আমার এক প্রিয় কলিগ লিসা। ২০০৮ সালে তার সাথে যখন পরিচয় হয় তখন সে মেলবোর্নের বক্সহিল সবার্বে থাকতো। এদিকে আমি আর আরজু অস্ট্রেলিয়াতে এসেছি মাত্র কয়েক মাস হলো। অল্প কিছুদিনেই ডিপার্টমেন্ট অফ সাস্টেইনাবিলিটি এন্ড এনভায়রনমেন্টের সেই কলিগ লিসার সাথে বেশ সক্ষতা তৈরী হলো। গ্রামের মেয়ে লিসা, তার বাবা মায়ের বাড়ি বালারাত। তার বর্ণনায় শুনেছি তার এক ভাই কৃষক, সে থাকে মেলবোর্ন থেকে অনেক দূরে খুব ছোট একটি শহরে যার নাম নীল (Nhill)। প্রতি অল্টারনেটিভ ক্রিস্টমাসে সে ভাইয়ের বাড়িতে যেতো। ও যখন ফিরত তখন গল্পের ঝুড়ি নিয়ে ফিরত। সে গল্প শুনে আমার মনে হতো আহা কবে যেতে পারবো সে রকম জায়গায়।
নীল নামটা শুনেই খুব ভালো লেগে গিয়েছিল, মনে হয় নীল নামটার সাথে কোনো বিশেষ আকর্ষণ কাজ করে। জননন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের অনেকগুলো বই পড়েছিলাম যেমন নীল অপরাজিতা, নীল মানুষ, নীল হাতী, হিমুর নীল জোছনা ইত্যাদি তবে কেন যেন তিথির নীল তোয়ালে এই বইয়ের নামটা ঘুরেফিরে বারে বারে মাথায় আসে। কাছাকাছি নামে মেলবোর্নের থেকে ঘন্টা দুয়েক দূরে লেক নিল্লাহকুটি (Lake Nillahcootie) নামে অদ্ভুত সুন্দর একটা জায়গা আছে। লাল মাটির পথ নিল্লাহকুটি লেকের মাঝে গিয়ে পড়েছে। সুবিশাল সেই লেকের পাড় ঘেসে খাড়া পাহাড়। বিশুদ্ধ অক্সিজেনে পুরো এলাকা নীল রঙের। এখানে মেঘ এসে পাহাড়ের বনে হারিয়ে যায়, চারপাশ আচ্ছন্ন হয় কুয়াশায়।
আরো পড়ুন ইরিনুন্দ্রা ন্যাশনাল পার্ক


ছোট শহর নীল, নীল লেকের ধার ঘেসে তার অবস্থান। মেলবোর্ন থেকে অ্যাডিলেড যাবার পথে পশ্চিম ভিক্টোরিয়ার উইমারা অঞ্চলে এর অবস্থান। লিসার সাথে কথা বলে জেনেছিলাম উইমারা অঞ্চল কৃষি কাজের জন্য বেশ পরিচিত। ইউরোপীয়ানরা এ দেশে আসার আগে হাজারো বছর ধরে ওয়েরর্গাইয়া (Wergaia) বা ওয়েরিজিয়া (Werrigia) অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোক বসবাস করতেন। ওয়েরর্গাইয়া ভাষায় নীল শুনতে মনে হয় “নিহিল” যার অর্থ “পানির উপরে উঠে আসা ভোরের কুয়াশা”।
আমাদের তখন গাড়ি ছিল না এবং চাকরীর পাশাপাশি তখন আমি একটা মাস্টার্স প্রোগ্রামেও এনরোলড ছিলাম বলে নানা ব্যাস্ততায় বাইরে বেড়ানোর সুযোগ ছিল কম। ফলে, নীল শহরটা ঘুরে দেখাটা ইচ্ছের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল দীর্ঘ অনেকে বছর। কয়েক বছর পর লিসা আমাদের বালারাত অফিসে ট্রান্সফার নিয়ে চলে গেলো, মাঝে মাঝে লিসা মেলবোর্নে আসলে কফি ক্যাচ-আপ বা লাঞ্চে দেখা হতো। একসময় ও কাজ ছেড়ে দিয়ে কন্সালটেন্সির কাজ শুরু করলো। আমাদের দেখা-সাক্ষাৎ বন্ধ হয়ে গেলো। পরবর্তী সময় নানা বাস্তবতায় ভুলে গিয়েছিলাম নীল শহরের কথা। কিন্তূ কেন যেন কিন্তু নীল শহরটা মাথায় রয়ে গিয়েছিলো।

এর মাঝে অনেক বা বছর কেটে গিয়েছে, আমাদের পরিবারের সদস্য বেড়েছে, গাড়ী হয়েছে, আরজু ব্যবসা দেখছে ইত্যাদি। ২০১৬ সালে আমাদের পারিবারিক ব্যাবসার কারণে অ্যাডিলেড একটা কনফারেন্স যেতে হয়েছিল। ২০০৯ সালেও একবার অ্যাডিলেড যাওয়া হয়েছিল এবং সেটাও ছিল একটা কনফারেন্সে। সেবার বিমানে যাওয়া হয়েছিল বলে নীল শহরে যাওয়া সম্ভব হয় নি। যাইহোক ২০১৬ সালের কনফারেন্স এটেন্ড করবে আরজু আর আমি গেস্ট আটেনডেন্ট আর বেবি সিটার। আমরা ঠিক করেছিলাম যে গাড়ি দিয়েই যাব।
ওয়েস্টার্ন হাইওয়ে ধরে বালারাত, বিওফোর্ট (Beaufort), আরারাত (Ararat), ষ্টল (Stawell), হরসাম (Horsham) অনেকবার গিয়েছি। গ্রাম্পিয়ান্স (Grampians) ন্যাশনাল পার্কের হাইক আর আবরিজিনাল সাইটগুলো আমার অনেক পছন্দের জায়গা। আরারাত, ষ্টল হয়েই যেতে হয় গ্রাম্পিয়ান্স। একবার অফিসের কাজে হরসাম পর্যন্ত এসেছিলাম এবং ছিলাম বেশ কয়েকদিন। কিনতু হরসামের পর আর বেশিদূর যাওয়া হয়নি। হরসামের আশেপাশে অনেক অনেক কৃষি জমি, লিটল ডেসার্ট ন্যাশনাল পার্ক (Little Desert National Park) এবং বিগ ডেসার্ট উইল্ডারনেস এরিয়া (Big Desert Wilderness Area)। সাধারণ পর্যটকদের কাছে এই এলাকার আকর্ষণ খুব কম।
মেলবোর্ন থেকে অ্যাডিলেড যাবার/আসার পথে অনেকেই গ্রীন লেক (Green Lake) দেখতে থামেন। হরসাম শহরের ১০ কিলোমিটার আগেই এই লেক। তবে সাধারণত সবাই চেষ্টা করেন ডিম্বলা (Domboola) পিঙ্ক লেকে বিরতি নিতে। কিন্তু এবার আমরা ঠিক করে এসেছি শহর নীলে থামার, নীল লেক দেখার। মেলবোর্ন থেকে সকালে বের হয়ে একটানে বিউফোর্ট, এদিকে আসলে সবসময় বিউফোর্ট শহরে বিরতি নেয়া হয়। আমরা কফি নিয়ে বিউফোর্ট ছেড়ে ছুটলাম অ্যাডিলেদের পথে। আরো দুবার বিরতির পর শেষ পর্যন্ত ভালো লাগার নীল শহরে থামলাম।
আগেই বলেছি খুব ছোট নীল শহর। পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো বিশেষ অনেক কিছু নেই এই শহরে। তবে, যাত্রা বিরতি নিয়ে খাওয়া দাওয়া এমনটি হোটেল-মোটেলে বিশ্রামের ভালো ব্যবস্থা আছে। আমরা ঠিক করে রেখেছিলাম আমরা নীল লেকের পাশে লাঞ্চ করবো। সে অনুযায়ী, পিকনিক ম্যাট বিছিয়ে বাড়ি থেকে বয়ে আনা খাবার দিয়ে লাঞ্চ সারলাম। ১৯৬০ সালে নীল লেক তৈরি হয়েছিল, পরবর্তীতে ১৯৯০ সালের দিকে নীল লেকের মাঝে একটি দ্বীপটি নির্মাণ করা হয় । লেকের পানি অগভীর কিন্তু সারাবছর স্থায়ী। যারা মাছ ধরা, স্কিইং, পাখি দেখা এবং সাঁতার ভালোবাসেন তাদের জন্যই নীল লেক। এখানে সুন্দর একটা বোর্ডওয়াকও রয়েছে। শহরের যেকোনো মোটেল থেকে হেটে এখানে আসা যায়। স্থানীয়রা নীল লেকে নানা একটিভিটি করে থাকে।যারা স্বল্প বিরতির জন্য থামবেন তারা এখানে বারবিকিউ, বোটিং, গাড়ী পার্কিং, ঘাসের লন এবং টয়লেট সুবিধা পাবেন।
এর পর ২০২০-২১ সালে অস্ট্রেলিয়ান সাইলো আর্ট ট্রিপে এসে আবারো নীল লেকে এসেছিলাম। তবে, সেবার বেশিক্ষন বিরতি নেয়া হয়নি। ফুয়েল নিয়ে আবার ছুটেছি লেক হিন্ডমার্স (পিঙ্ক লেক) আর লেক আলবাকুতিয়ার দিকে। ২০২৩ সালে রোড ট্রিপে উলুরু যাবার পথে আবার একবার বিরতি নিয়েছিলাম। স্বচ্ছ, গাঢ় সবজু লেকের অগভীর পানির দিকে তাকিয়ে থেকে কথন সময় চলে গেলো বুঝতে পারিনি। এখানে সময় কাটানো নানা স্মৃতি মনে পরে যাচ্ছিলো। নোমানের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পেলাম। কোনো গাছে কতগুলো রেইনবো লরিকেট বসে আছে। ওগুলো আমাকে দেখাবে বলে ডাকতে থাকলো।
নীল শহরের একজন বিখ্যাত লোকের নাম ডিক-এ-ডিক (এবোরিজিনাল নাম লাবণ্য, জুমগুমজেনানুকে বা জুংগুনজিনুকে)। তিনি ছিলেন একজন অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসী ট্র্যাকার এবং ক্রিকেটার। এই আদিবাসী ১৮৬৮ সালে ইংল্যান্ড সফরকারী প্রথম অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট দলের সদস্য ছিলেন। ডিক-এ-ডিক উনিশ শতকের সবচেয়ে সুপরিচিত আদিবাসীদের একজন।
মেলবোর্ন – অ্যাডিলেডের পথে কিছুক্ষন থেমে নীল লেকের গাঢ় সবুজ পানি দেখে নয়ন জুড়াবেন এমন আশাই করছি।
পড়ুন সালাহউদ্দিন আহমদের আরো লেখা
ঘুরুঞ্চি ম্যাগাজিনের সকল কর্মকান্ড নট ফর প্রফিট, স্বেচ্ছাসেবকদের অংশগ্রহণে সকল কাজ পরিচালিত হচ্ছে।
অত্যন্ত ভরাক্রান্ত মনে জানাতে হচ্ছে যে আমাদের সম্মানিত লেখকদের জন্য কোনো তহবিল এই মুহূর্তে আমাদের কাছে নেই। অদূর ভবিষ্যতে তহবিল গঠন করতে পারা গেল এই অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে।
ঘুরুঞ্চির ওয়েবসাইট পরিচালনা করতে আমাদের সপ্তাহে ৮-১২ ঘন্টা কাজ করতে হয়। বর্তমানে আমাদের কাজ শুধুমাত্র স্বেচ্ছাসেবক এবং স্ব-অর্থায়নের উপর নির্ভর করে। আপনারা ঘুরুঞ্চিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে, অনুদান দিয়ে, স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে সাহায্য করতে পারেন।
ঘুরুঞ্চির ভ্রমণ ছবি ব্লগের ছবি থেকে আপনার পছন্দসই ছবি পেপার প্রিন্ট, ফাইন আর্ট প্রিন্ট, ওয়াল আর্ট এবং ডেস্ক আর্ট হিসাবে কেনার ব্যবস্থা রয়েছে। আপনারা ছবি কেনাকাটা করলে আমরা অল্প পরিমাণ কমিশন পাব, যা ঘুরুঞ্চির ক্রমবিকাশ এবং সম্প্রসারে ব্যাবস্থার হবে, যা ঘুরুঞ্চির ক্রমবিকাশ এবং সম্প্রসারে ব্যবহার হবে।
আমরা আপনার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞ।