জাপানকে ছোট বেলার ভুগোল বইয়ে এরকমটাই শিখেছিলাম। এবারে যখন আমার জাপানিজ সহকর্মী ফোন করে বলল আমি টোকিও যেতে পারব কিনা, আনন্দে মনটা নেচে উঠল। কোভিড পরবর্তী বেশ কিছুদিন পর এই প্রথম আবার বিদেশ যাত্রা। খরচপাতি সব তারা দিবে তাদের দেশের অতিথি হিসেবে। মেঘ না চাইতে জল।
গত দুতিন বছরে আমরা অনেক মিটিং করেছি অনলাইনে। আকাসাকার আবহাওয়া, টোকিওতে কোভিডের পরিস্থিতি কেমন, ওকায়ামা সান, মিয়ামোটো সান, আরো সব সান, নওশাদ সান কেমন আছেন? পরের সপ্তাহান্তে কি করছেন। লক ডাউনের খবর কি? এই ছিল নিত্যাকার কথাবার্তা মিটিং এর শুরুতে। কাজেই জাপান ও জাপানিজদের প্রতি আগ্রহ বাড়ছিলো আমার।
একসাথে অনেক বড় বড় গবেষনার কাজ করেছি হাইড্রোজেন ও পরিস্কার দূষণমুক্ত শক্তি নিয়ে। আমাদের গবেষক দলের নেতৃত্ব দেয়ার সৌভাগ্য হয়েছে জাপানের বৃহৎ সরকারী ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের বড় বড় কর্তাব্যাক্তিগনের সাথে। ভারী সুন্দর অমায়িক ব্যাবহার তাদের। আমার সবচেয়ে পছন্দ হয়েছে তাদের খুব পরিকল্পনামত কার্যপ্রনালী অনুযায়ী পথচলা। ফলাফল দিতে পারছিলাম আশাব্যঞ্জক অনুসারে, তারাও অত্যন্ত খুশী। পারলে আমাকে মাথায় তুলে রাখে। এই একসাথে পথচলা লম্বা সময় চলবে যেহেতু আমাদের সাথে তারা দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
জাপান এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৪৭-৮ এর বিমানটি সকালে মেলবোর্নের সুন্দর রোদমাখা দিন নীচে ফেলে, সবুজ বন অরন্য, মাঠ ঘাট ও ইমারতের শহর ছেড়ে মেঘের দেশে হাওয়ায় ভর করে বৃহদাকার পাখির মত টেনে নিয়ে একটানা গো গো শব্দ শুরু করলো। আস্তে আস্তে গতি ঘন্টায় প্রায় এক হাজার কিলোমিটার এবং মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতার চেয়ে কয়েক হাজার মিটার বেশী, মাটি থেকে ১১ কিমি উপরে উঠে চলতে লাগল।
বিমান চলছে তো চলছেই। নাস্তা পরিবেশন ও শেষ হওয়ার পরে ভিতরে হাল্কা অন্ধকারের ভাব করে দিলো বিমানের ক্রুরা। আমি সেই মূহুর্তে ১১৫৮২ মিটার ওপরে ইন্দোনেশিয়া পার হয়ে বামে সামা দ্বীপ ও ডানে হেইনা এটলের মাঝ দিয়ে যাচ্ছি। জাভা সাগর হতে পারে। ঘন্টায় ৯৫০ কিলোমিটার বেগে বোয়িং ৭৮৭-৮ সিরিজের দৈতাকার বাহনটি ৪০০ মানুষের বহন ক্ষমতা সহ ছুটে চলেছে। তখন মেলবোর্ন সময় বেলা ১:৩০ টা। সকাল ৯টায় উড়েছে। অর্ধেক রাস্তা পাড়ি দিয়েছে।
বাইরে ঝকঝকে রোদ। নীচে সুনীল জলরাশির সাগরমালা, ছোট ছোট দ্বীপ, ছেড়া ছেড়া তুলার স্তুপের মত সাদা মেঘের ভেলা। বিমানের ভিতর কৃত্তিম অন্ধকার করে রেখেছে। জানলার পাশে বাটন টিপে বাহির হতে আসা আলো নিয়ন্ত্রন করা যায়। এ প্রযুক্তি টি নতুন দেখলাম।
তবে অন্য সহযাত্রীদর কথা চিন্তা করে আমার জানলার শার্সি নীল করে রাখতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে বাইরে সন্ধ্যা অথবা ভোরের আলো ফুটবে কিন্তু আসলে দিনের বেলা। এ সবই কৃত্তিম ভাবে করা হচ্ছে, কিন্তু সেই আলো আধারী, পরিবেশ মনের ভিতরে একটা ভাবের তৈরি করছে, অন্য কোনো জগতে নিয়ে যাওয়ার মত। এটা এপিয়ারেন্স, হাল্কা অন্ধকার, সাঁঝবেলার মত, কিন্তু বাস্তবে যা বললাম – বিমানের বাইরে আলো ঝলমলে দিবস। পরম বিশেষ শক্তিধর সৃষ্টিকর্তা অসীম ও সত্য কিন্তু জগৎ মিথ্যা, প্রায় প্রাচীন সব ধর্ম বিশ্বাসের মূল বিষয়কে প্রতিভাত করছে। মায়া ছেড়ে মোক্ষলাভ বা জাগতিক বাসনা থেকে চিত্তমুক্তি ঘটিয়ে নির্বাণ লাভ, পূন্য করে স্বর্গলাভ বা সেই মহানের নিখাদ দিদার প্রাপ্তি এসবই কাছাকাছি দর্শন খুব।
শুনেছি বিবেকানন্দের শিষ্যের কাছে এক পাদ্রী ধর্ম পরিবর্তনের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। উনি শুনে তার গুরু রামকৃষ্ণের যত মত তত পথের কথা বললেন, ওর যখন একটা ধর্ম আছে সেটারতো কোনো সমস্যা নেই, ওটাই ঠিকমত মানতে ব’লো।
মনে পড়ে গেল সকালে আমাকে সালমান, পাকিস্তানী ট্যাক্সি ড্রাইভার, শিক্ষিত ভদ্রছেলে প্রকৌশলে পড়েছে, বলল বারট্রান্ড রাসেলের উক্তি নাকি। ইসলাম শ্রেষ্ঠ ধর্ম আর মুসলিমরা তার সবচেয়ে অসফল অনুসরনকারী। জানিনা আসলেই বারটার্ন্ড রাসেল সেটা বলেছিলো কিনা। এখন প্রায়ই দেখি বিখ্যাত ব্যাক্তিদের নামে এটা সেটা বলেছিলো বলে চালানো হয়। যাহোক সৃষ্টিকর্তার মহিমা প্রকাশ রবীন্দ্রনাথের চেয়ে ভালো আর কে দেবে?
….আছ অনল-অনিলে, চির নভোনীলেভূধর সলিলে, গহনেআছ বিটপীলতায়, জলদের গায়শশী তারকায়, তপনে…
বিমানের যাত্রীগন বিভিন্ন বয়সের, জাতির ও দেশের। জাপানিজ বেশী। কে জানে কে কি ভাবছে সেই মূহুর্তে। কেউ অঘোরে ঘুমুচ্ছে, কেউ ছবি দেখছে, হাটাঁহাটি করছে কেউ আইলে। বিমান গোঁ গোঁ শব্দে আকাশে চৌদিকের নিস্তবদ্ধতা ভেঙে বিদীর্ণ শব্দ করে এগিয়ে যাচ্ছে। যদিও কিছুটা বুঝি এর প্রযুক্তিগত দিক, তবুও এখনো ভারী অবাক লাগে কয়েকশ টন ওজন নিয়ে কিভাবে বাহনটি আকাশে ভেসে চলেছে।
আমি আমার নয়েজ ক্যানসেলিং হেডফোন দিয়ে সেই গোঁ গোঁ শব্দকে ফাকি দিয়ে রবীন্দ্র সংগীত ও সুচিত্রা সেনের পুরোনো দিনের বাংলা গান শুনছি। শুনেছি শুদ্ধ সংগীত মানবের আত্মার ঔষধ। তখন সত্যিই তাই মনে হচ্ছিল।এবারে জাপানের হৃদয় ও আত্মা তথা জাপানিজদের মনন, মানসিকতা, যাপন এসব পর্যবেক্ষন করতে চেয়েছিলাম। জাপান নিয়ে সেসব লিখে প্রকাশ ভারি শক্ত কাজ। জাপান নিয়ে লেখা কখোনো শেষ করা যাবে না।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাপান যাত্রীর মত অনবদ্য লেখা ও দলিল আর কখনো পাওয়া যাবে না। সেটাই পড়েছি ফিরে আসার পর। এত সুন্দর বিবরন সেই ১৯১২ সালের, শুধু কালের ও প্রয়ুক্তির পরিবর্তন হয়েছে। তাছাড়া মোটা দাগে সব একই আছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিসিডা অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের জন্য এসেছেন আজ। নিরাপত্তা বিষয়ক, পরিস্কার দূষনহীন জ্বালানি, হাইড্রোজেন শক্তির সম্ভাব্যতা ও ভবিষ্যত রপ্তানী নিয়ে চুক্তি হচ্ছে।
শুনেছি জাপান বাংলাদেশের নি:স্বার্থ সহায়তাকারী উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলির একটি। সম্প্রতি চালু হওয়া ঢাকার মেট্রো রেলের অবকাঠামোতে তাদের বড় অবদান। টোকিও শহরের মেট্রোরেল দেখলেই বোঝা যায় তারা কত ওপরে এসব প্রযুক্তিতে আর পুরোনো। সময়ানুবর্তিতা, যাত্রীসেবা ও দূর্ঘটনামুক্ত নির্দেশক হলে, তারা পৃথিবীতে এক নম্বর। দেড়শ বছরের উপর তাদের রেলের ইতিহাস। প্রথম শিমবাসী থেকে ইকোহামা দিয়ে শুরু করে, জাপানের বুলেট ট্রেন শিনকানশেন ও জাপানের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নতির প্রায় সমার্থক। ম্যাগলেভ প্রযুক্তির শুরুতেও তারা। শুনলাম টোকিও থেকে নাগোয়া ৩৫০ কিলোমিটার দুরত্ব নতুন চিও শিনকানসেনে মাত্র ৪০ মিনিটে পৌঁছাবে। তার মানে ঘন্টায় ৫৩০ কিলোমিটারের ওপর গতি হবে।
অষ্ট্রেলিয়া জাপান এবং জাপান বাংলাদেশের আন্তরিক এই বন্ধুত্ব স্থায়ী ও মজবুত হোক এই কামনা করি।
Post Views: 38