
অবশেষে সব চেক করে আমরা বাকী তিনজন বের হয়ে আসি। গন্তব্য কাঠমান্ডু শহরে অবস্থিত হোটেলে। সবাই তখন ক্ষুধার চেয়েও দৌড়াদৌড়িতে ক্লান্ত। কারোই বের হবার ইচ্ছে না থাকায় রুমে মায়েদের খাবার অর্ডার করি। আর আমরা নেমে যাই হোটেলের রেস্টুরেন্টে। নেপালী থালি আর বাচ্চাদের তাদের পছন্দের খাবার অর্ডার দিয়ে খেতে বসে দেখি আমরা ভয়ংকর ক্ষুধার্ত। এখানে একটু বলে রাখি নেপালী থালীর মূল্য স্থানভেদে আটশো থেকে আঠারোশো নেপালী রূপী। একটা থালি একটা কমপ্লিট মিল। কারো যদি ক্ষুধা কম থাকে হাফ থালি বা খাবার বেছে নেবার অপশনও আছে।
রাতে ঘুরতে যাই কাছেই থামেল নামে এক জায়গায়। হোটেল থেকে বের হবার পথেই দেখা হয়ে যায় আমাদের মেডিকেলের পরিচিত এক সিনিয়র আপার সাথে। উনি এসেছেন কনফারেন্সে। একটুখানিক আড্ডাবাজিও হয়ে যায় খানিকটা সময়। যা বলছিলাম, থামেলের কথা। ওটা অনেকটা আমাদের বঙ্গবাজারের মতো। কোথাও কোন কিছুর দাম লেখা নেই। আপনি যদি দরদাম করতে না জানেন তবে গণধরা খাবেন। সমস্যা একটাই যে জিনিসটা আপনি দেখছেন তার আদতে মূল্যমান কত হতে পারে তা সম্পর্কে কোন জ্ঞান না থাকা। বিকেলে হোটেলের কাছে এক দোকানে এক নেকলেস দেখলাম দাম চাইলো ছিয়াশি হাজার। রাতেই কাছাকাছি নেকলেসের দাম থামেলে চাইলো ছয় হাজার। কোয়ালিটি হয়তো তফাত হবে কিন্তু দামের এই ফারাক আপনাকে আটকে দেবে দোলাচলে, কি কেনা উচিত? কি বুঝে কেনা উচিত?
নেপালে আসবেন মোমো খাবেন না, তাই কি হয়? থামেলে রাস্তার ধারের এক দোকানে খেয়ে খুব একটা ভালো লাগেনা। তাই রাতে রুমে ফিরে আরো এক প্রস্থ মোমো খেতে নেমে আসি রেস্টুরেন্টে। সত্যি বলতে কি আমার কাছে স্টিমড এর চেয়ে ফ্রাইড মোমো খেতেই বেশী ভালো লেগেছে। খাওয়া শেষে রাস্তায় একটু হাঁটাহাটি করে ফিরে আসি রুমে। পথেঘাটের কোন বিশেষ বর্ণনা দেয়ার মতো অবস্থা না বলে ঐ অংশটা নিয়ে কথা বলছিনা। তবে রাস্তাঘাট পরিস্কার, কোথাও আবর্জনা নেই এটা একটা ভালো দিক।
সকাল সকাল উঠতে হবে বলে একটু তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়ি সবাই। পরদিন সকাল আটটায় আমাদের বুক করা হেলিকপ্টার কোম্পানীর লোক নিতে আসবে। গন্তব্য এভারেস্টের বেইজ ক্যাম্পে অবস্থিত হোটেল এভারেস্ট ভিউতে সকালের নাস্তা করা এবং কালাপাথর পর্যন্ত ঘুরে আসা। মূলতঃ এই ট্রিপটার জন্যই যে আমাদের এবার নেপাল বেড়াতে আসা।
সকালে আটটার সময়ই আমাদেরকে এয়ারপোর্ট নিতে গাড়ি চলে আসে। যে যার বহনক্ষমতা মত শীতের কাপড় জড়িয়ে এয়ারপোর্ট পৌঁছাই আধঘন্টার মধ্যেই। সবাই তখন কুলকুল করে ঘামছি। কিন্তু উপায় কি? কাপড় কমিয়ে রেখে টেনে নেওয়ার চেয়ে গায়ে পরে থাকাই যে উত্তম। যেটা সবচেয়ে ভালো লাগে তা হলো হোটেল থেকে বেরিয়েই ঝকঝকে রোদের দেখা পাওয়া। মানে কোন ঝামেলা ছাড়াই ফ্লাই করা যাবে।


বিশ মিনিট বাদে হেলিকপ্টার ফিরে এসে তিনজনকে নামিয়ে দিয়ে আমাদের নিয়ে যায় কালাপাথর নামক স্থানে। আমার ছোটকন্যা তখন উচ্চতাজনিত কারণে কাহিল। সে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিল সবার সাথে। সে ঘুমাবে এখানেই এবং তার পক্ষে আর এক মূহুর্ত চোখ খোলা রাখা সম্ভব না। অথচ হেলিকপ্টারের চালক বলছিল, কিছুতেই যেন ওকে ঘুমাতে দেয়া না হয়। ফলাফল কালাপাথরে সাকুল্যে পাঁচমিনিটের বেশী থাকা হয়নি আমাদের। তবু এই পাঁচ মিনিট ছিল আমার জীবনের সেরা কিছু মূহুর্তের একটি। চোখের সামনে মাউন্ট এভারেস্টের অপরূপ অবয়ব যেন দ্যুতি ছড়াচ্ছে চারদিকে। সবাই মিলে কিছু ছবি তুলে নেমে আসি ফিরিচেতে। হেলিকপ্টার কালাপাথর থেকে একটু নামতেই দেখা গেলো দুই পর্বতের মাঝে তুষারপাত হচ্ছে। কি যে অদ্ভুত সেই দৃশ্য! বাকী তিনজনকে ফিরিচে থেকে তুলে নিয়ে এবার ফেরার পথে ছোটা। আবারও লুকলায় থেমে তেল নেয়া। হেলিকপ্টার থেকে নেমে কেউ কিছুক্ষণ কোন কথা বলতে পারেনি। সবার মাথাতেই বোধ করি ঘুরছিল, এ কোথায় গিয়েছিলাম আজ! কি দৃশ্য দেখলাম আজ!










সময়ের হিসাব করে দেখা গেলো আর ঘোরাঘুরির সময় নেই। বরং লাঞ্চ করে এয়ারপোর্ট যাওয়াটা বেশী যুক্তিযুক্ত। ড্রাইভার নিয়ে গেলো মোনালিসা নামের এক পুরোনো ধাঁচের রেস্টুরেন্টে। যথারীতি আইটেম পছন্দ করে নেপালী থালি নেয়া হলো আবারও। খাওয়া শেষে এয়ারপোর্ট পানে ছোটা। ফ্লাইট সময়ের আগেই ছেড়ে দিয়েছিল। ফিরে আসা ব্যস্ত কাঠমান্ডু শহরে। রাতে আমার মেডিকেল কলেজের নেপালী বন্ধু দেখা করতে এলো। আঠারো বছর পর তার সাথে দেখা। গল্পে গল্পে কেটে গেলো অনেকটা সময়।
পরদিন সকালেই আমার ফেরার ফ্লাইট। অথচ কাঠমান্ডু শহরে কিছুই দেখলামনা। এটা কিছু হলো? তাই সকাল না হতেই ছুট লাগালাম দরবার স্কয়ারে। চারদিকে শতবর্ষীয় পুরোনো কাঠের স্থাপনা আর মাঝে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। শত শত কবুতর ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে। গরম চায়ের কাপ হাতে চারদিকে তাকাচ্ছিলাম। সকালের নরম সূর্যের আলো সেসব পুরোনো স্থাপনাগুলোর বদ্ধ কুঠুরীর ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়বার প্রানান্ত চেষ্টায় ব্যস্ত তখন। চারদিক বেশ পরিস্কার হওয়া সত্ত্বেও কেমন যেন একটা মলিন ভাব। উন্নত দেশ হলে নিঃসন্দেহে এই জায়গার সংরক্ষন আরো অনেক চমৎকার হতো।
ফেরার পালা এবার। পথে হোটেলের কাছে থেকেই স্যুভেনির হিসেবে নেপালের ঐতিহ্যবাহী খুকুরী কিনে নেই একটা বেশ বড় সাইজের।
হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ইমিগ্রেশন, লাউঞ্জ, এয়ারপোর্ট সবখানেই নেপালী মানুষের ভদ্র ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো।