২০০০ সাল নাগাদ এক বৌদ্ধ ধর্মযাজক গভীর জঙ্গলের মাঝে একটি ঝর্ণার নীচে বসে ধ্যান করতে শুরু করেন। স্থানীয় ভাষায় এই বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে বলা হতো ভান্তে। এই ভান্তে, সপ্তাহের ছয়দিন এই নির্জন এলাকায় বসে ধ্যানমগ্ন থাকতেন ও শুধু রবিবার আহারের জন্যে উপরে উঠে আসতেন।
এলাকাটিতে ছিল বন্য শুকর, হরিণ, ভাল্লুক, বন বিড়াল এর বিচরণ। তাই আশেপাশের তঞ্চঙ্গ্যা ভূমিপুত্ররা তেমন একটা যেতো না। স্থানীয় তঞ্চঙ্গ্যারা এই বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কথা জানতে পেরে দিনের একটা নির্দিষ্ট সময়ে এই ভান্তের জন্যে খাবার নিয়ে যেতো। তখনই স্থানীয় লোকজন প্রথম এই ঝর্ণার কথা জানতে পারলো। ধীরে ধীরে স্থানীয়দের কাছে থেকে এই ঝর্ণার কথা ছড়িয়ে পড়লো আমাদের মতো পাহাড় আর ঝর্ণা প্রেমিদের মাঝে। যে বিলাইছড়িতে এক সময় কোনো পর্যটকের আনাগোনা ছিল না, সেই বিলাইছড়িতে ভীর জমতে শুরু হয়ে গেলো ঝর্ণা প্রেমিদের।
স্থানীয় তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় ” ধুপ ” হলো সাদা, আর পানি হলো পানি। ধুপপানি ঝর্ণার অর্থ হচ্ছে সাদা পানির ঝর্ণা। সত্যিই প্রায় ৫০০ ফুট উঁচু থেকে যখন ঝর্ণার পানি নিচে পড়তে শুরু করে, তখন পানির রং হয়ে উঠে সাদা। ধুপপানি নামের সার্থকতা সেখানেই।
ধুপপানি ঝর্ণায় যাবার পথ কিন্তু খুব একটা সহজ নয়। কারণ ঝর্ণার আশেপাশে থাকার কোনো ব্যবস্থানেই। আর নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্ত প্রতিরক্ষা বাহিনী, স্থানীয়দের ছাড়া অন্য কাউকে থাকার অনুমতিও দেন না। তাই আপনাকে এই ঝর্ণার সৌন্দর্য উপভোগ করতে খুব ভোরে নৌকায় রওনা দিতে হবে। আগের দিনেই নৌকা রিজার্ভ করে রাখা এবং সকালের নাশতার ব্যাবস্থা করে রাখতে হবে। আর কিছু হালকা শুকনো খাবার ও পানি নিতে ভুলবেন না।

আমরা বিলাইছড়ি থেকে যাত্রা শুরু করেছিলাম ভোর ৫ টার দিকে। পথে যাবার সময় দুই জায়গায় জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিয়ে, নাম নিবন্ধন করে, ছবি তুলে প্রায় তিন ঘন্টা কর্ণফুলী নদীর উপরে নৌকায় চড়ে গিয়ে পৌছালাম বিলাইছড়ির ফারুয়া ইউনিয়নের উলুছড়িতে। উলুছড়ি থেকে শুরু হলো ট্রেকিং। সাথে উলুছড়ি থেকে স্থানীয় একজন গাইড (বাধ্যতামূলক)। পথে একেবারে ধুপপানি পাড়া ছাড়া আর কোনো বসতি বা দোকান দেখতে পাইনি।
উলুছড়ি থেকে ধুপপানি পাড়ায় পৌছতে সময় লেগেছিলো দুই থেকে আড়াই ঘন্টা। পুরো পথের অর্ধেকটা সমতলে আর বাকি অর্ধেক পথ হাঁটতে হয়েছিল পাহাড়ে। পাহাড়ি পথে পর পর তিনটি পাহাড়ে ডিঙিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম হবে ধুপপানি পাড়ায়। পথে দুই তিনটি ঝিরিরও দেখা পাওয়া গেলো। পাড়ায় স্থানীয় তঞ্চঙ্গ্যারা যেনো আমাদের জন্য পাহাড়ি কলা, ভুট্টা সিদ্ধ, ডিম সিদ্ধ, লেবুর সরবত, মৌসুমি ফল ইত্যাদি নিয়ে অপেক্ষা করছিলো। আমরা একটা দোকানও দেখলাম চা বিস্কুট খাবার জন্যে।
ধুপপানি পাড়া থেকে আনুমানিক আধা ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে, একটি প্রায় ৭৫ ডিগ্রি খাঁড়া পাহাড় বেয়ে নামলেই অনিন্দ্য সুন্দরী ধুপপানি ঝর্ণাকে।
ঝর্ণা থেকে ফেরার পথে বিকেল চারটের মধ্যেই প্রথম নিরাপত্তা চৌকি অতিক্রম করতে হবে। যদি একইদিন কাপ্তাই ফেরার পরিকল্পনা থাকে তবে বিকেল ছয়টার মধ্যেই বিলাইছড়ি অতিক্রম করতে হবে। আমাদের বিলাইছড়ি থেকে ভোর পাঁচটায় রওনা দিয়ে ঝর্ণা দেখে বিলাইছড়িতে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যে সাড়ে ছটা বেজে গিয়েছিলো। আর সেখান থেকে সাথে সাথেই রওনা দিয়ে কাপ্তাই পৌছতে রাত নটারও বেশি বেজে গিয়েছিল। পথে নিরাপত্তা চৌকিতে অনেক কথা বলে দেরি হবার কারণ বোঝাতে হয়েছিল।
বিঃদ্রঃ ঝর্ণার নীচে, যে স্থানে বসে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ধ্যানমগ্ন থাকতেন, সেখানে আমরা পৌঁছানোর আগেই এযুগের সমতলের ভান্তেরা স্থানটি দখল করে নিয়েছিল। এক ঘন্টা ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করার পরও জায়গাটা খালি পেলাম না। তাই বিষণ্ণ মনে ফিরে আসতে হলো আমাকে, আর সেখানের ছবিও তোলার সুযোগ হলো না।