স্বপ্নের দ্বীপ সেন্টমার্টিন যাচ্ছি। আমার জীবনে কমকরে হলেও অন্তত ২০ বার যাওয়া হয়েছে কক্সবাজার, কিন্তু বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটিতে যাওয়া হয়নি আমার তখনো। শুধু গল্পই শুনেছি। শুনেছি পরম যত্নে গড়া “সমুদ্র বিলাস” নামে বাংলো আছে কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের। মাত্র ২০,০০০ টাকায় ২২ শতাংশ জমি কিনে সাজিয়ে ছিলেন। মুলতঃ ওনার উপন্যাস থেকেই নারীকেল জিঞ্জিরা বেশি পরিচিতি লাভ করে। আমিও তখনই জেনেছিলাম, দেখেও এসেছি অযত্নে অবহেলায় পরে আছে “সামুদ্র বিলাস”। পরপাড়ে চলে গেছেন তিনি আর আসবেন না হুমায়ূন আহমেদ। কিন্তু তার পদ ধুলো পরেছিলো দ্বীপটিতে। সেই ২০১১ সালের ১৮ ডিসেম্বর নাট্যপরিচালক মাসুদ রানা, স্ত্রী শাওন, দুই সন্তান নিশাদ ও নিনিতসহ হুমায়ূন আহমেদ সর্বশেষ সেখানে এসেছিলেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক শেখ বখতিয়ার উদ্দিন এর মতে, ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে দ্বীপটিকে যখন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মার্টিনের নাম অনুসারে দ্বীপটির নামকরণ করা হয়।
প্লান করা হলো রাতের বাসে সেন্টমার্টিন যাবো, এমনি কপাল, যাবার দুইচারদিন আগেই এক্সেলেটরে পেন্সিল হিল আটকে পা মচকে এমন ব্যাথা পেলাম,পা ফুলে গেলো, যাবার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার জোগার। ডাক্তারের কাছে গেলাম এক্সরে করালাম, ভেংগে যায়নি নিশ্চিত হয়ে পায়ের যত্ন করতে লাগলাম। দিন ঘনাতেই কিছুটা ফোলা কমেছিল সে অবস্থাতেই রওনা করলাম। সারারাত আধো ঘুম, আধো জাগরণের পর ১২ ঘণ্টার জার্নি শেষে নামলাম টেকনাফের দমদমিয়া এলাকায়। সেখানে টংঘরের দোকানে বসে সেরে নিলাম সকালের নাশতা। এখানেই কাছেই সেন্টমার্টিন যাওয়ার ক্রুজ গুলোর অবস্থান।
সবার কাছে এত্ত গল্প শুনেছি,যে কল্পনায় ছবি একে ফেলেছি অনেক অনেক শুধু বাস্তবে দেখা বাকি। নাস্তা করে ক্রুজ এর অপেক্ষায়, আমার যেন তর সইছিল না, কখন রওনা দিবো। কখন অনেক অনেক ছবি তুলবো।

আমরা ক্রুজ এর দ্বিতীয় তলার টিকিট নিলাম। টিকিট কাটার পর নিতে হলো গেট পাস। পানির ওপর কাঠের তৈরি ভাংচুরা, করিডোরের মতো প্রায় ২০০ মিটার লম্বা ব্রিজ খুব ভয়ে ভয়ে পেরিয়ে উঠলাম ক্রুজে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রুজ যেন স্বাগত জানালো। চারদিকে অপরূপ পরিবেশ। সবুজের সমারোহ। দূরে আরও অনেক ক্রুজ চোখে পড়লো। একে একে লোকজনে ভরে উঠছে আমাদের ক্রুজ।
ক্রুজে চড়ে রওনা দিতেই শুরু হলো ম্যাজিক্যাল জার্নি। দ্বিতল জলযানটি ছাড়লো সকাল ৯টার কিছুক্ষণ পর। মন ভাল হয়ে গেলো,মিস্টি রোদের আলো আর শীতের সকাল। সকালের রোদে নাফ নদী ধরে সেন্টমার্টিন যাত্রা ছিল বেশ উপভোগ্য। টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনের দূরত্ব প্রায় ৩৪ কিলোমিটার। ২৫ কিলোমিটার নাফ নদী আর বাকি ১৭ কিলোমিটার খোলা সাগর। পথটুকু পাড়ি দিতে লাগে প্রায় আড়াই ঘণ্টা।
মূলত এটি কোনও নদী নয়, বঙ্গোপসাগরের বর্ধিত অংশ। তবুও এর স্থায়ী পরিচয় নাফ নদী। এর পানি সাগরের মতোই লবণাক্ত। নদী মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার এর পাহাড় গুলো দেখা যায়,মজার ব্যাপার হলো, ক্রুজ ছাড়তেই শত শত সীগাল উড়তে থাকে সাথে! সে এক অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য।
নাফ নদী পার হয়ে সমুদ্র, চারিদিকে নীল আর নীল। আকাশের নীল আর সমুদ্রের নীল সেখানে মিলেমিশে একাকার, আহা চোখ জুড়িয়ে যায়।তিন চার ঘন্টা পর পৌছালাম প্রবালদ্বীপে। টম টমে চড়ে হোটেল গিয়ে খেয়ে নিলাম দুপুরের খাবার। একটু রেস্ট নিয়ে তারপর আবার ঘোরাঘুরি।
সন্ধে হতেই দ্বীপে রুপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। অসাধারণ সেই সূর্য ডোবা, চারিদিকে অনেক রঙ ঢেলে দিয়ে সূর্যমামা বিদায় নিলেন। রাতে বিচে বসেছিলাম অনেকটা সময়, সমুদ্রের ঢেউয়ের আছরে পরার শব্দে প্রান জুরানো৷ তারপর গেলাম বাজারে, বাজারে নানা প্রকারের মাছ, কাকরার বিকিকিনির সাথে সাথে নানা রঙেরই মানুষ দেখা। সেই রাত ছিল বছরের শেষ রাত, ৩১ ডিসেম্বর, তাই সেলিব্রেট করা ঘটনাগুলো খুব স্মৃতিময়। রাত ১০ তার পর জেনেরেটরও বন্ধ। রাত গভীরের সাথে সাথে আকাশে পূর্ণিমার জোছনার আলো বাড়তে থাকে,আলো গ্রাস করে নিচ্ছিলো প্রবালদ্বীপটিকে, কারেন্ট নাই, প্রবালের উপর আছড়ে পরছে ঢেউ। রাত যত বাড়ছে অপার্থিবতায় ছেয়ে যাচ্ছে চারিদিক।





সমুদ্র আমায় বরাবরই ডাকে। আমি এগিয়ে যাই, তার কাছে, তীর ধরে হাটি। রাত তখন ১১.৩০, আমার অন্তরে বাজে মিস্টি একটা গান,
“ওই ঝিনুক ফোটা সাগর জলে আমার ইচ্ছে করে, আমি মন ভিজাবো, ঢেউ এর মেলায় তোমার হাত টি ধরে।”
বড্ড বেশি অপার্থিব। রাত ১১.৪৫ বেশ খানিকটা দূরেই কিছু ইউনিভার্সিটির ছেলে মেয়েরা আয়োজন করে বিদায় জানাচ্ছে বছরকে। গান, হই চই, কেউ কেউ আকাশে উড়ানোর জন্য ফানুশ ধরে আছে। এগিয়ে গেলাম ওদের দিকে। নতুন জীবনের হাতছানি।
১-২-৩-৪-৫- ৬-৭-৮-৯…..১২.০১ এ.এম. হ্যাপি নিউ ইয়ার ।
নতুন অধ্যায় এর শুরু। অনেক্ষণ বসেছিলাম। সাগর সৈকতে। শীতে জোরোসড়ো, তাই চলে গেলাম, রিসোর্টে। পরদিন সকালে নাস্তা সেরে, ছেড়াদ্বীপ এর উদ্দেশ্যে রওনা,পায়ে যেহেতু ব্যাথা,স্পীডবোট ভরষা। আহা!!! সে আরেক বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করছে। মনে হোলো পৃথিবীর তাবত জঞ্জাল বিসর্জন দিয়ে,বিচ্ছিন্ন ভাবে একক প্রশান্তি ছেয়ে আছে আমায়। চারিদিকে শুধুই নীল নীল আর নীল। মনে হলো একখন্ড দ্বীপে ভেসে আছি,সাথে কিছু গোলপাতা। কোথাও কেউ নেই।
মাথায় যখন চড়া রোদ,এবার ফেরার পালা, দূরে এক ডাবঅলা ডাব বিক্রি করছেন। নারীকেল জিঞ্জিরায় আসলাম ডাব খাবোনা! এক ডাব তিন জন খেতে পারবে ইয়া বিশাল,তাই খেয়ে পেট ফুলে ঢোল, তার পর কচি নারীকেল। আহা!!!
ফিরে এসে দুপুরের খাওয়া, ঘুরে ফিরে দেখা, নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে, ছোট্ট খাট্ট কেন্ডেল লাইট ডিনার। পর দিন ফিরে আসা ইট-পাথরের নগরীতে। খুব ভালো লেগেছিলো প্রথম দেখা বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, দারুচিনি দ্বীপ, নারীকেল জিঞ্জিরা বা সেন্ট মারটিন।
ইচ্ছে ছিলো প্রতিবছরই বর্ষ বরণ করবো যতদিন বেচে আছি। বিধাতা হয়তোবা মুচকি হেসেছিলেন। আমার আর যাওয়া হইনি। হবে কিনা জানিনা আর কোনোদিন। আমাদের এমন একটি দ্বীপকে আমরা নস্ট করে ফেলেছি নিজেদের সচেতনোতার অভাবে। বহুদূর থেকে দেখেছি তারে, বলেছি বিদায় প্রবালদ্বীপ,ভাল থেকো তুমি!!! অনেক স্মৃতি ফেলে গেলাম যেমন, নিয়েও এলাম তার চেয়ে বেশিই !!!
জীবনে একবার হলেও ঘুরে আসা উচিৎ। মিস করবেন না কেউ সুযোগ থাকলে,এখনো হারিয়ে যায়নি নারীকেল জিঞ্জিরা,শুনেছি প্রবাল গুলো মরে যাচ্ছে,কিছুদিন পর সুযোগ পেলেও পরিবেশ নাও পেতে পারেন।