এ বছর দেশে আসার যখন প্ল্যান করি তখন মাথায় ছিল ইন্ডিয়া যাবো আবারও। এবার দিল্লী, আগ্রা ঐদিকটা ঘুরবো। কিন্তু দেখা গেলো দিল্লী আগ্রা যেতে হলে রাস্তাতেই অনেকটা সময় কেটে যাবে। তাই ট্রিপ প্ল্যান পাল্টে নেপাল করা হলো। হঠাৎ মনে হলো কাছেই যেহেতু আমাদের মা দের নিয়ে গেলে কেমন হয়? তারা দুজনেই রাজী। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে আমার মায়ের পাসপোর্ট নিয়ে। এক সপ্তাহে আর্জেন্ট পাসপোর্ট করে দেবার কথা থাকলেও নানা জটিলতার কারণে তা এক মাসে গিয়ে দাঁড়ায়। ভয়ে ছিলাম, টিকেট যদি না পাওয়া যায়? অবশেষে পাসপোর্ট পেয়ে টিকেট করার পর শান্তি।
 
নির্ধারিত দিন যথা সময়েই প্লেনে উঠতে পারি আমরা ছয়জন। একটা ভয় ছিল প্লেন না ডিলে করে। কারণ এর আগের দিনই চিটাগাং থেকে বাংলাদেশ বিমানে ফিরতে ওয়েটিং টাইম ছিল দুই ঘন্টার ওপরে। ঢাকা থেকে নেপাল আসা অনেকটা হপ অন হপ অফের মতো। সিট বেল্ট পরে খাবার খাওয়া শেষ না করতে করতেই যেন নামার সময় হয়ে যায়। সমতলের মানুষ আমরা প্লেন থেকে পাহাড় দেখে খুবই এক্সাইটেড সবাই। সব পাহাড়গুলো শুভ্র সাদা বরফে ঢাকা। ঐ পাহাড়ের খুব কাছে পর্যন্ত যাবো এবার এরকম প্ল্যান করেই যে এসেছি।
 
এয়ারপোর্টে খানিকটা না অনেকটাই বিপত্তিতে পড়তে হয়। ঢোকার মুখেই ভ্যাকসিন সার্টিফিকেট চেয়ে বসে। এ ধরনের কোন প্রস্তুতি না থাকাতে ঘাবড়ে যাই একটু। আমাদের চারজনের অনলাইন সার্টিফিকেট থাকলেও বাংলাদেশী দুজনের যে কোন কাগজ আনা হয়নি। কপাল ভালো আমাদের কাগজ দেখেই ছেড়ে দেয়া হয় তাদেরও। এবার দ্বিতীয় বিপত্তি। অনবোর্ড এরাইভ্যাল ভিসা হলেও ছয়জনের পেপারওয়ার্কের ঝামেলা এড়াতে আমি আগের দিনই পেপারওয়ার্ক করে পারমিট নিয়ে রাখি। সেই সফট কপি দেখাতেই লাগলো বিপত্তি। বাংলাদেশী পাসপোর্টধারী আমাদের দুই আম্মাজানের ভিসা ফি লাগবেনা এবং তার জন্য তাদেরকে আবারও আলাদা ফর্ম ফিলাপ করতে হবে। সেই ফিল আপ করা ফর্ম নিয়ে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে দাঁড়াতেই বললো ভুল কম্পিউটার থেকে ফর্ম ফিলাপ করেছি। কি বিপদ! আবার লাইন ভেঙে ফিরে আসি মা জননীদের নিয়ে। বাচ্চাদের বাবা তাদের নিয়ে বের হয়ে যায় কাজ কিছুটা এগিয়ে রাখতে।

অবশেষে সব চেক করে আমরা বাকী তিনজন বের হয়ে আসি। গন্তব্য কাঠমান্ডু শহরে অবস্থিত হোটেলে। সবাই তখন ক্ষুধার চেয়েও দৌড়াদৌড়িতে ক্লান্ত। কারোই বের হবার ইচ্ছে না থাকায় রুমে মায়েদের খাবার অর্ডার করি। আর আমরা নেমে যাই হোটেলের রেস্টুরেন্টে। নেপালী থালি আর বাচ্চাদের তাদের পছন্দের খাবার অর্ডার দিয়ে খেতে বসে দেখি আমরা ভয়ংকর ক্ষুধার্ত। এখানে একটু বলে রাখি নেপালী থালীর মূল্য স্থানভেদে আটশো থেকে আঠারোশো নেপালী রূপী। একটা থালি একটা কমপ্লিট মিল। কারো যদি ক্ষুধা কম থাকে হাফ থালি বা খাবার বেছে নেবার অপশনও আছে।

রাতে ঘুরতে যাই কাছেই থামেল নামে এক জায়গায়। হোটেল থেকে বের হবার পথেই দেখা হয়ে যায় আমাদের মেডিকেলের পরিচিত এক সিনিয়র আপার সাথে। উনি এসেছেন কনফারেন্সে। একটুখানিক আড্ডাবাজিও হয়ে যায় খানিকটা সময়। যা বলছিলাম, থামেলের কথা। ওটা অনেকটা আমাদের বঙ্গবাজারের মতো। কোথাও কোন কিছুর দাম লেখা নেই। আপনি যদি দরদাম করতে না জানেন তবে গণধরা খাবেন। সমস্যা একটাই যে জিনিসটা আপনি দেখছেন তার আদতে মূল্যমান কত হতে পারে তা সম্পর্কে কোন জ্ঞান না থাকা। বিকেলে হোটেলের কাছে এক দোকানে এক নেকলেস দেখলাম দাম চাইলো ছিয়াশি হাজার। রাতেই কাছাকাছি নেকলেসের দাম থামেলে চাইলো ছয় হাজার। কোয়ালিটি হয়তো তফাত হবে কিন্তু দামের এই ফারাক আপনাকে আটকে দেবে দোলাচলে, কি কেনা উচিত? কি বুঝে কেনা উচিত?

নেপালে আসবেন মোমো খাবেন না, তাই কি হয়? থামেলে রাস্তার ধারের এক দোকানে খেয়ে খুব একটা ভালো লাগেনা। তাই রাতে রুমে ফিরে আরো এক প্রস্থ মোমো খেতে নেমে আসি রেস্টুরেন্টে। সত্যি বলতে কি আমার কাছে স্টিমড এর চেয়ে ফ্রাইড মোমো খেতেই বেশী ভালো লেগেছে। খাওয়া শেষে রাস্তায় একটু হাঁটাহাটি করে ফিরে আসি রুমে। পথেঘাটের কোন বিশেষ বর্ণনা দেয়ার মতো অবস্থা না বলে ঐ অংশটা নিয়ে কথা বলছিনা। তবে রাস্তাঘাট পরিস্কার, কোথাও আবর্জনা নেই এটা একটা ভালো দিক।

সকাল সকাল উঠতে হবে বলে একটু তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়ি সবাই। পরদিন সকাল আটটায় আমাদের বুক করা হেলিকপ্টার কোম্পানীর লোক নিতে আসবে। গন্তব্য এভারেস্টের বেইজ ক্যাম্পে অবস্থিত হোটেল এভারেস্ট ভিউতে সকালের নাস্তা করা এবং কালাপাথর পর্যন্ত ঘুরে আসা। মূলতঃ এই ট্রিপটার জন্যই যে আমাদের এবার নেপাল বেড়াতে আসা।

সকালে আটটার সময়ই আমাদেরকে এয়ারপোর্ট নিতে গাড়ি চলে আসে। যে যার বহনক্ষমতা মত শীতের কাপড় জড়িয়ে এয়ারপোর্ট পৌঁছাই আধঘন্টার মধ্যেই। সবাই তখন কুলকুল করে ঘামছি। কিন্তু উপায় কি? কাপড় কমিয়ে রেখে টেনে নেওয়ার চেয়ে গায়ে পরে থাকাই যে উত্তম। যেটা সবচেয়ে ভালো লাগে তা হলো হোটেল থেকে বেরিয়েই ঝকঝকে রোদের দেখা পাওয়া। মানে কোন ঝামেলা ছাড়াই ফ্লাই করা যাবে।

এয়ারপোর্টের ফর্মালিটিজ শেষ করার শেষ মূহুর্তে আমরা জানতে পারি আমাদের পুরো পরিবারের জন্য একটা চার্টার ওরা ম্যানেজ করতে পেরেছে। আমরা শুরুর থেকেই বলে এসেছি একটা হেলিকপ্টার হলে আমাদের সুবিধা। আর ওরা বারবার বলেছে ছয় সিটের হেলিকপ্টার পাওয়া কঠিন হবে। শুধু একটা কোম্পানীর আছে সেই ব্যবস্থা। কাজেই আমাদের দুটো হেলিকপ্টার পার্সোনালী নিতে হবে। সে হিসেবেই আমরা পেমেন্ট দিয়েছি। এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে গেলে এখন দুনিয়ার ক্যাঁচাল করতে হবে বলে আর কথা বাড়াইনা। এয়ারপোর্টের হাজার ফর্মালিটিজ শেষ করে নিয়ে আমাদের বসানো হয় রানওয়ের একপাশে হেলিকপ্টার কোম্পানীর যাত্রী ছাউনিতে। ছয় সিটের হেলিকপ্টার ওপর থেকে নেমে আসতে সময় নিচ্ছিল বলে আমাদের যাত্রা শুরু করতে সময় লেগে যায় প্রায় সকাল সাড়ে এগারোটা। অথচ আমাদের শুরু করার কথা নয়টায়। সে হিসেবে প্রথম কালাপাথর ঘুরে এসে তারপর এভারেস্টের বেজ ক্যাম্পের রেস্টুরেন্ট হোটেল এভারেস্ট ভিউতে সকালের নাস্তা খাবার কথা। এতো দেরীতে শুরু করায় আমরা মত পাল্টালাম আগে খাবার খাবো বলে।
 
এখানে একটু ট্রিপটার কথা বলে রাখি। হেলিকপ্টার কাঠমান্ডু এয়ারপোর্ট থেকে টানা চল্লিশ মিনিট চালিয়ে ল্যান্ড করে লুকলা নামক স্থানে। সেখান থেকে ফুয়েল নিয়ে রওয়ানা করে ফিরিচে নামক স্থানে। যার আনুমানিক উচ্চতা চার সাড়ে চার হাজার মিটারের মতো। ফিরিচেতে একটা সমান জায়গা আছে যেটা কালাপাথরে নেই। উচ্চতাজনিত এবং যথাযথ সমান জায়গার অভাবে ফিরিচে থেকে কালাপাথর পর্যন্ত ওরা তিনজনের বেশী একসাথে হেলিকপ্টারে নেয়না। কালাপাথর ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ছয় হাজার মিটার ওপরে। ওখান থেকে মাউন্ট এভারেস্টের পিকের দূরত্ব দশ কিলোমিটার। কালাপাথর থেকে ফিরিচেতে এসে বাকী তিনজনকে আবার ঘুরিয়ে আনা হয়। ফিরিচেতে তাই এক গ্রুপকে অপেক্ষা করতে হয় প্রায় বিশ মিনিটের মতো। তারপর ফিরে আসা বেজ ক্যাম্পের রেস্টুরেন্টে। চল্লিশ মিনিটের খানাদানার বিরতি। তারপর ফিরে আসা লুকলা। আবার ফুয়েল নেয়া। তারপর সমতলে নেমে আসা। পুরো ব্যাপারটা করতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার ঘন্টার মতো।
 
আমরা যেহেতু মত পাল্টেছি আগে খাবো, কাজেই আমরা শুরুতেই যাই বেজ ক্যাম্পের হোটেল এভারেস্ট ভিউতে। হেলিকপ্টার চলতে শুরু করতেই বিস্ময়ে সবার মুখ হা হবার যোগাড়। কি দেখছি এসব? চারদিকে ঘন সবুজ পাহাড়। যত ওপরে উঠছি শুভ্র সাদা বরফের চাদর জড়িয়ে নিশ্চুপ পর্বতগুলো যেন এক অচেনা আহবান করে যাচ্ছে। যেন বলছে, হে সমতলের মানুষ, দেখো আমরা কত কঠিন অথচ অপরূপ দেখতে। এভারেস্টের বেইজ ক্যাম্পে নামার সময় আমরা ঝামেলায় পড়ে যাই, আমার মায়ের শরীর খারাপ লাগতে থাকে বলে। অলটিচ্যুড সিকনেস আমাদের তখনও শুরু হয়নি কারো সেভাবে আম্মু ছাড়া। প্রায় মিনিট দশেক পাহাড়ি পথ হেঁটে তবেই পৌঁছা যায় রেস্টুরেন্টের সিঁড়ির গোড়ায়। তারপর আবার কয়েক তলা সিঁড়ি ভেঙে ওঠা।
 পুরো পথের ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে যায় যখন রেস্টুরেন্টের বাইরের লবিতে যেয়ে বসি। ঝকঝকে রোদের আলো গায়ে মেখে এভারেস্টসহ আশেপাশের সব পর্বত সারি যেন তাদের রূপ ছড়াতে ব্যস্ত তখন। খাবার খাবেন না তাদের দেখবেন সে এক বিরাট দ্বন্দ্বের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। খাবারের মান খুবই ভালো ছিল। যেহেতু এ ধরনের ট্রিপগুলো সাধারণত সকালে হয় তাই ওদের সেট একটা ব্রেকফাস্ট মেনু আছে। সেখান থেকে পছন্দ করে নিতে হয়। খাওয়া দাওয়া শেষে আবারও যাত্রা শুরু। গন্তব্য ফিরিচে। ফিরিচেতে নেমে আমার প্রথম মনে হয় আমি পৃথিবীর বাইরের কোন গ্রহে আছি। পুরো জনমানবহীন একটা সমান জায়গা। একপাশে প্রবল জোরে বয়ে চলেছে পাহাড়ী নদী। চারদিকে পাহাড়গুলো ঠায় দাঁড়িয়ে যেন সেই স্রোতস্বিনীকে পাহারা দিয়ে রেখেছে। কোন শব্দ নেই চারদিকে কেবল সেই নদীর বয়ে চলার শব্দ ছাড়া। একটা মৃদু ঠান্ডা বাতাস। জায়গাটা এতো ওপরে বলে ঠান্ডা থাকলেও রোদের দাপটে শীতটা যেন ঠিক সুবিধা করতে পারছিলনা। বিশ মিনিট সময় ছিলাম ফিরিচেতে। আমার মনে হচ্ছিল আমরা বুঝি কোন গল্পবইয়ের দৃশ্যে আটকে যাওয়া চরিত্র।

বিশ মিনিট বাদে হেলিকপ্টার ফিরে এসে তিনজনকে নামিয়ে দিয়ে আমাদের নিয়ে যায় কালাপাথর নামক স্থানে। আমার ছোটকন্যা তখন উচ্চতাজনিত কারণে কাহিল। সে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিল সবার সাথে। সে ঘুমাবে এখানেই এবং তার পক্ষে আর এক মূহুর্ত চোখ খোলা রাখা সম্ভব না। অথচ হেলিকপ্টারের চালক বলছিল, কিছুতেই যেন ওকে ঘুমাতে দেয়া না হয়। ফলাফল কালাপাথরে সাকুল্যে পাঁচমিনিটের বেশী থাকা হয়নি আমাদের। তবু এই পাঁচ মিনিট ছিল আমার জীবনের সেরা কিছু মূহুর্তের একটি। চোখের সামনে মাউন্ট এভারেস্টের অপরূপ অবয়ব যেন দ্যুতি ছড়াচ্ছে চারদিকে। সবাই মিলে কিছু ছবি তুলে নেমে আসি ফিরিচেতে। হেলিকপ্টার কালাপাথর থেকে একটু নামতেই দেখা গেলো দুই পর্বতের মাঝে তুষারপাত হচ্ছে। কি যে অদ্ভুত সেই দৃশ্য! বাকী তিনজনকে ফিরিচে থেকে তুলে নিয়ে এবার ফেরার পথে ছোটা। আবারও লুকলায় থেমে তেল নেয়া। হেলিকপ্টার থেকে নেমে কেউ কিছুক্ষণ কোন কথা বলতে পারেনি। সবার মাথাতেই বোধ করি ঘুরছিল, এ কোথায় গিয়েছিলাম আজ! কি দৃশ্য দেখলাম আজ!

হোটেলে ফিরতে ফিরতে প্রায় শেষ বিকেল। কাঠমান্ডু শহরের কিছুই তাই দেখা হলোনা। সফরসঙ্গী বাকী চারজন ভীষণ ক্লান্ত ছিল বলে তাদেরকে আর বাইরে বের হতে টানাটানি না করে নিজেরাই বেরিয়ে পড়ি। রাতের খাবার আজ আর হোটেলে না খেয়ে বাইরে খেতে যাই। খাওয়া শেষে কথা ওঠে ক্যাসিনো আন্নাতে যাবার কথা। নির্ঝর নেপাল আসার আগেই বলেছিল আমায় নিয়ে যাবে। ও এসেছিল অবশ্য সতেরো বছর আগে। তখন ওটা ছাড়া আর কোন ক্যাসিনো ছিলনা। তবে এখন বেশ কয়েকটা হয়েছে। পোকার মেশিনের সামনে বসে ঝিমাচ্ছিলাম দেখে স্টাফ একজন এগিয়ে আসে। মূলত সেই লোকের আগ্রহে আরো কয়েকবার বাটন চাপতেই পেয়ে যাই আমার খরচের দ্বিগুন। সাথে সাথেই বের হয়ে আসি। ঘড়ির কাটা তখন প্রায় সাড়ে দশটা।
 
আগামীকালের গন্তব্য পোখারা। এই অংশে একটু খরচ সম্পর্কে জানিয়ে রাখি। ছয়জনের জন্য প্রাইভেট চার্টারের এই প্যাকেজ নিতে আমাদের দিতে হয়েছে পাঁচ হাজার চারশো ইউএস ডলার। আমাদের হোটেল ট্রান্সফার ইনক্লুডেড ছিল প্যাকেজে। আর ন্যাশনাল পার্কের চার্জ বাবদ লেগেছে জনপ্রতি পাঁচ হাজার নেপালী রূপী। অনেকে লুকলা পর্যন্ত ফ্লাইটে এসে তারপর হেলিকপ্টার নেয় শেয়ারে। সেক্ষেত্রে খরচ অনেকটাই কম পড়বে। বাইরে খেতে খরচ পড়েছে হোটেলের এক তৃতীয়াংশ। নেপালে মূদ্রাস্ফীতি হয়েছে চোখে পড়ার মতো। কাজেই প্ল্যান করে খরচ না করলে টাকাপয়সার টানাটানিতে পড়ে যেতে পারেন। চলাচলের জন্য পাঠাও সার্ভিস ভালো। ট্যাক্সি পাবেন যেখানে সেখানে। কিন্তু দরদাম করে উঠতে হবে। খরচ পাঠাও চেয়ে অবশ্যই বেশী পড়বে।
 আজ আমাদের পোখারা যাবার দিন। সকাল বেলাতেই ফ্লাইট ছিল বলে ঘুম থেকে তড়িঘড়ি উঠে রওয়ানা দেই এয়ারপোর্টের পথে। হোটেলে প্রায় সব লাগেজ রেখে দিয়ে যাই। এক রাতের ব্যাপার তাই আর বোঝা ভারী হোক কেউই চাইনি। আমার ওপর ট্রিপ প্ল্যানের দায়িত্ব থাকলেও এক লেইক আছে সেটা দেখতে যাওয়া ছাড়া আর কিছু খুঁজে পেলামনা বলে সেটা নিয়ে মাথা ঘামাইনা। সময়ই আর কতক্ষন?
আধঘন্টার বিমান পথ পেরিয়ে যখন প্লেনের দরজায় দাঁড়াই তখন প্রথম যে কথাটা মুখ দিয়ে বের হয় তা ছিল, ইয়া মাবুদ!
 
এভারেস্ট যদি হয় কোন রূপবান পুরুষ, তবে অন্নপূর্ণা যেন রূপসী এক নারী। গায়ে তুষার শুভ্র আঁচল জড়িয়ে সারি বেঁধে দাড়িয়ে আছে যেন আমাদেরকেই বরণ করে নেবার অপেক্ষায়। মাথার ওপরে ঝকঝকে নীলাকাশ, হাল্কা বাতাস আর সবুজ চারদিক নিয়ে পোখারা যেন রূপের পসরা মেলে বসে আছে তার অতিথিদের অপেক্ষায়।
 
হোটেল থেকে পাঠানো গাড়িতে চেপে বসি সবাই। পোখারার যেদিকেই যাওয়া হয় সেদিক থেকেই বুঝি অন্নপূর্ণার অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এদিকে পথ চলতে চলতে হঠাৎ কাঁদামাটি আর ভীষণরকম ভাঙাচোরা রাস্তায় যখন গাড়ি চলতে শুরু করে ঘন জঙ্গলের দিকে এগিয়ে যায় আমরা একটু ভয়ই পেয়ে যাই। শহর ছেড়ে কোন জঙ্গলে না জানি হোটেল নেয়া হয়েছে। বেশ অনেকটা পথ যাবার পর পৌঁছাই আমাদের কাঙ্খিত সানশাইন রিসোর্টে। রিসোর্টে ঢুকেই সবাই ভ্রমনের ক্লান্তি ভুলে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দেয় চারদিকে। কি দারুন গোছানো চারদিকে। একদিকে ঘন সবুজ পাহাড়ের বন, আর অন্যদিকে অপরূপ অন্নপূর্ণা। ছোটকন্যা তো বলেই বসে সে আর কাঠমান্ডু শহরে ফিরে যাচ্ছেনা।
 
চেকইন শেষে খাবারের আয়োজন ছিল আমাদের পছন্দমত তবে নেপালী স্বাদে। নেপালী থালি নিয়েছিলাম কারণ ওটাতে মোটামুটি সব পদের খাবার থাকে এবং নিজে পছন্দ করে দেবার অপশন থাকে তাই। সবাই তৃপ্তি করে খেয়ে যে যার রুমে চলে যায়। রিসোর্টের প্রতিটা রুমই ছিল মাউন্টেইন ভিউ। অর্থাৎ যেদিকেই তাকাবেন অন্নপূর্নার রূপ দেখার সুযোগ পাবেন।
 
দুপুর পেরিয়ে আগে থেকে ঠিক করে রাখা গাড়ি আমাদের নিতে আসে। গন্তব্য ফেউয়া লেইক। পোখারার সবচেয়ে জনপ্রিয় টুরিস্ট স্পট। এই লেইকের মাঝামাঝি রয়েছে একটা মন্দির। আর তাই লেইকে মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। নৌকা ভাড়া করে উঠে পড়ি সবাই মিলে। চারদিকে ঘন সবুজ পাহাড়ের মাঝে ধীরে ধীরে আমাদের প্যাডেল বোট চলছে, বিকেলের হাল্কা বাতাস সব মিলিয়ে কি যে এক ভালো লাগা বিকেল ছিল! শেষ বিকেলের সৌন্দর্যকে পরিপূর্ণ রূপ দিতেই বুঝি তড়িঘড়ি আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ উঠে বসে। চারদিকে পাখির কলকাকলীতে সন্ধ্যা নেমে আসতেই নৌকা থেকে নেমে আসি।
এবার একটু কেনাকাটার পালা। আশেপাশেই প্রচুর দোকানপাট। যথারীতি দরদামের ব্যাপার আছে। তবে পোখারার জিনিসপত্রের দাম কাঠমান্ডুর চেয়ে যথেষ্টই কম ছিল। রাত সামান্য গভীর হতেই একটু তাড়াহুড়া করেই ফিরে আসি নিজের গন্তব্যে। কারণ আকাশে প্রায় ভরা পূর্ণিমার চাঁদ।
 
জোছনাবিলাস শব্দটার সাথে পরিচিতি সেই কৈশোরকালে কথার যাদুকরের হাতের যাদুতে। অন্নপূর্ণা যে তার রূপের ভান্ডার পোখারাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তা জানা ছিলনা এখানে আসার আগে। আর তাই হিসেবমতো আগামীকাল পূর্ণিমা হলেও আজ জোছনার আলোয় আলোকিত থাকবে চরাচর ভেবেই সকাল থেকেই খুশী লাগতে থাকে। এতো উঁচু বরফাচ্ছাদিত পর্বতমালার ওপর জোছনার আলো গলে গলে পড়ে কি অপরূপ দৃশ্যের অবতারনা করে তার অপেক্ষায় ছিলাম তাই পুরোটা দিন। আর মনে মনে দোয়া করছিলাম যেন আকাশটা পরিস্কার থাকে।
 
এতো এতো বৈদ্যুতিক বাতির আলোও সামান্যতম ম্লান করতে পারেনি চাঁদের আলো গায়ে মেখে নিজের সৌন্দর্যে আলোকিত অন্নপূর্ণার অপরূপ রূপকে।
তবে বেশী সময় দেখার সুযোগ মেলেনি সে রূপ। মেঘ আর কুয়াশা এসে ঢেকে দিয়েছিল অনেকটাই।
কালকের গন্তব্য পোখারার চারপাশ ঘোরা শেষে আবারও কাঠমান্ডু।
 
পোখারা এলে দুটো জায়গায় আপনাকে যেতেই হবে। এক ফেউয়া লেইক যেটা আমি প্রথমদিনেই গিয়েছি। আর দ্বিতীয় অন্নপূর্নায় সূর্যোদয় দেখা। যেতে হয় সারেংকোট নামে এক জায়গায় যেটা ছিল আমার হোটেল থেকে প্রায় ঘন্টাখানেক দূরে। পাহাড়ের গায়ে এক বাসার ছাদ থেকে সেই সূর্যোদয় দেখার ব্যবস্থা। টাকার বিনিময়ে উঁচু ছাদে চেয়ারে বসে দেখা এবং চা খাওয়ার বন্দোবস্ত আছে। আবার বিনে পয়সায় দেখার জায়গাও আছে। রওয়ানা দিতে হয় অতি অবশ্যই সূর্যোদয়ের এক থেকে দেড়ঘণ্টা আগে।
 
ড্রাইভারকে আগের দিনই বলা ছিল। খুব ভোরে উঠে রওয়ানা দেই। রাস্তায় যানজট না থাকলেও ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট বলে গাড়ির গতি চল্লিশ কিমির বেশী কখনোই উঠতে দেখিনি। আমরা পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক মানুষ জমায়েত হয়ে গেছে ততক্ষণে। নেপালে শীতকাল শুরু হওয়ায় তার ওপর অনেকটা উঁচুতে বলে বেশ ঠান্ডা ছিল জায়গাটা। তাপমাত্রা একটু সহনীয় হতেই সূর্যোদয়ের সময় ঘনিয়ে আসে। আকাশে অল্প অল্প গোলাপী আভা ধীরে ধীরে লাল কমলা হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছিল। আর সেই রংবদলের সাথে সাথে ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাচ্ছিল অন্নপূর্ণার চূড়ার রং। এতো মূহুর্মুহু রং বদলের খেলায় কোনদিক ছেড়ে কোনদিকে দৃষ্টি দেবেন নাকি মোবাইলে ছবি তুলবেন নাকি ভিডিও করবেন না কেবল মূহুর্তটুকু উপভোগ করবেন সে ভাবনাতেই দিশেহারা হয়ে যাবার যোগাড় হয় বোধ করি উপস্থিত সবারই। রংয়ের খেলা ছিল বড়জোর বিশ থেকে ত্রিশ মিনিট। অনেক বেশী প্রকৃতির রূপ দেখা হয়েছে এই ভেবেই বুঝি হুট করে এক ঝাঁক কুয়াশা এসে চারদিক একটু অন্ধকার করে দেয়।
 
ফিরে আসি আবার ঘন্টা পেরিয়ে নিজেদের রিসোর্টে। নাস্তা সেরে চারদিকে কিছুটা সময় ছবি তুলে সব বিল মিটিয়ে বেরিয়ে আসি পোখারা শহরের পথে। গন্তব্য দেবী’স ফলস। একেবারেই দেশের মতো চারদিকে দোকানপাট তুলে হুলুস্থুল অবস্থা। তীব্রবেগে নেমে আসা দেবীস ফলসে পানির স্রোত দেখার মতোই। গভীরতা কত কে জানে? কিন্তু ফলসের বেশী কাছাকাছি যাবার উপায় নেই। লোহার প্রাচীর দিয়ে ঘিরে রাখা এবং সেভাবে কোন সুবিধাজনক অবস্থানও নেই যেখান থেকে পুরো ফলসটা একবারে দেখা যায়। অল্পখানিক সময় পেরিয়ে একটু কেনাকাটা করে বেরিয়ে আসি।

সময়ের হিসাব করে দেখা গেলো আর ঘোরাঘুরির সময় নেই। বরং লাঞ্চ করে এয়ারপোর্ট যাওয়াটা বেশী যুক্তিযুক্ত। ড্রাইভার নিয়ে গেলো মোনালিসা নামের এক পুরোনো ধাঁচের রেস্টুরেন্টে। যথারীতি আইটেম পছন্দ করে নেপালী থালি নেয়া হলো আবারও। খাওয়া শেষে এয়ারপোর্ট পানে ছোটা। ফ্লাইট সময়ের আগেই ছেড়ে দিয়েছিল। ফিরে আসা ব্যস্ত কাঠমান্ডু শহরে। রাতে আমার মেডিকেল কলেজের নেপালী বন্ধু দেখা করতে এলো। আঠারো বছর পর তার সাথে দেখা। গল্পে গল্পে কেটে গেলো অনেকটা সময়।

পরদিন সকালেই আমার ফেরার ফ্লাইট। অথচ কাঠমান্ডু শহরে কিছুই দেখলামনা। এটা কিছু হলো? তাই সকাল না হতেই ছুট লাগালাম দরবার স্কয়ারে। চারদিকে শতবর্ষীয় পুরোনো কাঠের স্থাপনা আর মাঝে অনেকটা ফাঁকা জায়গা। শত শত কবুতর ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে। গরম চায়ের কাপ হাতে চারদিকে তাকাচ্ছিলাম। সকালের নরম সূর্যের আলো সেসব পুরোনো স্থাপনাগুলোর বদ্ধ কুঠুরীর ফাঁকে ফাঁকে ঢুকে পড়বার প্রানান্ত চেষ্টায় ব্যস্ত তখন। চারদিক বেশ পরিস্কার হওয়া সত্ত্বেও কেমন যেন একটা মলিন ভাব। উন্নত দেশ হলে নিঃসন্দেহে এই জায়গার সংরক্ষন আরো অনেক চমৎকার হতো।
ফেরার পালা এবার। পথে হোটেলের কাছে থেকেই স্যুভেনির হিসেবে নেপালের ঐতিহ্যবাহী খুকুরী কিনে নেই একটা বেশ বড় সাইজের।
হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ইমিগ্রেশন, লাউঞ্জ, এয়ারপোর্ট সবখানেই নেপালী মানুষের ভদ্র ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো।