সমগ্র অস্ট্রেলিয়ার আভ্যন্তরীণ ভূদৃশ্যে হাজার হাজার প্রজন্মের আদিবাসীদের স্মৃতি মুদ্রিত রয়েছে। অস্ট্রেলিয়াতে আদিবাসীদের বসবাস কমপক্ষে ৫০ হাজার বছর পুরোনো। আদিবাসী লোকেরা যে জায়গাগুলোতে বাস করতেন, চলাফেরা করতেন, পরিবেশ থেকে খাবার সংগ্রহ, শিকার, খাওয়া-দাওয়া করেছেন সে সব জায়গাতে তারা তাদের নিজেদেরকে শৈল্পিকভাবে প্রকাশ করেছিলেন। এসব জায়গাগুলোতেই তাদের বাপ-দাদাদের দেহ এবং আত্মা বিশ্রামে আছে। কাজেই আবরিজিনাল কমুউনিটির কাছে এই সকল কালচারাল সাইটগুলো আবরিজিনাল কমুউনিটির আধ্যাত্মিক চর্চার স্থান এবং এগুলোকে কেন্দ্র করে নানা আনুষ্ঠানিক আচরণ পালন করা হয়। যদিও সংরক্ষণের অভাবে অথবা পর্যাপ্ত ডকুমেন্টশন না থাকায় অনেক কালচারাল সাইটগুলোর যেমন আধ্যাত্মিক (পূজা-অর্চনা) আনুষ্ঠান পালন, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠান, শত বর্ষের পুরোনো ঐতিহ্যগত গাছ এবং তাদের বাণিজ্য ও ভ্রমন পথের বর্তমানে কোনো অস্তিত নেই। তবে, তার মানে এই না যে এই মাটি ও পরিবেশ তার আধ্যাত্মিক মর্যাদা হারিয়েছে। এ সকল সাইটগুলো বর্তমানে সংরক্ষিত আছে এবং সংরক্ষণের প্রচেষ্টা চলছে।

ইয়েডনবা আদিবাসী সাইট

অস্ট্রেলিয়ান নেটিভ পাইন গাছ
ইয়েডনবা (Yeddonba) আদিবাসী সাইট
ইয়েডনবা (Yeddonba) আদিবাসী সাইটটি স্থানীয় আদিবাসীদের মধ্যে (ধুধুরোয়া কমিউনিটি) একটি পবিত্র স্থান হিসাবে বিবেচিত। এ সাইটে ধুধুরোয়া আদিবাসী গোষ্ঠীর সংস্কৃতি, গুলবার্ন উপত্যকার (ভ্যালি) পাঙ্গারংয়ের উপ-বংশের চিত্র তুলে ধরে। মাউন্ট পাইলটের (চিলটার্ন, ভিক্টোরিয়া) নিচের ভূমিতে ধুধুরোয়া (Dhudhuroa ) আদিবাসী, কোয়াট কোয়াট্টা এবং মিনজাম্বুতা বংশের সাথে আধ্যাত্মিক এবং শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের স্থান হিসাবে ব্যবহৃত হতো।
ইয়েডনবা সাইটটির বেশ গুরুত্ব বহন করে। এখানে রয়েছে আশ্রয় নেবার মতো পাথুরে গর্ত (রক শেল্টার) এবং বুশ টাকার এরিয়া। বুশ টাকার হলো “বুশ ফুড”, অস্ট্রেলিয়ায় আদিবাসীরা বন থেকে যে সকল খাবার জোগাড় করতেন। অনেক আদিবাসী ইয়েডনবা সাইট এলাকার বুশ ফুড নিয়ে গর্ব বোধ করেন।

রক আর্টে থাইলাসিন (বর্তমান পৃথিবীতে বিলুপ্ত)
প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব
প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের দিক থেকেও এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এখানে যে চিত্রকলা (রক আর্ট) দেখতে পাওয়া যাই তা লাল-ওকার (ফেরিক অক্সাইডযুক্ত এক ধরণের প্রাকৃতিক রঙ্গক) দিয়ে আঁকা হয়েছিল। রক আর্টে থাইলাসিন – যা দেখতে তাসমানিয়ান বাঘের মতো আঁকা হয়েছিল। মূলত থাইলাসিন বর্তমান পৃথিবীতে বিলুপ্ত। সর্বশেষ থাইলাসিনটি ১৯৩০ সালে তাসমানিয়াতে দেখা যায়। ধারণা করা হয় ইউরোপিয়ান বসতি শুরু হবার আগেই অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে থাইলাসিন বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো। ধুধুরোয়া কমিউনিটি অবশ্যই থাইলাসিন প্রাণীটিকে কাছে থেকে দেখেছিলেন এই চিত্রকলা তারই প্রমান। থাইলাসিন, গোয়ান্না (একজাতীয় লিজার্ড) এবং সাপের সাথে ধুধুরোয়া কমিউনিটির আত্মিক সম্পর্ক ছিল এবং বংশের নেতাদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের স্থান হিসাবে কাজ করত।


কিভাবে যেতে হবে:
ইয়েডনবা আবরিজিনাল কালচারাল সাইটটি চিলটার্ন – মাউন্ট পাইলট ন্যাশনাল পার্কে অবস্থিত। ক্যানবেরা এবং সিডনি থেকে হিউম হাইওয়ে ধরে চিলটার্ন (ভিক্টোরিয়া) হয়ে বীচওরর্থ-চিলটার্ন রোড ধরে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে মাউন্ট পাইলট। মাউন্ট পাইলটের পাদদেশে ইদ্দনবা আবরিজিনাল কালচারাল সাইটের অবস্থান। মেলবোর্ন থেকে হিউম হাইওয়ে ধরে চিলটার্ন হয়ে যেতে পারেন অথবা ওয়াংগারাত্তা (Wangaratta) দিয়ে বীচওরর্থ (Beechworth) হয়ে মাউন্ট পাইলট (Pilot) পৌঁছাতে পারবেন। মেলবোর্ন থেকে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ, ক্যানবেরা থেকে প্রায় চার ঘণ্টা লাগবে।
কালচারাল সাইট ভ্রমণের সময় যেগুলো করা অনুচিত:
যদিও আমাদের বাংলাদেশী কমিউনিটি সিংহভাগেরও জন্য নিচের কথাগুলো প্রযোজ্য নয়, তারপরেও জানিয়ে রাখছি। কালচারাল সাইট ভ্রমণের সময় কুকুর, বিড়াল (এবং অন্নান্য পোষা প্রাণী) সাথে নেয়া যাবে না, সাইকেল চালানো কিংবা ঘোড়া চালানো যাবে না। আবরিজিনাল কালচারাল সাইটগুলোতে ক্যাম্পিং নিষিদ্ধ এবং কোনো আগ্নেয়অস্ত্র বহন করা যাবে না। অস্ট্রেলিয়ার যেকোনো ন্যাশনাল পার্কে এবং আবরিজিনাল কালচারাল সাইটগুলোতে পূর্বে অনুমুতি ছাড়া ড্রোন উড়ানো যাবে না।
কালচারাল সাইটগুলো আবরিজিনালদের কাছে শহীদ মিনারের মতই
প্রতিটি বাংলাদেশীর কাছে শহীদ মিনার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি বাংলাদেশী শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, কেও কোনো অবমাননা সহ্য করবেন না। শহীদ মিনারে কেউ জুতা পায়ে দিয়ে হাঁটবেন সেটা কেউ মেনে নিবে না। শহীদ মিনারের পবিত্রতা রক্ষায় বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ নং অনুচ্ছেদর নির্দেশনা (সুপ্রিম কোর্টের রীট পিটিশন নির্দেশনা)। এমনকি শহীদ মিনারের আশেপাশে ভবঘুরেদের অবস্থান, অসামাজিক কার্যকলাপ ও মূল বেদিতে মিটিং মিছিল ও পদচারণা ইত্যাদি নিষিদ্ধ। ঠিক তেমনি ভাবে প্রতিটি অস্ট্রেলিয়ান আবরিজিনাল কমুউনিটির মানুষের কাছে তাদের কমুউনিটির আচার আচরণের জায়গা, বয়োজোষ্ঠদের মিলিত হবার জায়গা কিংবা যারা গত হয়েছেন তাদের বিচরণের জায়গাগুলোও সমান সংবেদনশীল। কোনো ভাবে তাদের স্মৃতির কোনোরকম অবমাননা করা চলবে না।
ঘুরুঞ্চি আবরিজিনাল কমিউনিটি নিয়ে যেকোনো লেখাকে উৎসাহিত করবে এবং এ সংক্রান্ত লেখা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঘুরুঞ্চি ম্যাগাজিনে এবং ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। বাংলাদেশী কমিউনিটির কারো যদি অস্ট্রেলিয়ান আবরিজিনাল কমিউনিটি নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকে তবে তা আমাদের জানান। এছাড়াও আমরা বাংলাদেশী কমিউনিটির নৃবিজ্ঞানীদের সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক। আপনার পরিচিত কেউ থেকে থাকলে তাকেও জানাতে পারেন।