেলিয়ার এপাশটার সাথে ভিক্টোরিয়ার গ্রেট ওশেন রোডের অনেক অমিল। এই এলাকার লালচে পাহাড়ের পাশে সাগরের রূপ একেবারে আলাদা। কাছে গিয়ে দেখি বীচে গাড়ি নামানোর স্লোপটায় বেশি বালি নাই। রিয়াদ বলল, চলো একটু নামি গাড়ি নিয়ে। অল্পদূরই বীচ ড্রাইভ করা, তারপরও গাড়িতে বসেই সামনে সাগরের ঢেউ, এক অন্যরকম অনুভূতি! মন যেনো গেয়ে উঠলো,
“গাড়ি নিয়া বীচে নাইমা আমার আশা পুরাইছে..
হায়রে,গাড়িত বইসা ঢেউ দেইখা নয়ন জুড়াইছে!!”
বিঃদ্রঃ কোনো কোনো স্টেট বিচে গাড়ি নামানো পারমিন্ট করে না। বিচে গাড়ি নামানো পূর্বে সেই স্টেট/টেরিটোরির রেগুলেশন চেক করে নেবেন।






Previous
Next
এত সব ঘুরাঘুরি করে এডেলাইড শহরে পৌঁছুতে রাত প্রায় ১০টা। এডিলাইডের মারকিউরি হোটেলটা একদম শহরের হটস্পটে। এই হোটেল সেই এপ্রিলে কুবার পেডি যাবার জন্য বুকিং দেয়া। সে তো তখন কোভিডের জন্য ভণ্ডুল হয়ে গেলো। বাকি সব হোটেল টাকা পয়সা ফেরত দিলেও এরা ফেরত দেয় নাই। ভেবেছিলাম বুঝি টাকাটা জলেই গেলো। মারকিউরি হোটেলের পেছনে হিন্ডলে স্ট্রিট, খুবই জমজমাট একটা রাস্তা। খাবারের দোকান গুলো বেশিরভাগই রাত ১২টা পর্যন্ত খোলা থাকে। একটা মিডল ইস্টার্ন কাবাবের দোকান খোলা দেখে ঢুকে পরলাম। আমার ছোটো ছেলের চোখ ঘুমে ঢুলু ঢুলু, আর কত! ওকে জাগিয়ে রাখার জন্য এখন একমাত্র মোবাইলের ১৫%চার্জই ভরসা। দ্রুত কাবাব আর রাইস অর্ডার দিয়ে এসে চেয়ারে বসেই বললাম,’ যাক এডেলাউড মারকিউরি হোটেলের টাকাটা মাইর গেলো না!’
সকালে উঠে রিয়াদ জানালো আমরা ইনেস ন্যাশনাল পার্ক ড্রাইভে যাচ্ছি। যদিও ডেস্টিনেশন প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টা, তবুও ইয়র্ক পেনিনসুলা ড্রাইভটা নাকি অসাধারণ, এমনই রিকমান্ড করেছিলো একজন। আমি একটু কুঁইকুঁই করে বললাম,’তোমার পায়ে সমস্যা নিয়ে এতো দূর ড্রাইভ করবা?’ ও উত্তর যা দিলো তার মানে করলে দাড়ায়, আভি নেহি তো কাভি নেহি! অতএব বললাম, তথাস্তু!
বিসমিল্লাহ করে রওনা দিয়ে এক টানে দুই ঘণ্টা। মাঝে তেল নিতে একটু সময় থামা। প্রথম ব্রেক নিলাম আরডোসান বলে একটা লোকালিটিতে। যতদূর বুঝলাম এদিককার লোকালিটি গুলা খুবই ছোটো ছোটো। আর্ডোসানে ইনফরমেশন সেন্টার থেকে জানা গেলো ওখানে একটা বেকারী আছে, খুবই চমৎকার ওদের পাই গুলি। তখন প্রায় দুপুর পৌনে একটা। ওমা বেকারিতে গিয়ে শুনি এর মধ্যে সব পাই সোল্ড আউট। এইটা কোনো কথা হলো? যা হোক একটা ফিস এণ্ড চিপস্ এর দোকান দেখে ওখান থেকে টেইক এওয়ে খাবার নিলাম। এরপর পাশেই বীচে একটু উঁকি দিয়ে আবার পথে।
প্রায় ৪৫মিনিট পরের এডিথবার্গ। এটাও খুব সুন্দর একটা ছোট লোকালিটি। নেকস্ট ডেস্টিনেশন সুলতানা পয়েন্ট। আসলে এডিথবার্গ আসার মূল কারণ এই সুলতানা পয়েন্ট। ম্যাপে ‘সুলতানা’ নামটা দেখেই বায়না ধরেছিলাম ওখানে যেতেই হবে। গিয়ে দেখি ছোট এই সৈকতটা আমার নামে যেমন তেমন দেখতেও আমার মতোই সিম্পল কিন্তু কিউট ( হে: হে: নিজের নামে এক গেলাস ভাত বেশি খাইলাম আর কি!)। দেখলাম সৈকতে তাবু খাটিয়ে কয়েকটি গ্রুপ গল্প করেছে। আবার কেউ কেউ কায়াকিং আর ওয়াটার স্কিয়িং করছে। সাগরের পানিটা সবুজাভ নীল ঢেউয়ের তালে তালে শুভ্র বালির সৈকতে নেচে নেচে ছুঁয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত একটা প্রশান্তির ছোঁয়া সবখানে।
ওখান থেকে বের হয়ে গেলাম মেরিয়ন বে। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ মনে হলো এ যেনো অস্ট্রেলিয়া নয়, কক্সবাজারের নির্জন কোনো রাস্তা! কেমন যেনো একটু বাংলাদেশের ফিলিং হলো। মেরিয়ন বের পেঙ্গুইন পয়েন্টে গিয়ে দেখি ছোটো ছোটো বাচ্চারা পানিতে খেলছে। জুহায়র ঘুরতে এসেছি পর্যন্ত পানিতে নামার জন্য অস্থির হয়ে আছে। ওই বাচ্চাদের দেখে ও তখনি নামতে চাইলো। ওখানে ওকে নামতে দিতেই হলো। কথা হলো ইয়র্ক পেনিনসুলা একদিনের ড্রাইভে সম্পূর্ণ কাভার দেয়া সম্ভব না। কিন্তু আমাদের ওখানে থাকার কোনো প্ল্যান ছিলো না বলে ভেবেছি যতটুকু সম্ভব দেখে যাই।হাতে সময় কম হলেও বাচ্চারা জলকেলি করে মেরিয়ন বে থেকে বের হতে হতে ছয়টা বেজে গেলো।
মেরিয়ন বে এর পরই ইনেস ন্যাশনাল পার্ক। পার্কটার সৌন্দর্য বর্ণনা করার মতো ভাষা আমার নেই। সময় স্বল্পতার কারণে অসংখ্য দর্শনীয় জায়গা বাদ দিয়ে কেবল ড্রাইভে দুইপাশে দেখতে দেখতে চললাম। সময় নিয়ে ঘুরলে ওখানে বনের ভেতরে অনেক ক্যাঙ্গারু, ইমু, লিজার্ড এমন আরো নানা রকম প্রানী দেখা যায়। আমাদের একেবারে টাইট সিডিউল। একটু একটু করে থামলাম শুধু তিনটা জায়গায়, ইনেস্টন বলে একটা জায়গায়, কেইপ স্পেন্সার লাইট হাউজ আর ওয়েস্ট কেইপে।সব সুন্দর হলেও কেইপ স্পেন্সার লাইট হাউজে যাবার রাস্তাটা আনবিলিভএবলি সুন্দর। আমি কোন ভাষায় তার সৌন্দর্যের গভীরতার কথা বলবো জানি না। জাস্ট মাইন্ড ব্লোইং। ওখানে গিয়ে মনে হলো কি অত্যাশ্চর্য নিখুঁততায় করুণাময় এই সব সৃষ্টি করেছেন। মনে মনে আউড়ালাম, ‘ফাবিআইয়্যি আ-লা-য়ি রব্বিকুমা-তুকায্যিবা-ন্। অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন কোন অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে?’
এতটুকু দেখতে দেখতেই ঘড়ির কাটা সাড়ে সাতটা পার হয়ে গেছে। জিপিএস এ এডেলাইড হোটেলে ফেরার এস্টিটিমেটেড ট্রাভেল টাইম দেখাচ্ছিলো রাত এগারটা। অতএব এবার ফেরার পথ ধরতেই হলো।
২০২০ এমন একটা বছর ছিলো যার প্রতিদিনকার ঘটনাবহুল দিনলিপি লিখতে গেলে বই হয়ে যাবে। তাই আর সবার মতোই বছরটা শেষ হবার অপেক্ষায় আমরাও ছিলাম। আসলে নতুন বছরে সব সমস্যা সমাধান হবে তা তো না, তবুও নতুন বছর মানে নতুন করে শুরু করার অনুপ্রেরণা।
ইয়র্ক পেনিনসুলা থেকে ফেরার পথে ভাবলাম আগের দিনের মতো রাতের খাবারে রাইস আর কাবাব হলে ভালো হয়। ভেতো বাঙ্গালী যেহেতু সারাদিনের ক্লান্তিতে এক মুঠো ভাত খেয়ে একটা ঘুম দেয়া ছাড়া অন্যকিছু ভাবতে পারলাম না। তবুও বাচ্চাদের জন্য আগে ভাগে কিছু কিনে নিতে চাইলাম। রাস্তায় সুবিধাজনক কিছু চোখে পরলো না। রিয়াদ বললো ওই হিন্ডলে রোডের কাবাবের দোকানে ফোন দিয়ে আগের রাতের সেইম মেনুগুলি অর্ডার করে দাও, যাবার পথে ওই রোডের পাশ দিয়ে যেহেতু যেতে হবে তুলে নিবো খাবারটা।
কাছাকাছি পৌঁছুতে পৌঁছুতে রিয়াদের মাথা আর কাজ করছিলো না। প্রচণ্ড খিদা আর ড্রাইভিং এর ক্লান্তি। রাস্তায়ও প্রচণ্ড জ্যাম। হিন্ডলে রোডের মুখে গিয়ে দেখি লোকে লোকারণ্য। রিয়াদের অবস্থা তো খারাপই, ছেলেরাও ঘুমে ঢুলু ঢুলু। আমার অবস্থা যে খুব ভালো তাও নয়, তবুও ভাবলাম সামনেই তো দোকানটা চট করে গিয়ে নিয়ে আসি টেইক এওয়ে। রিয়াদ ততক্ষণে ভীড় ঠেলে কাছাকাছি এলে চট করে গাড়িতে উঠে যাবো। সময় বাঁচবে।
রাত তখন এগারটা গাড়ি থেকে নেমে কিছু দূর গিয়ে দেখি কোটি কোটি মানুষ। একটু পরে দেখি যে দোকানে খাবার অর্ডার করেছি এই দোকান আর আগের রাতের দোকান এক নয়। মোবাইল জিপিএস এ দেখলাম এক না হলেও এই দোকানটা আগেরটার থেকে মাত্র চার পাঁচটা দোকান পরেই। মনে মনে একটু বিরক্ত লাগলো নিজের ওপর কারণ রিয়াদ অবশ্যই এই নতুন দোকানের ঠিকানা জানে না।
যা হোক ভাবলাম এখন ফিরে যাবার চেয়ে নিয়েই নেই খাবারটা। দ্রুত দোকানে ঢুকে টাকা পরিশোধ করে খাবার নিয়ে বের হয়ে থতমত খেয়ে গেলাম। সামনে বিশাল জনস্রোত। রিয়াদকে ফোন দিলাম, একবার, দুইবার, তিনবার। কোনো খবর নাই। বুঝলাম ওর মোবাইলে চার্জ শেষ। হয়তো প্রচণ্ড ক্লান্তি আর খুদায় যখন বুঝলাম এত মানুষের মাঝে আমাদের গাড়ি আমি খুজে পাবো না, মাথা খারাপ হয়ে গেলো।প্রচণ্ড প্যানিকড্ লাগলো। উদ্ভ্রান্তের মতো একবার ডানে দেখি, একবার বামে। ভাবলাম কি বোকার মতো একটা কাজ করে ফেলেছি। শেষে ভয় কাটানোর জন্য কাবাবের দোকানে আবার ঢুকে ওয়াশরুমে গেলাম। চোখে মুখে একটু পানি দিতে মাথাটা একটু ঠাণ্ডা হলো। তখনি কারো কাছ থেকে ধার করা আননোন নাম্বার থেকে ও ফোন দিলো। ওর গলা শুনে আমার জানে পানি এলো মনে হলো। ও বলল কষ্ট করে আগের দিন রাতে আমরা যে মারকিউরি হোটেলে ছিলাম ওখানে যেতে, ও আসছে। আমি আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালাম না। প্রায় উড়ে হোটেল লবিতে এসে গেলাম। ভাগ্যিস রাস্তাটা মনে ছিলো আর আমার মোবাইলে একটু চার্জ ছিলো।
এতো কাণ্ড করতে করতে রাত বারোটা বেজেই গেলো। ও জ্যামের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা পর্যন্ত আমি ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। গাড়িটা যখন দেখলাম তখন যে কেমন লাগলো বোঝাতে পারবো না। আমার স্বামী আর বাচ্চাদের মুখ দেখে আমি যেনো বিশ্ব জয়ের আনন্দ পেলাম। ততক্ষণে আমার ছোটো ছেলে ঘুমিয়ে গেছে আর জুহায়র আর ওর প্রস্রাব আর চেপে রাখতে পারছে না। দ্রুত ওকে একটা পানির বোতল খালি করে দিয়ে শেষ রক্ষা হলো। শেষ পর্যন্ত গাড়ি হোটেলে ঢুকতে ঢুকতে দূরে কোথাও পটকা বেজে উঠলো। রিয়াদ বলল,’ হ্যাপি নিউ ইয়ার তানি!’ ঠিক ওই মুহূর্তে আমার যে মনের অবস্থা ছিলো তাতে আমি শুধু বলতে পারলাম,’আলহামদুলিল্লাহ!’
বছরের প্রথম দিনে আমরা রিলাক্স করেই কাটাতে চাইলাম। আগের দিনের রেশ তখনও রয়ে গেছে।তাছাড়া এডেলাইডে দুই রাত দুই হোটেলে থাকতে হয়েছে বুকিং না পাবার কারণে।আর থাকার কোনো প্ল্যান নাই।ভাবলাম দিনটা শুরু করি একটা ভালো ব্রেকফাস্ট দিয়ে। বছরের পয়লা দিন দোকানপাট বেশি খোলা নাই। তবুও হোটেল থেকে কয়েক রাস্তা সামনে একটা বেশ ভালো মানের রেস্তোরা খুঁজে পেলাম। রেস্তোরা যেমন সুন্দর খাবারের মানও বেশ ভালো। পুরো জার্নিতে প্রথমবারের মতো ইংলিশ ব্রেকফাস্ট করার সুযোগ পেয়ে সবাই খুশি।
ব্রেকফাস্টের পর আর কোথাও ঘোরার মতো এনার্জি ছিলো না বলে গেলাম গ্লেনেল্গ বীচে। এডেলাইডের মেইন বীচগুলির একটি গ্লেনেল্গ বীচ।বেশ গরম ছিলো সেদিন। তাই বীচে অনেক লোকজন। আমরা গিয়ে বীচের পাশেই বসে রইলাম অনেকক্ষণ।ইনেস ন্যাশনাল পার্ক ঘুরতে গিয়ে ড্রাইভটা পূর্ব পরিকল্পনার চেয়ে বেশি হয়ে যাওয়াতে আমাদের খুব ক্লান্ত লাগছিলো।একসময় বাচ্চারা সৈকতে ঢেউ এর সাথে খেলতে চলে গেলো আর আমি সাগর পারে বসে মাকে ফোন দিয়ে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে জরুরী কিছু আলাপ সেরে নিলাম।
ফেরার পথে সুন্দর একটা উঁচু-নিচু মাঠের নরম ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে আসার সময় জুহায়র গড়াগড়ি খেতে চাইলো। ওর দেখাদেখি ছোটোজনও উপর থেকে গড়িয়ে নিচে নামল কয়েকবার। আমি ওদের জ্যাক এণ্ড জিল ছড়াটা বললাম। তারপর আবার ফ্রিজবী খেললাম সবাই মিলে।
মনে হলো খুব দ্রুতই আড়াইটা বেজে গেলো।সকালের ব্রাঞ্চ তখনো পেটে। টেইক এওয়ে লাঞ্চ নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। পথিমধ্যে থামলাম মাউন্ট লফটি। মাউন্ট লফটি সাম্মিট থেকে পুরো এডেলেইড শহরটা দেখা যায়। ওখানে বসে সাথে আনা লাঞ্চ শেষ করতে করতে এডেলেইড শহরকে এবারের মতো বিদায় জানিয়ে এলাম।
ওই ক্যালটেক্সের দোকানে অনেক ভিড় ছিলো। পিজ্জা হতে এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। দোকানীকে বললাম,’কয়েকটা ফ্রেশ ডিম হবে রাতটা ম্যানেজ করে নেবো?’ দোকানী নাই বলেও পরে ওর কিচেন থেকে ছয়টা ডিম এনে দিলো। যদিও তার কোনোটাই দরকার হয় নাই। ওইদিন খানিক পরেই আরেকটা দোকান বন্ধ হই বই করছে, আমরা সুযোগ পেয়ে দ্রুত টেইক এওয়ে খাবার নিয়ে নিয়েছিলাম। আসতে আসতে ভাবলাম, মানুষের সাইকোলজি আর সৃষ্টিকর্তার খেল বড়ই বিচিত্র। কারো জন্য কারো দিন থেমে যায় না। তবে একটা পুরানা সত্য কথা যুদ্ধের ময়দানে একদল মানুষ স্বার্থপর চিন্তায় বিভোর থাকে আর আরেক দল গায়ে পরে উপকার করে।যুগে যুগে ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়। কে কি করবে না করবে সিদ্ধান্ত যদিও তার নিজস্ব তবে মানবতার খাতিরে চিন্তা করলে দু:স্বময় মানুষ চেনার আসল সময়।
শেষ হইয়াও শেষ করি নাই। তাই আমাদের লাস্ট ডেস্টিনেশন ছিলো রোব। রোব নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় যাবার আগে আমার কলিগ বা পেশেন্ট যাকেই বলেছি ছুটিতে সাউথ অস্ট্রেলিয়া যাচ্ছি সেই বলেছে রোবে যেতে। ছোট এই শহরটা অসম্ভব পপুলার তার অনন্য সৌন্দর্যের জন্য, যার প্রমাণ আমরা রোবে ঢুকতেই পেয়ে গেলাম, প্রচুর টুরিস্ট এবং দেখেই বোঝা যাচ্ছে অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে জায়গাটা অসম্ভব পছন্দের।খাবারের দোকান গুলি লোকে লোকারণ্য। ছোটো ছোটো অনেক সুন্দর বুটিক দোকান। আমরা নাস্তা খেয়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে একটা খুব সুন্দর দোকানে ঢুকলাম। দোকান যেমন সুন্দর জিনিসের দামও তেমন চড়া। একটা পেইন্টিং এ চোখ আটকে গেলো, খবরের কাগজ আর এক্রাইলিক এর। দোকানী বলল পেইন্টিংটা তার বন্ধুর করা আর মডেল তার আরেক বান্ধবী। দাম ৫০০ ডলার।দোকানীকে বললাম ছবি কেনার টাকা নাই তবে একটা ছবি তুলে নিতে পারবো কিনা? সে অনুমতি দিলো। ছবিটা খুবই পছন্দ হয়েছিলো আমার।ভেতরে ছবি তুলে বাইরে এসেও তুললাম।দোকানটার বাইরে কত গুলি চক রাখা ছিলো। বাচ্চারা সেসব দিয়ে রাস্তায় খানিক আঁকা আঁকি করলো।
পরের ডেস্টিনেশনে পৌঁছাতে অনেকটা সময় ড্রাইভ করতে হবে। নিউ ইয়ার ডে অস্ট্রেলিয়াতে ছুটির দিন। অতএব ম্যাক্সিমাম দোকান পাট বন্ধ।তারপরও কয়েকটা দোকান খোলা থাকে।আটটার দিকে মেনিঙ্গিতে ব্রেক নিলাম একটা দোকান খোলা দেখতে পেয়ে। দোকানে ঢুকে পিজ্জা হবে কিনা জিজ্ঞেস করতে দোকানী বলল ফিস এণ্ড চিপস্ ছাড়া আর সব শেষ। রাতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে ওগুলো ঠাণ্ডা হয়ে যাবে আর বাচ্চারা ওগুলা খাবে না। জানা না থাকলে আর কোনো খাবার পাওয়াটা মুশকিল হবে ভেবে জিজ্ঞেস করলাম ওখানে অন্য কোনো দোকান খোলা হবে নাকি? ওমা দোকানী দিলো একটা মুখ ঝামটা,’ I don’t know!’ বুঝলাম জিজ্ঞেস করাটা ভুল হয়েছে। প্রতিটি মানুষের নিজের স্বার্থ চিন্তা থাকাটা দোষের নয়।তারপরও এই বিজন শহরে যেখানে খাবারের সন্ধান খুবই অপ্রতুল সেখানে সে এমন না করলেও পারতো। আমি নিজেও একটা রিজিয়নে থাকি বলে জানি এসব জায়গায় সবাই সবাইকে চেনে। যা হোক দোকান থেকে বের হয়ে রাস্তা পার হয়ে আসার সময় ভাবছিলাম কত রাতে পৌঁছে যে খিচুড়ী রাঁধবো? বাচ্চারা না খেয়ে ঘুমিয়ে না গেলেই হয়। গাড়িতে উঠবো তখন একটা লোক ‘লেডি লেডি’ করে পেছন থেকে ডাক দিলো। অবাক হলেও বললাম,ইয়েস? লোকটা বলল,’ I heard you asking that lady in the shop. Yes, there is another shop. If you just drive past that block you will see Caltex and they sell pizza or something else. I am a local, so I could not tell in front of her, you understand!’ আমি আশ্চর্য হয়ে শুধু বললাম,’ I really appreciate your help. Thanks for running behind me to tell!’ আর কি বলবো বুঝে পেলাম না।
ঝরঝরে রোদেলা দিনে রোবের সাগরে চমৎকার সবুজাভ নীলের খেলা।এখানেও গাড়ি নিয়ে বীচে নামা যায় অন্যান্য গুলোর মতোই।সাগর পারে দাঁড়িয়ে দূরের গাড়িগুলি খানিকক্ষণ দেখলাম। তারপর গেলাম দি অবেলিক্স নামের একটা পয়েন্টে। অবেলিক্স পয়েন্ট দেখে বাড়ি ফিরে আসতো নাবিকেরা অনেক বছর আগে।সেখানে আমার পাশে এক মহিলা এসে দাঁড়ালো। এক নজর দেখে মনে হলো ক্যান্সারে আক্রান্ত অবশ্য নাও হতে পারে।চেহারা দেখে মানুষ বিচার করা ঠিক না, তবুও মাথায় চুল নেই,ফ্যাকাশে সাদা চেহারা দেখে মনে হলো। আমার দিকে তাকিয়ে খুব সুন্দর একটা হাসি দিয়ে বললো,’ Isn’t that beautiful?’ আমিও হেসে উত্তর দিলাম,’ Absolutely amazing!’
সেখান থেকে গেলাম একটু সামনে একটা লুকআউট যেখান তোকে ৩৬০ ডিগ্রি ওশেন ভিউ দেখা যায়। ডানে বামে যেদিকে তাকাই বিশাল সমুদ্র। ঢেউ এসে আছড়ে পরছে পারে। ডিঙ্গি নৌকা, স্পিড বোট চলছে। অসংখ্য সি-গাল উড়ে বেড়াচ্ছে চারপাশে। সমুদ্রের বিশালতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে অনেক ক্ষুদ্র মনে হলো। বেশ অনেকটা সময় অপলক তাকিয়ে থেকে মনে মনে বললাম,’ হে প্রভু, আমার হৃদয়কে সাগরের মতো বিশাল করে দাও যাতে জীবনের উত্থান পতনের ঢেউগুলো আমায় এক বিন্দু বিচলিত করতে না পারে!’
এরপর আরো দুই একটা পয়েন্ট দেখে খাবার কিনে লং বীচ বলে একটা জায়গায় গেলাম। সাগরের পারে গাড়ি নামিয়ে বালিতে চেয়ার নিয়ে বসে বসে খেতে চাইলাম। কিন্তু প্রচণ্ড বাতাসে বালি এসে খাবারে পরছিলো। তাই আবারো গাড়িতে ঢুকে যেতে হলো। মন চাইলো ওখানে অনন্তকাল বসে থাকি। কিন্তু বাস্তবে এক মিনিটও সুস্থির হয়ে বসতে পারলাম না। বাচ্চা ছোটোটা খাবার নিয়ে জ্বালাতন করছিলো আর বড়টা ওর বাবার সাথে ক্যাচাল লাগায় দিলো। শেষে বললাম, বন্ধু, চলো বাড়ি ফিরি, আর নয়!
আর কি তারপর বাড়ি ফেরার পথে এক জোড়া দম্পতি, তাদের দুই ছানা পোনা নিয়ে। দূর থেকে কেউ যেনো বলে উঠলো,’Country road, take me home!’
সবকিছুর শেষে কিছু কথা বলতেই হয়। আর সে কথা একান্ত কিছু কথা।এবারের ট্যুর আর ট্যুরকালীন ট্রাভেলগ লিখতে পেরে আমি খুবই শান্তি বোধ করছি। আগেই বলেছি এবারের ট্যুর একেবারে অন্যরকম। I had to write it up. আসলে বর্তমান পৃথিবীর পরিস্থিতিতে এরকম করে ট্যুর করার কথা ভাবতেও সাহস লাগে। আমরা যখন ট্যুর প্ল্যান করছি তখন দেশে আমার অনেক আত্মীয় স্বজন অসুস্থ। যারা HDU ঘুরে এসেছেন এখনো তারা উঠে দাঁড়ানোর শক্তি ফিরে পায়নি। নতুন করে আরো অনেকে আক্রান্ত হয়েছে গত কয়েকদিনে।সাউথ অস্ট্রেলিয়াতে ট্যুরে যাবার সিদ্ধান্ত যখন নেই তখন মনের অবস্থা বেশি খারাপ ছিলো। আমাদের বুকের ভেতরের যন্ত্রনাটুকু ব্যক্ত করে বোঝানোর ভাষা নাই।তারপরও ছুটি ঠিক হবার পর একটা এস্কেপ দরকার বলে আমরা অল্প সময়ের সিদ্ধান্তে বুকিং দেই।ট্যুরটা এমন করে সাজাই যাতে ড্রাইভিংটা রিয়াদের জন্য বেশি লেবোরিয়াস হয়ে না যায়।কোথাও যেতে হলে জায়গা সম্পর্কে যতো রিসার্চ আমিই করি কিন্তু এবারে যাবার আগে আমার কুত্তা পাগল টাইপ ব্যস্ততায় পারি নাই।ওখানে গিয়ে বুঝলাম আমরা আসলে নিজের অজান্তে একটা গ্রেট ট্যুর প্ল্যান করে ফেলেছি আর তা হেলো গ্রেট সাউদার্ন ওশেন ড্রাইভের একমাত্র ক্যাঙ্গারু আইল্যান্ড ছাড়া বাকি সব কাভার করা হয়েছে।
একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা না বললেই নয়। সাউথ অস্ট্রেলিয়াতে আমরা যখন যাই তখন ওদের কোভিড কেইস জিরো। যতগুলি জায়গায় আমরা গিয়েছি , যত দোকানে ঢুকেছি সবখানে আমরা কোভিড প্রোটোকল মেনে নাম ফোন নম্বর দিয়ে এসেছি। আমার হ্যাণ্ড ব্যাগে সেনিটাইজার আর মাস্ক তো ছিলোই। সব জায়গায় প্রচুর মানুষ হলেও আমরা যতটুকু সম্ভব ভিড় এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করেছি। আমরা যখন ঘুরে বেড়াচ্ছি তখন নিউ সাউথ ওয়েলস্ আর ভিক্টোরিয়াতে নতুন করে ক্লাস্টার শুরু হয়। আমরা প্রতিদিন সকালে উঠে সবার আগে নিউজ দেখে তারপরই হোটেল থেকে বের হয়েছি।
২০২০ এর আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আমরা ভিক্টোরিয়ানরা স্টেজ ৪ লকডাউনে ছিলাম। কেউ কাউকে দেখা তো দূর সন্ধ্যা হলেই কারফিউ। এই বেলা আমি অস্ট্রেলিয়ান এবং ভিক্টোরিয়ান সরকারকে অন্তরের অন্ত:স্থল থেকে ধন্যবাদ দিতে চাই। একটা দেশের সরকার অর্থনীতির উপরে মানুষের জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছে বলেই অস্ট্রেলিয়া রিলেটিভলি বেটার। মানুষ মাত্রেই ভুল। তবে সেসব ভুলে পরে না থেকে সরকার তার কাজ করে গেছে এবং করে যাচ্ছে। It’s a big example to mankind.
এবারের দীর্ঘ ভ্রমণ বাচ্চারা বেশ উপভোগ করেছে। ছয় বছরের গ্যাপ দুটি বাচ্চার। তারপরও এরা খেলা করেছে নিজেরা। জুহায়র অবশ্য বিগ ব্যাশ দেখার জন্য অনেক অস্থির ছিলো। ছোটোটা দুষ্টের শিরোমণি। সব কিছু দখল করে রাখে। ওর জ্বালায় জুহায়র নিজের ইচ্ছা মতো টিভিতে কিছুই দেখতে পারে না। এজন্য জুহায়রকে আমার আলাদা করে প্যাম্পার করতে হয়। ইনেস ন্যাশনাল পার্ক থেকে আসার সময় ওর প্রশ্ন,’ মা কেনো আমাদের এতো সাইট সিয়িং করতে হবে?’ বললাম,’করতে হবে তা নয়, তবে করলে ভালো লাগে, ফ্রেশ হয় মন। যেমন তুমি ক্রিকেট খেলা দেখো টিভিতে, দেখলে তোমার মন ভালো হয় তেমন!’
যাহোক ভ্রমণ কাহিনীটাতে ভ্রমণ ছাড়াও অনেক গুরুগম্ভীর কথা বলেছি। সুন্দর জায়গার বর্ণনা দেবার ছলে এসব লেখায় লেখনী দির্ঘায়িত করেছি বিশেষ কারণে। ভুলে যাবার আগেই সম্পূর্ণ লিখে শেষ করেছি যাতে আজীবন মনে থাকে। যারা আমার ছবি দেখেছেন এবং দীর্ঘ বর্ণনা পড়েছেন তাদের অশেষ ধন্যবাদ। সবার জন্য দোয়া ও ভালোবাসা রইলো।
এই ভ্রমণ কাহিনীটি পূর্বে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখকের সম্মতিক্রমে ভ্রমণ কাহিনীটি ঘুরুঞ্চিতে পুনরায় প্রকাশ হলো।