১৯৬৩ সালে যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের (বর্তমান বান্দরবান, রাংগামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলা) জেলা প্রশাসক সুলতান-উজ জামান খান সাজেক গিয়েছিলেন তখন তাঁর সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান। সিদ্দিকুর রহমান এরপর ১৯৬৪-৬৬ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক পদেও নিয়োজিত হন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। সিদ্দিকুর রহমান ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও রিহ্যাবিলিটেশন অফিসার বা পুনর্বাসন কর্মকর্তা। পুনর্বাসন কর্মকর্তা হিসাবে তাঁর দায়িত্ব ছিল কাপ্তাই বাঁধের ফলে যে সব স্থানীয় বাসিন্দা (মারিস্যাসহ, কারণ মারিস্যাতে রিজার্ভ ফরেস্টকে ডি-রিজার্ভ করে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪০০০০ পরিবার পুনর্বাসিত হয়েছিল) বিভিন্ন স্থানে পুনর্বাসিত হয়েছিল তাদের দেখভাল করা। এ কাজে সহযোগিতার জন্য তাঁর সঙ্গে ছিলেন ৪/৫ জন সহকারী পুনর্বাসন কর্মকর্তা যাঁদের একজন ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বিখ্যাত জেলা প্রশাসক আলী হায়দর খান। সিদ্দিকুর রহমান দাপ্তরিক কাজে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় প্রচুর ঘুরে বেড়িয়েছেন। বিশেষ করে বিখ্যাত আইসিএস হ্যাচ বার্নওয়েল এর সঙ্গে তাঁর ভ্রমনের অভিজ্ঞতাও তিনি তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন। আমি বিশেষ করে আগ্রহী ছিলাম তাঁর সাজেক যাত্রার বিবরণে।
 
মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবন তরীর যাত্রী’তে লিখেছেন “কিছুদিন পর ডিসির কাছে সাজেক ভ্যালি সফর করার প্রস্তাব করলাম। সাজেক লুসাই পাহাড়ের সঙ্গে লাগানো একটা পাহাড়ের ভ্যালি- প্রায় দুই-আড়াই হাজার ফুট উঁচু। ওই সমস্ত অঞ্চলে এককালে দুর্ধর্ষ বলে পরিচিত কুকি ও লুসাই উপত্যকার উপজাতিদের বাস। কাসালং উপত্যকা পার হয়ে যেতে হয়, বাঘ-ভল্লুক, হাতি, হরিণ নানারকম জীবজন্তুতে ভরা এই এলাকা। তাই এই অঞ্চলে প্রশাসন বা সাধারন মানুষের যাতায়াত খুবই কম। ব্রিটিশ আমলের ডাকসাইটে কর্নেল-মেজর ডিসিরাও খুব কমই গেছেন। শুনেছি নিবলেট সাহেব নাকি গিয়েছিলেন অনেক আগে। সুলতান-উজ জামান সাহেব রাজী হয়ে গেলেন – সব কিছু জোগাড়যন্ত্র করে একদিন রওনা হয়ে গেলাম একটা ছাদ দেওয়া স্পীডবোটে, ডিসি আমি আর একজন স্টাফ; ডাগ আউটে এসিস্ট্যান্ট রিহ্যাবিলিটেশন অফিসার (এআরও) এবং অন্যান্য স্টাফ। মারিস্যা পৌঁছুতে পৌঁছুতেই প্রায় বিকেল – খাওয়া দাওয়া করে গভীর জঙ্গলের ভেতর দিয়ে আঁকাবাঁকা সরু পাহাড়ি নদীতে রওনা হলাম কাসালং ফরেস্টের মাঝামাঝি। কিছুক্ষনের মধ্যেই অন্ধকার হয়ে গেল। দু’ধার থেকে এখানে সেখানে গাছপালা বেরিয়ে এসেছে সেই খালের মধ্যে। মাঝে মাঝে আবার নিচে ছোট-বড় পাথর। নিচের পাথরের থেকে বাঁচতে গেলে ওপরের ডালপালায় লাগে। একবার পাথরে লেগে স্পীডবোটের ব্লেড ভেংগে গেল, আরেকবার হঠাৎ এক মোটা গাছের ডাল এসে বোটের চাল দিলো ভেংগে। সে এক অকল্পনীয় ব্যাপার। কিন্তু তবু আমরা এগিয়ে চলেছি আস্তে আস্তে। কিন্তু সামনেইতো হাতির কুম-খালটা সেখানে বেশ প্রশস্ত একটা বিলের মতো, হাতিরা সেখানে দল বেঁধে গোসল করতে নামে। যদি কুমে হাতি থাকে, তাহলে যে কি হবে তা চিন্তাই করতে পারি না।” মারিস্যা পর্যন্ত এখনো, বিশেষ করে বর্ষাকালে খোলা পানি থেকে। এরপর কাসালং খাল ধরে উজানে যেতে হয়। সন্ধ্যার অন্ধকারে বা গভীর রাতে এই সরু খালে ষাট বছর আগের ভ্রমন নিশ্চিতই ছিল এক এডভেঞ্চার।
 
“কাপ্তাই লেক হওয়ার আগে এ সমস্ত এলাকায় হাতির খেদা হতো। অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও সাহসী মাহুতেরা ট্রেনিং দেওয়া হাতি দিয়ে বন্য হাতিকে খেদার ভেতর নিয়ে এসে আটকাত, তারপর পায়ে ও গলায় মোটা দড়ির গেড়ো লাগিয়ে বন্য হাতিকে বশ করত। লেক হওয়ার পর হাতিরা সব অনেক দূরে চলে গেছে – এখন আর খেদা হয় না।”
“হঠাৎ মনে হলো দূরে একটা আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছে। সত্যিই তাই, মাছালং বাজার থেকে আমাদের কানুনগো ও অন্যান্য লোকেরা হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে আমাদের এগিয়ে নিতে এসেছে। আমাদের সন্ধ্যার মধ্যে মাছালং পৌঁছার কথা। কিন্তু রাত বারোটার পরও যখন আমাদের কোন খোঁজ খবর নাই, তারা রওনা হলো আমাদের খোঁজ করতে। যাক খুব বাঁচা গেল-মাছালং পৌঁছুতে পৌঁছুতে রাত প্রায় একটা। হাড় কাঁপানো শীত। কাঠখড়ি জ্বালিয়ে, চক্রাকার আগুনের কুণ্ড বানিয়ে তার মধ্যে গিয়েও শীতের কাঁপুনি আর কমে না। এদিকে ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। রাত প্রায় দুটার সময় খাবার দিলো – এত বেশি ঝাল তরকারী বোধহয় আমরা কেউ কোনদিন খাইনি। কিন্তু গভীর ফরেস্ট এর ভেতর সেই রাতে আমরা যে খাবার খেলাম, এত সুস্বাদু খাবার বোধহয় আর কোনদিন খাইনি। ছোটখাটো একটা বাঁশের চালাঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো।”
 
মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান আরো উল্লেখ করেন “পরদিন সকালে শুরু হলো সেই গভীর জংগলের ভেতর দিয়ে আমাদের পাহাড়ে উঠার যাত্রা। প্রায় দুই হাজার ফুট উপরে আমাদের গন্তব্যস্থল। কোথা থেকে হাতি, বাঘ বেড়িয়ে আসবে কে জানে – দল বেঁধে আমরা চলেছি। শেষের পাঁচ- সাতশো ফুট ওঠা ছিল একটা অসাধ্য ব্যাপার। একদম নাক খাড়া পাহাড় – তাও বড় বড় পাথরে ভর্তি। এক পা এক পা করে এগোনো, পাথরের পর পাথর, কখন পা ফসকে পরে যাব, কে জানে – তখন বোধহয় শ’দুয়েক ফুট উঠতে বাকি, ঘামতে ঘামতে শরীরের সমস্ত শক্তি চলে গেছে, ডিহাইড্রেশন হয়ে সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে যাবে। এমন সময় দেখি, এলুমিনিয়ামের জগ হাতে করে ইপিআরের (এখনকার বিজিবি ) জওয়ানরা পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসছে – পথের মধ্যে আমাদের লবনপানি খাইয়ে উপরে নিয়ে গেল। চূড়ার উপর পা রেখে যখন দাঁড়ালাম, সে যে কি আনন্দ-অপরূপ সৌন্দর্য – ঢেউয়ের পর ঢেউ পাহাড়। এখানকার লুসাইরা আমাদের অভ্যর্থনা করতে এলো। লালডেংগা ছিল সেই মৌজার হেডম্যান। আমার আর ডিসি সাহেবের থাকার জন্য একটা নতুন মাচাং ঘর তৈরি করে ফেলেছে তারা। ডিসি, এডিসি আর অফিসাররা তাদের দেখতে এসেছে এই দুর্গম পাহাড়ে, ওরা কল্পনাই করেনি।”
 
মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান ও তাঁর সহযাত্রীদের এই যাত্রা ছিল রীতিমতো এডভেঞ্চার। তিনি মারিস্যা হয়ে কাসালং খাল বেয়ে মাছালং বাজার যাওয়া ও সেখান থেকে পাহাড় বেয়ে সাজেকে পৌঁছানোর এক চিত্তাকর্ষক বিবরণ দিয়েছেন। অন্ধকার নদীতে বোট চালনা, হাতির কুম পার হওয়া আর পাহাড়ের সুঁড়ি পথ বেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ অনুসরণ করে সাজেক ভ্যালীতে পৌঁছানো আর ‘নাক খাড়া’ পাহাড়ের পাথর বেয়ে উঠে যাওয়া এখনকার পর্যটকরা কল্পনায়ও আনতে পারবেন না। সাজেক ভ্যালীতে তখনো ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস বা বর্তমানের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর ক্যাম্প ছিল, এখনো আছে। তখন যারা সেখানে ছিলেন তাদের সেখানে পৌঁছানো ও টহল দেয়ার অবস্থার কথা আমরা কেবল কল্পনাই করতে পারি। এখনো সাজেকের উত্তরে জপুই বা এধরনের যে ক্যাম্প বা বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) আছে সে সব জায়গায় ফুট পেট্রোল বা হেলিকপ্টারই হলো পৌঁছানোর উপায়। অথচ তারও একশত বছর আগে ১৮৬৬ সালে টিএইচ লিউইন একাধিকবার কাসালং হয়ে বিখ্যাত লুসাই চীফ রতন পুইয়া এর গ্রামে গিয়েছিলেন শান্তি আলোচনায়!

জালাল আহমেদের  আরো লেখা

 

ঘুরুঞ্চি ম্যাগাজিনের সকল কর্মকান্ড নট ফর প্রফিট, স্বেচ্ছাসেবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বর্তমানে সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। আপনি এ সকল কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে চাইলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

 

ঘুরুঞ্চির ওয়েবসাইট পরিচালনা করতে আমাদের সপ্তাহে ৮-১২ ঘন্টা কাজ করতে হয়। বর্তমানে আমাদের কাজ শুধুমাত্র স্বেচ্ছাসেবক এবং স্ব-অর্থায়নের উপর নির্ভর করে। আপনারা ঘুরুঞ্চিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে, অনুদান দিয়ে, স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে সাহায্য করতে পারেন।

ঘুরুঞ্চির ভ্রমণ ছবি ব্লগের প্রায় ৭,০০০ ছবি থেকে আপনার পছন্দসই ছবি পেপার প্রিন্ট, ফাইন আর্ট প্রিন্ট, ওয়াল আর্ট এবং ডেস্ক আর্ট হিসাবে কেনার ব্যবস্থা রয়েছে। আপনারা ছবি কেনাকাটা করলে আমরা অল্প পরিমাণ কমিশন পাব যা ঘুরুঞ্চির ক্রমবিকাশ এবং সম্প্রসারে ব্যবহার হবে।

আমরা আপনার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞ।