ঘুরুঞ্চি ম্যাগাজিনের ট্রাভেল সেমিনার – ধারাবাহিক রিপোর্ট
যারা এই আলোচনা অনুষ্ঠানটি লাইভ দেখার সুযোগ করে উঠতে পারেননি তারা এই লিংক থেকে রেকর্ড দেখে নিতে পারেন।
ঘুরুঞ্চি ম্যাগাজিনের আয়োজনে গত ২৩ ডিসেম্বর পর্বত জয় বিষয়ক আলোচনায় যোগ দিয়েছিলেন অভিযাত্রী শায়লা বিথী ও ডাঃ বাবর আলী।
শায়লা বিথী ৫ই নভেম্বর ২০২২ এ প্রথম বাংলাদেশী নারী হিসেবে নেপালের ৬৩৩২ মিটার উঁচু ডোলমা খাং পর্বত জয় করেন। এছাড়া ২০২১ সালে নেপালের আইল্যান্ড পিক (৬,১৮৯ মি) জয় করেন, সেইসাথে বিখ্যাত থ্রি পাস্ ট্রেক সম্পন্ন করেন। তাঁর কৃতিত্বের মধ্যে আরো আছে মাউন্ট ফারচামো (৬,১৮৭ মি) অভিযান, হিমালয়ের দুর্গম তাশি লাপচা পাস্ অতিক্রম, চীনের তিব্বতের লাকপারি পর্বত (৭,০৪৫ মি) চূড়ায় আরোহণ, নেপালের লারকে পর্বত অভিযান, মানাসলু সার্কিট ট্রেক সম্পন্ন, নেপালের থরং লা পাস্ ট্রেক সম্পন্ন, নেপালের মেরা পর্বত (৬,৪৭৪ মি) চূড়ায় আরোহন ইত্যাদি। তিনি ভারতের নেহেরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে ২০১৬ সালে ‘এ ‘ গ্রেড অর্জন করে মৌলিক পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন।
ডাঃ বাবর আলী পেশায় একজন চিকিৎসক। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে বর্তমানে জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছেন। এডভেঞ্চারের নানান শাখায় তাঁর পদচারণা থাকলেও নিজেকে পাহাড়প্রেমী হিসেবেই পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। পার্বত্য জেলা বান্দরবানের পাহাড় দিয়ে ট্রেকিং এ হাতেখড়ি। পরবর্তীতে নেপাল-ভারত হিমালয়ের বেশ কিছু পাঁচ-ছয় হাজার মিটার চূড়া ছুঁয়েছেন তিনি। তাঁর উল্ল্যেখযোগ্য পর্বত অভিযানগুলোর মধ্যে আছে সারগো রি (৪,৯৮৪ মি), সুরিয়া পিক (৫,১৪৫ মি), মাউন্ট ইয়ানাম (৬,১১৬ মি), মাউন্ট ফাবরাং (৬,১৭২ মি), মাউন্ট চাউ চাউ কাং নিলডা (৬,৩০৩ মি), মাউন্ট শিবা (৬,১৪২ মি), মাউন্ট রামজাক (৬,৩১৮ মি) ইত্যাদি। এই তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন মাউন্ট আমা দাবলাম (৬,৮১২ মি) । পর্বতারোহণ ক্লাব ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’ এর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য তিনি।
পাহাড়ের সাথে সাথে ক্লাইম্বিং, সাইকেল চালানো, কায়াকিং, হাফ ম্যারাথন, ফটোগ্রাফি, স্কুবা ডাইভিং ইত্যাদি ও চলছে সমান তালে। ২০১৯ সালে পায়ে হেঁটে ঘুরেছেন দেশের ৬৪ জেলা। দেশ দেখা আর মানুষের সাথে ভাব-বিনিময় ছাড়াও পদযাত্রাকালীন সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর জন্য গণ সচেতনতা তৈরী করে গেছেন দেশের পথে প্রান্তরে।
শায়লা বিথীর পর্বতারোহণের যাত্রা শুরু হঠাৎ করেই। বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং এন্ড ট্রেকিং ক্লাব এর সাথে যুক্ত থাকার সুবাদে সৌভাগ্যক্রমে তাঁর পর্বতে যাত্রার সুযোগ তৈরী হয়। শুরু করেন বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম এর পাহাড়ি এলাকায় ট্রেকিং দিয়ে। পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা বা পরিশ্রমের অভ্যাস ছাড়াই ভালোভাবে ট্রেক শেষ করে আসার পরে তাঁর মধ্যে আরো আত্মবিশ্বাস তৈরী হয়। এরপরের কিছু বছর নেপাল ও তিব্বতের আরো কিছু পরিচিত ট্রেক তিনি সম্পন্ন করেন। সর্বশেষ ডোলমা খাং পর্বত বেছে নেয়ার পিছে তাঁর কারন ছিল এটি অনেকটাই নতুন একটি অভিযান। এই পর্বতে এর আগে একটা বা দুইটা অভিযান হয়তো হয়েছে, তাই মানুষের চলাচল নেই বললেই চলে। একদম নতুন কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের ভাবনা থেকেই তিনি এর প্রতি আকৃষ্ট হন।
ডাঃ বাবর আলীর ক্ষেত্রে পাহাড়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরী হয় বই পড়ে। সমরেশ মজুমদারের গর্ভধারিণী বইটি পড়ে অনেক কম বয়স থেকেই তাঁর মধ্যে পাহাড়ে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহ গড়ে ওঠে। এরপরে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম এ ট্রেকিং এর মাধ্যমে নিজেকে তৈরী করা শুরু করেন। আরো বিভিন্ন জায়গায় হাই অলটিটিউড এ ট্রেকিং করে ধীরে ধীরে মাউন্টেইনিয়ারিং এর দিকে ঝুঁকেন। তিনি যেই পর্বত জয় করেছেন সেখানে বাংলাদেশ থেকে আগেও অভিযান হয়েছে কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পুরাপুরি সফল হয়নি বিভিন্ন কারণে। ডাঃ বাবর আলীই প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে এই পর্বত জয় করলেন।
ডোলমা খাং পর্বত জয়ের আগে একটি কঠিন বাঁধার সম্মুখীন হয়েছিলেন শায়লা বিথী। তাঁর অভিজ্ঞতা শেয়ার করে বললেন, চূড়ার ৬০-৭০ মিটার আগে একটি খাড়া পাথরের দেয়াল ছিল। সেখানে বেশ কিছু আলগা পাথর থাকায় খুবই বিপদজনক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। নতুন এই ট্রেইল এ এটাই ছিল তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শেষ পর্যন্ত তাঁর গাইডের সাহস আর সহযোগিতায় তিনি ওই রাস্তা টুকু অতিক্রম করতে পারেন। নাহলে হয়তো চূড়া অধরাই থেকে যেত। এই অভিযানের জন্য তাঁর বেঁধে দেয়া সময় ছিল ১৩ দিন। কিন্তু এটি তিনি মাত্র ১০ দিনেই শেষ করেন।
বাবর আলী জানালেন আজ পর্যন্ত করা তাঁর সব এডভেঞ্চার তিনি নিজ খরচে করেছেন। তাঁর আয়ের একটা অংশ তিনি এই ধরণের অভিযানের জন্যই সঞ্চয় করেন। তবে ভবিষ্যতে আরো বড় অভিযানের জন্য অবশ্যই পৃষ্ঠপোষকতার আশা রাখেন। আমা দাবলাম পর্বত আরোহণের জন্য বেছে নেয়ার মূল কারণ ছিল এর দূর্গমতা। এটি ৭০০০ মিটার এর ও কম উচ্চতার কিন্তু এটি জয় করা বেশ বিপদসংকুল ও কঠিন। এখানে রক ক্লাইম্বিং এর অভিজ্ঞতা প্রয়োজন হয়, সেই সাথে প্রচুর বাতাস থাকে, সেই বাতাসের মধ্যে পর্বতারোহন করতে হয়। এসব কিছুর জন্য তিনি বছরের শুরু থেকেই নিজেকে তৈরী করা শুরু করেন। নিয়মিত অনুশীলন, দৌড় ইত্যাদির মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তোলেন। পর্বতারোহণে অনেকগুলো ফ্যাক্টর থাকে যা মানুষের হাতে নেই যেমন আবহাওয়া, তুষার ধসের সম্ভাবনা ইত্যাদি। কিন্তু নিজের পক্ষ থেকে উদ্যোগে যেন কোনো কমতি না থাকে সেই চেষ্টাই তিনি করেছেন।
বাবর আলীর আরেকটি বড় অর্জন হচ্ছে পায়ে হেঁটে বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ করা। এই ভ্রমণে তিনি এমন অনেক এলাকা ঘুরে দেখেছেন যা হয়তো যানবাহনে ভ্রমণ করলে সম্ভব হতোনা। সেই সাথে অনেক মানুষের সাথে মেশা হয়েছে, কথা হয়েছে। এগুলো তাঁর জন্য অনেক বড় পাওয়া। ভ্রমণ শুরু করার আগে নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত থাকলেও শেষ করার পরে তিনি জোড় দিয়ে বলতে পারেন, বাংলাদেশ খুবই নিরাপদ পায়ে হেঁটে ভ্রমণের জন্য। যেহেতু তিনি প্রতিদিনের ঘটনা সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতেন, এগুলো অনেকেই পড়তো। তাই মাঝে মাঝে যাত্রা পথে কেউ কেউ তাঁকে সঙ্গে দিতেও চলে আসতো। পুরো যাত্রায় তাঁকে কখনোই কোনো হোটেল বা সরকারি আবাসস্থলে থাকতে হয়নি। সৌভাগ্যক্রমে প্রতিটি জেলাতেই তাঁর কোনো না কোনো আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব বা কলিগ এর বাসাতে থাকার সুযোগ হয়েছে। আর সকলেই তাঁকে অনেক আদর ও আপ্যায়ন করেছেন।
পর্বতারোহণের ক্ষেত্রে পরিবারের সাপোর্টের বিষয়ে তাঁরা জানালেন, প্রথমে সকলে এই বিষয়গুলো নিয়ে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না। অনেক ক্ষেত্রে এগুলোকে সময়ের অপচয় এবং বেশ বিপদজনক হিসেবেই তাঁরা দেখতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সকলেই এই ব্যাপারে ভালো ধারণা পেয়ে গেছেন এবং এখন তাঁদেরকে যথেষ্ট সাপোর্ট ও করেন।
পর্বতারোহণে অর্জনের জন্য বেসরকারি ভাবে বিভিন্ন সম্মাননা পাওয়া গেলেও সরকারিভাবে এখনো পর্যন্ত তেমন কোনো উদ্যোগ বা সম্মাননা দেয়া হয়না। এখনো পর্যন্ত এটাকে একটি স্পোর্ট হিসেবে দেখা হয়না এটা একটি বড় কারণ। অনেকের খুব বেশি ধারণাও নেই এই বিষয়ে। তবে পর্বতারোহণের উপর অল্প কিছু সংগঠন রয়েছে যাঁদের মধ্যে এই সকল অর্জনের জন্য অনেক সম্মান পাওয়া যায়।
মেলবোর্ন থেকে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আফিয়া আনজুম মুমু। অনুষ্ঠানে আরো যোগ দিয়েছিলেন, ঘুরুঞ্চি ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান সম্পাদক সালাউদ্দিন আহমদ ও সম্পাদনা পরিষদের মাহবুব স্মারক।