যাইতেছিলাম বিভাগের বড় বোন কাম অফিস কলিগ ফারজানা আপা, এবং আরেক অফিস কলিগ সোনিয়া আপা সহ। সাতসকালে জ্যামাইকা থেকে ম্যানহাট্টান গিয়ে বাসে উঠতে হবে। তাই … ফারজানা আপা সকাল সাড়ে পাঁচটায় ফোন দিলেন: আচ্ছা ফারহানা, শোন তুমি কি ল্যাপটপ নিবা! আমি বললাম ল্যপটপ খোলার তো সময় পাবোনা আপু! তিনি বলেলেন, কি যে করবো বুঝতেছিনা বুচ্ছ! আচ্ছা শোন, বেশি পানি খেয়োনা, ওরা নাকি বাসের বাথরুম ব্যবহার করতে দিবেনা, ইত্যাদি ইত্যাদি…! যাইহোক শুরু হল আমাদের নায়াগ্রা যাত্রা…..সে এক তিন দিনের বাস ট্যুর, বাস’ই আমাদের বসার ঘর, শোবার ঘর, ঘুম ঘর কাম বাথরুম (যদিও সেটা ব্যবহারে ১৪৪ ধারা জারি ছিল)।
আমাদের বাসের গাইড এ্যংলো চাইনীজ ম্যান্ডি আপা। তিনি বাসে উঠার কিছুক্ষন পর সবার পাসপোর্টের কপি সাথে আছে কিনা তা নিশ্চিত হতে বললেন। মেলবোর্নে ততদিনে নয় মাস কাটিয়ে আমার নিজেকে ’অজি’ ভাবার একটা ব্রাক্ষ্মণ প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে আমি সাথে কখনো পাসপোর্টের কপি রাখার প্রয়োজন মনে করিনা।
যাই হোক, টেনশান অবশ্য আমার চেয়ে আমাদের এই ট্যুরের সফল কনভেনার ফারজানা আপার’ই বেশি ছিল যিনি সকাল সাড়ে পাঁচটায় ফোন দিয়ে আমাকে পানি বেশি খেতে মানা করলেও পাসপোর্টের কপি সাথে রাখার মত ’তুচ্ছ’ বিষয়টিকে উল্লেখ করার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন … তো আপা তার চাাচাকে বিষয়টা জানালেন, চাচা চুপচাপ চেপে যেতে বললেন আর কি! তাতে লাভই হয়েছে কারণ নায়াগ্রা জলপ্রপাতে কেউ পাসপোর্ট চেক করে নাই!

তো নায়াগ্রা যেতে গিয়ে আমাদের পেনিনসিলভেনিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি, ম্যারিল্যান্ড কাউন্টি প্লাস স্টেইটস ইত্যাদি ইত্যাদি পাড়ি দিতে হল। মাদাম তুসোগ, ক্যাপিটল হল, এয়ার এন্ড স্পেস যাদুঘর, আব্রাহাম মোরিয়াল, ওয়াশিংটন মনুমেন্ট, গ্লাস ফ্যাক্টরী আরো নানা জায়গায় থামা আর আমাদের ছবি তোলার হিড়িক। কখনো সেলফি তো কখনো একে ওকে রিকোয়েস্ট- ও আপা, ও ভাই একটা ছবি তুলে দেন! প্লিজ লাগে !! আর বাকি দু’জনের চেয়ে ছোট হবার কারণে সকল রিকোয়েস্ট আমারই করতে হয়েছে।
সেই ভাইদের একজন ছিলেন লম্বা তাগড়া যোয়ান, আমরা বারাক ওবামার বাড়ীর (হোয়াইট হাউস) রান্নাঘরের দিকে গিয়েছি আর সেই ভাইকে বললাম ছবি তুলে দিতে। তিনি ছবি তুললেন কিন্তু পিছনে ওবামা নাকি ওসামার বাড়ী তা বোঝার কারো সাধ্যি নাই !! প্রতিটিা জায়গায় তিনি আমাদের ছবি তোলার একমাত্র ভলান্টিয়ার আর প্রতিটা ছবি তোলায় তার নানান কাহিনী। এভাবে দাঁড়ান, এভাবে পোজ দেন এইসব আর কি !! আমরা বিরক্ত কিন্তু কি করবো কাউকে পাইও না। এর এক ফাঁকে তিনি পরিচয় পর্ব সারার জন্য জানালেন যে তিনি পাকিস্তানী আর্মিতে কাজ করেন প্লাস ইউএন এর মিশনে সিরিয়া অর সামহোয়্যার ইলস এ মে বি আছেন। শুনেই মনে হইলো হায় হায় খাইছে কাজ, এতো দেখি সাক্ষাৎ হানাদার বাহিনী আর আমরা রাজাকারের মত ছবি তোলার হিড়িক লাগাইছি, লুল।
একরাত মেরীল্যান্ডে কাটিয়ে পরের দিন সবুজ আর পাহাড়, ম্যাপল গাছ, ঝর্না আর অসীম আকাশের পথ পাড়ি দিতে দিতে সন্ধ্যা সাতটার দিকে পৌঁছালাম বাফালো । মাই গড, এত্তো ঠান্ডা যে ফ্রোজেন বাইট হওয়া কোন ঘটনাই না। কোন খাবার দোকান খোলা নাই, ইতি উতি ঘুরে একটা ইন্ডিয়ান দোকানে সবাই একেকটা থালি কিনলাম ১১ ডলার দিয়ে মে বি যার অর্ধেকই আমি খেতে পারি নাই। নায়াগ্রার প্রথম অধিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের একটা অসাম প্লাস ভয়ঙ্কর সুন্দর শো দেখলাম এবং এরপর যথারীতি শো এর কলাকুশলীদের সাথে ছবি তোলার লাইনও দিলাম তিনজন মিলে। আমাদের গাইড এ্যংলো চাইনীজ ম্যান্ডি আপা রাতের নায়াগ্রা দেখাতে নিয়ে গেলেন। সেটা দেখে আমার আর ফারজানা আপার নিজ নিজ মোহাম্মদ হোসেনদের (ফারজানা আপা এবং আমার হাবির নাম মোহাম্মদ হোসেন) কথা মনে পড়ে গেল কারণ ভিউ ওয়াজ সুপার্ব।
পরের দিন আমরা ক্রুজে করে নায়াগ্রা পাড়ি দিবো, আমি আর ফারজানা আপা ভীত কিন্তু সোনিয়া আপা একটু সাহসী। সেখানে নীল রংয়ের প্রেইনকোট পড়তে দেয়া হল যা দেখে মনে হচ্ছিল যে আমরা নীল আমস্ট্রং, মিশেল কলিনস আর বাজ এলড্রিন যারা চাঁদ পাড়ি দিতে যাচ্ছি আর কি। আর নায়াগ্রা, মাই গড! এতো এতো পানি আর তার ভয়ঙ্কর সুন্দর শব্দ! সাথে পাখিদের কিচিরমিচির কলরব সব মিলিয়ে সে যেন একটা মহামায়া । একদিকে অসম্ভব ভালোলাগা আর একদিকে এতো পানি দেখে আমাদের ভয়, সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। আমি আর ফারজানা আপা যত দোয়া দরুদ পারতাম সবগুলার স্বদ্যবহার সেই মুহুর্তে করে ফেলেছিলাম আর কি !!
এপর ফেরার পালা, কিন্তু সবাই যেন সবাইকে সেখানেই ফেলে (মানসিক ভাবে) জোর করে বাসে উঠলাম। বাসে হানাদার বাহিনীর সদস্য আমাকে পাকিস্তানে তৈরী একটা মোবইিল ব্যাগ উপহার দিলেন আর ফারজানা আপা সেটা নিয়ে আমাকে ইভ টিজিং শুরু করলেন!
আমি ভদ্রতার খাতিরে নিবোনা তা বলতে পারি নাই কিন্তু আমার ইমেইল আইডি চাওয়ার পর কি যেন একটা বানায়ে বানায়ে দিয়েছিলাম ভুলে গিয়েছি।
Post Views: 65