“হঠাৎ মনে হলো দূরে একটা আলোর বিন্দু দেখা যাচ্ছে। সত্যিই তাই, মাছালং বাজার থেকে আমাদের কানুনগো ও অন্যান্য লোকেরা হ্যাজাক লাইট জ্বালিয়ে আমাদের এগিয়ে নিতে এসেছে। আমাদের সন্ধ্যার মধ্যে মাছালং পৌঁছার কথা। কিন্তু রাত বারোটার পরও যখন আমাদের কোন খোঁজ খবর নাই, তারা রওনা হলো আমাদের খোঁজ করতে। যাক খুব বাঁচা গেল-মাছালং পৌঁছুতে পৌঁছুতে রাত প্রায় একটা। হাড় কাঁপানো শীত। কাঠখড়ি জ্বালিয়ে, চক্রাকার আগুনের কুণ্ড বানিয়ে তার মধ্যে গিয়েও শীতের কাঁপুনি আর কমে না। এদিকে ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। রাত প্রায় দুটার সময় খাবার দিলো – এত বেশি ঝাল তরকারী বোধহয় আমরা কেউ কোনদিন খাইনি। কিন্তু গভীর ফরেস্ট এর ভেতর সেই রাতে আমরা যে খাবার খেলাম, এত সুস্বাদু খাবার বোধহয় আর কোনদিন খাইনি। ছোটখাটো একটা বাঁশের চালাঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো।”
মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান আরো উল্লেখ করেন “পরদিন সকালে শুরু হলো সেই গভীর জংগলের ভেতর দিয়ে আমাদের পাহাড়ে উঠার যাত্রা। প্রায় দুই হাজার ফুট উপরে আমাদের গন্তব্যস্থল। কোথা থেকে হাতি, বাঘ বেড়িয়ে আসবে কে জানে – দল বেঁধে আমরা চলেছি। শেষের পাঁচ- সাতশো ফুট ওঠা ছিল একটা অসাধ্য ব্যাপার। একদম নাক খাড়া পাহাড় – তাও বড় বড় পাথরে ভর্তি। এক পা এক পা করে এগোনো, পাথরের পর পাথর, কখন পা ফসকে পরে যাব, কে জানে – তখন বোধহয় শ’দুয়েক ফুট উঠতে বাকি, ঘামতে ঘামতে শরীরের সমস্ত শক্তি চলে গেছে, ডিহাইড্রেশন হয়ে সমস্ত শরীর যেন অবশ হয়ে যাবে। এমন সময় দেখি, এলুমিনিয়ামের জগ হাতে করে ইপিআরের (এখনকার বিজিবি ) জওয়ানরা পাহাড়ের চূড়া থেকে নেমে আসছে – পথের মধ্যে আমাদের লবনপানি খাইয়ে উপরে নিয়ে গেল। চূড়ার উপর পা রেখে যখন দাঁড়ালাম, সে যে কি আনন্দ-অপরূপ সৌন্দর্য – ঢেউয়ের পর ঢেউ পাহাড়। এখানকার লুসাইরা আমাদের অভ্যর্থনা করতে এলো। লালডেংগা ছিল সেই মৌজার হেডম্যান। আমার আর ডিসি সাহেবের থাকার জন্য একটা নতুন মাচাং ঘর তৈরি করে ফেলেছে তারা। ডিসি, এডিসি আর অফিসাররা তাদের দেখতে এসেছে এই দুর্গম পাহাড়ে, ওরা কল্পনাই করেনি।”
মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান ও তাঁর সহযাত্রীদের এই যাত্রা ছিল রীতিমতো এডভেঞ্চার। তিনি মারিস্যা হয়ে কাসালং খাল বেয়ে মাছালং বাজার যাওয়া ও সেখান থেকে পাহাড় বেয়ে সাজেকে পৌঁছানোর এক চিত্তাকর্ষক বিবরণ দিয়েছেন। অন্ধকার নদীতে বোট চালনা, হাতির কুম পার হওয়া আর পাহাড়ের সুঁড়ি পথ বেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ অনুসরণ করে সাজেক ভ্যালীতে পৌঁছানো আর ‘নাক খাড়া’ পাহাড়ের পাথর বেয়ে উঠে যাওয়া এখনকার পর্যটকরা কল্পনায়ও আনতে পারবেন না। সাজেক ভ্যালীতে তখনো ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস বা বর্তমানের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এর ক্যাম্প ছিল, এখনো আছে। তখন যারা সেখানে ছিলেন তাদের সেখানে পৌঁছানো ও টহল দেয়ার অবস্থার কথা আমরা কেবল কল্পনাই করতে পারি। এখনো সাজেকের উত্তরে জপুই বা এধরনের যে ক্যাম্প বা বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) আছে সে সব জায়গায় ফুট পেট্রোল বা হেলিকপ্টারই হলো পৌঁছানোর উপায়। অথচ তারও একশত বছর আগে ১৮৬৬ সালে টিএইচ লিউইন একাধিকবার কাসালং হয়ে বিখ্যাত লুসাই চীফ রতন পুইয়া এর গ্রামে গিয়েছিলেন শান্তি আলোচনায়!