এবারে আমি জাপানের আত্মা ও দর্শনের খোঁজ করতে চেয়েছিলাম।
টোকিও বিমানবন্দরে নামার আগে জাপান সাগরের তটরেখা চোখে পড়ল। ফেনীল জলরাশি বেলা ভূমিতে আছড়ে পড়ছে। অনেক সাদা রেখার সৃষ্টি করছে তা। তখন প্রায় বিকেল। সূর্যরশ্মি জানালা দিয়ে সরাসরি ঢুকে পড়ছে যে কারণে নিচের ভূমি ঠিকমতো দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। তবুও ছোট ছোট বাড়িঘর, স্থাপনা চোখে পড়তে লাগলো। একসময় বিমানটি গ্লাইডিং করে রানওয়ের ওপর বিকট শব্দ করে মাটি ছুঁয়ে গেল। তারপর আস্তে আস্তে স্বল্পগতিতে এসে জেট ব্রিজে ভিড়ে গেল।
প্রায় ১২ ঘন্টা ভ্রমন করে একটু ক্লান্তি ভাব তখনো আসেনি যতক্ষণ না নেমে লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হলো। করোনার কারণে প্রথমেই নির্দেশনা ছিল মাইসস নামে একটি অ্যাপ ডাউনলোড করতে হবে এবং সেখানে ভ্যাক্সিনেশন সার্টিফিকেটসহ সব তথ্য ঢুকাতে হবে। কোন কারনে অ্যাপ ডাউনলোড হলেও বাকি কাজগুলো সম্পন্ন হলো না ভ্রমণের আগে। এটা বলা ছিল, যারা এই কাজটি ভ্রমণের আগে শেষ করতে পারবে না তাদেরকে বিমানবন্দরে একটু সময় বেশি লাগবে বের হতে। আমাকে ওরকম একটা কিউতে পাঠানো হলো আরো অনেক যাত্রীসহ যারা এটি করতে পারেনি। সেটিও মোটামুটি বেশি সময় লাগেনি যদিও ভাষার একটু সমস্যা হচ্ছিল। তবে এয়ারপোর্টের সাহায্যকারী সবাই ইংরেজি জানে। কিন্তু ইমিগ্রেশনে অনেক বড় লাইন দেখা গেল। কতক্ষন লাগবে বোঝা যাচ্ছিল না। আমার সামনে পিছনে বেশিরভাগই জাপানি যাত্রী। একটা দল, তারা চারজন তবে আমি তিনজনকে দেখলাম একসাথে। আমেরিকান টু্রিস্ট, জাপান দেখতে এসেছে। যেহেতু তারা ইংরেজিতে কথা বলছিল, আমার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেই কথা শুরু হয়ে গেল। তারা কোথায় যাবে, আমি কোথায় যাব এসব কথাবার্তা চলছিলো। একজন মেয়ে, তার বয়ফ্রেন্ড এবং আরেকজন মেয়ে বন্ধু। এই তিনজনের সাথে আমার কথা হচ্ছিল। এর মধ্যে একজন মেয়ে বেশ উৎসাহী দেখলাম ভারতীয় দর্শন নিয়ে আগ্রহ। আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে লাগলো। আমি উত্তর দিচ্ছি যতটুকু পারি এবং সে ধরে নিয়েছে আমি বিশাল জ্ঞানী ব্যাক্তি। পশ্চিমাদের মধ্যে ভারতীয় দর্শনের প্রতি আগ্রহ বেশ বেড়েছে। অনেক কিছু প্রশ্ন শুরু করলো যেন আমি কোন সন্ন্যাসী, আশ্রমে ছিলাম, সব জানি। আমি বললাম, তুমি এক কাজ করো – ইন্ডিয়া বেড়াতে যাও। তবে সব জায়গায় ভালো-মন্দ মানুষ আছে। তোমাকে এক্সপ্লয়েট করতে পারে, জানো তো নিশ্চয়, একটু সাবধানে, জেনে শুনে যেও। যেখানে অনেক টাকার বিনিময়ে ধর্ম প্রচার করা হয়, সেগুলো পারলে এড়িয়ে যেও। তার যোগাসন ও আশ্রম বাসের উপর বেশ আগ্রহ এবং সে জাপানে এসেছে এসব কারণেই। বিশেষত বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে অনেক বেশি জানতে। তার তালিকায় ভ্রমণের জায়গাগুলো মূলত বৌদ্ধ মন্দির ও শিন্টো শ্রাইন বা মাজার সমূহ। জাপানে এরকম দু লাখের উপরে জায়গা রয়েছে যেগুলোর বেশ কয়েক হাজার শুধুমাত্র অনুসারীদের জন্য। এই মাজার গুলি বেশিরভাগই গভীর জঙ্গল, পাহাড় বা প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায় যদিও জাপানে আমি সেরকম গ্রামের কথা শুনিনি।
বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে সে অনেক কিছু লেখাপড়া করেছে বলল। পাঁচটি মহাপাপ – কোন কিছু হত্যা করা যাবে না, চুরি করা যাবে না, কোনো অনৈতিক সম্পর্ক করা যাবে না, মিথ্যে বলা যাবে না এবং কোন মাদকদ্রব্য নেয়া যাবে না যা মনকে বিবেকহীন করে ফেলে। সে বলল কেউ যদি এইগুলি থেকে নিজেকে বিরত রাখে তার পাপ কর্ম কমবে এবং দুঃখ পাওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ বৌদ্ধ ধর্মমতে মানুষ কর্মের ফল পায়। তবে এমন নয় যে, কেউ কখনো এই কাজ গুলো করেনি। বরং বেশিরভাগ মানুষেরা জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এসব কাজ কম বেশি করেছে। তাদের প্রতিজ্ঞা হলো এখনই তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, ভবিষ্যতে কোনোদিন তারা এই কাজগুলো করবে না, এবং তা এখন থেকেই। আমি দেখলাম এবং বললাম, এগুলো সবগুলোই তো আমাদের ধর্মের সাথে মিলে যাচ্ছে। শুধুমাত্র প্রাণী হত্যা ছাড়া কারন আমরা মাংস খাই। তবে সে বলল, প্রাণী হত্যা হতে পারে, কিন্তু শুধুই হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, যেখানে সুযোগ আছে সেখানে প্রাণীটিকে বাঁচিয়ে আমরা জীবন যাপন করতে পারি। যেমন ঘর পরিচ্ছন্ন করতে গিয়ে মাছিটিকে ধরে বাইরে ফেলে দেয়া বা পালানোর সুযোগ করে দেয়া। আমি তো ধরে মেরে বেসিনে বা ময়লার বিনে ফেলি। ভাবলাম ভবিষ্যতে যখন করব, যদি দরকার না পড়ে খামকা ওর প্রান সংহার করে লাভ কি?
আর একটা বলল মানুষ জীবনে দুঃখ পাবে, দুঃখ পাওয়ার কারণ হচ্ছে চাওয়া বা বাসনা। আর দুঃখ না পেতে চাইলে বাসনা ত্যাগ করতে হবে। তা করতে হলে তাদের আটটি সঠিক জিনিস মেনে চলতে হবে। তাকে বলা হয় অষ্টাঙ্গ মার্গ বা পথ। সৎবাক্য, সৎকার্য, সৎজীবিকা, সৎচেষ্টা, সৎচিন্তা, সৎসচেতনা, সৎসংকল্প, সৎদৃষ্টি।
প্রায় ৮৬ ভাগ জাপানের লোক বৌদ্ধ ও শিন্টো ধর্মের অনুসারী। শিন্টো শব্দের অর্থ ভগবানের দিকে যাওয়ার রাস্তা। চীনা শব্দ শেন ডাও থেকে এসেছে। এটা জাপানের নিজস্ব ধর্ম কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম অন্য দেশ থেকে আনা। আমরা জানি দক্ষিণ নেপালে খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ বছর আগে তার উৎপত্তি। শিন্টো ধর্মের দেবতা কামি প্রকৃতিতে বসবাস করে। প্রকৃতির সবকিছুতেই দেবতা মানা হয়। এটাকে বলা জিনজা, জু তার মানে হল মাজার। আমেতারাসু নামে এক জাপানিজ দেবতা সেখানে থাকে। আমি আমার হোটেল থেকে হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম একটা শিন্টো মাজার, প্রথমবার। দেখলাম নিচে বড় একটা কংক্রিটর বাক্সের মতো রাখা, যেটা আমাদের দেশের মতো দান বাক্স বলে মনে হল। এখানে যে টাকা আসে তা দিয়ে মাজারের উন্নয়ন এবং যারা সন্ন্যাসী সন্ন্যাসীনী থাকে তাদেরকে সহায়তা করা হয়। প্রতিটি মাজার এর শুরুতে দুটি সিংহ থাকে। একটির মুখ বন্ধ আরেকটির খোলা। তাদের কাজ হচ্ছে মন্দিরের দেবতাকে পাহারা দেয়া। একজন মহিলা দেখলাম গভীর মনোযোগের সাথে সিংহগুলিকে পরিষ্কার করছে। যদিও পরিসংখ্যানে তারা বলে না কিন্তু বেশিরভাগ জাপানিজ বাড়িতে এবং বাইরে দুটি ধর্মীয় বিধান মানে।
ওই আমেরিকান ভ্রমণকারী দলের সাথে কথা বলতে বলতে বের হওয়ার সময় হয়ে গেল। বের হয়ে একটি ওয়াইফাই বক্স সাথে নিলাম ভাড়া হিসেবে। এ পরামর্শ আমার ছেলে দিয়েছিল কারণ ফোন নেয়া যায় না। ফোন নিতে গেলে অনেক খরচা পড়ে। ওয়াইফাই বক্সটি সাথে থাকলে এটি একটি ফোনের মতই হটস্পট দিয়ে এগারোটা ডিভাইস যুক্ত করা যেতে পারে এবং বেশ নির্ভরযোগ্য।
আমি বের হয়ে ট্রেন খোঁজ করলাম টোকিও শহরে যাওয়ার জন্য। একটু দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলাম কোন প্ল্যাটফর্ম, কোন দিকে যাব। যাহোক দুবার দুই জায়গা পরিবর্তন করে আমার কাঙ্খিত প্ল্যাটফর্ম পেলাম। ট্রেনে উঠে একটি পরিবার দেখলাম আমার সহযাত্রী যারা টোকিওতে যাচ্ছে। বিমানবন্দর থেকে কোথায় ট্রেন পরিবর্তন করতে হবে ভাবছি। তারা কোন দেশের জিজ্ঞেস করতেই বলল বাংলাদেশ। বুঝতে পারলাম এ এক সুবিধে, দুনিয়ার যেখানেই যায় তা পাওয়া যাবে। ভদ্রলোক আমাকে ঠিকমতো মাতৃভাষা বাংলায় বুঝিয়ে দিল কোথায় যেতে হবে কোথায় নামতে হবে। তার স্ত্রীর কোলো একটা শিশু এবং ৫ বছর বয়সী একটি মেয়েকে নিয়ে কিছুদিন বাংলাদেশে থাকার পর টোকিওতে ফিরছে ওরা। ভদ্রলোক ওদেরকে নিতে এসেছে। একে বলে ভাষার আত্মীয়তা। কথা বলতে বলতে দ্রুতই স্টেশন চলে আসলো। নেমে তারা ট্রেন চেঞ্জ করল। আমার ট্রেন দেখিয়ে দিল। কোনরকমে তার ফোন নাম্বারটা নিলাম। ভদ্রমহিলা খুব করে বললেন কোন সমস্যা হলেই যেন আমি ফোন দেই। যেমনটা হয়, আমরা পরিচিত হই একসঙ্গে ট্রেনের যাত্রী বা কোথাও গিয়েছি, ঠিকানা বিনিময় হয়েছে, কিন্তু আর হয়তো কোনদিন যোগাযোগই হয়নি। আমার মনে পড়ে গেল একবার রাজধানী এক্সপ্রেসে দিল্লি থেকে ধানবাদ যাচ্ছি, আমার এক সহযাত্রী পাঞ্জাবি ব্যবসায়ী ভদ্রলোক কলকাতা যাচ্ছে। অনেক আলাপ হলো ঠিকানা বিনিময় হলো, কিন্তু ওই পর্যন্তই।
এই বাংলাদেশী ভদ্রলোকের কাছে অনেক কিছু জানলাম জাপানের টোকিও সম্পর্কে। তারা অনেক বাংলাদেশী কাজ করে কনস্ট্রাকশন সাইট এ। পড়তে এসেছিল অনেক বছর আগে। বলল বাসা ভাড়া বেশ। অনেক বেশি মনে হল। বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮০ বা ৯০ হাজার টাকা মাসে ছোট একটা দুই বেডরুমের ফ্ল্যাট। তাও মনে হয় টোকিও শহর থেকে দূরে। আরো ১৫ বা বিশ হাজার বলল গাড়ি পার্কিং পারমিট। বিশ বছর আগে যখন এসেছিলাম প্রচুর অবৈধ বাংগালী শুনেছিলাম। এরাই বৈধ হওয়ার পর অবৈধদের ওপর চাঁদাবাজি করত ধরিয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে। এখন সেসব নাকি নেই বা কমেছে। শুনে ভাল লাগল বাংগালীরা ভাল আছে।
ট্রেন থেকে নেমে হোটেলে চেক ইন করতে সাড়ে আটটা বেজে গেল। চারটায় বিমান নেমেছে। তাহলে চার ঘন্টা টোটাল লাগলো। মনে হলো কিছু খাওয়া দরকার। একটু বের হলাম সে রাতে। বেশ কিছু নেপালি রেস্টুরেন্ট আছে। একটিতে গিয়ে দেখি তারা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তবুও রাতের ডিনার হলো সেখানে।
জাপানের সাথে দু’ঘণ্টা সময় ডিফারেন্স, সেজন্য মেলবোর্ন সময় ভোর ছটায় ঘুম ভেঙে গেল। তখনো জাপানে ভোর চারটে। তারপর একটু পর আকাশ ফর্সা হলে একটু বাইরে বের হলাম। শুনেছি কাছেই জোজোজি পুরোনো বৌদ্ধ মন্দির। আসলেই কিছুক্ষণ হাঁটতেই তার সন্ধান পেলাম শিবা পার্কে। আস্তে আস্তে ঢুকছি, এমন সময় মন্দিরের ভেতর থেকে খুব সুন্দর মনোরম মোলায়েম একসাথে গান গাওয়া, এরকম শব্দ ভেসে আসছে। মন্দিরের ভিতরে ঢুকলাম। অত্যন্ত আকর্ষণীয় কাঠের কাঠামো, বড় বড় বিম এবং পিলার। মেঝেতে সুন্দর কার্পেট। বাইরে কিছু চেয়ার দেয়া। সেটিও মন্দিরের ভিতরে কিন্তু যেখানে পুরোহিতরা বসে তার বেস্টনীর বাইরে। বেশ কিছু অনুসারী চেয়ারে বসে রয়েছে। আমিও বসলাম। সবার হাত নমস্কারের ভঙ্গিতে। এবং চোখ বন্ধ কারো কারো। কেউ কেউ গভীর ধ্যানমগ্ন। একটু পর পর পুরোহিতদল একেকজন একেক রকমের কাজ করছে।
প্রথম ঘন্টা বাজল, সেটার শব্দ মন্দিরের মধ্যে অনুরণিত হচ্ছে। এক ধরনের ধূপের ধোঁয়ার গন্ধ। আর সন্ন্যাসীদের সমস্বরে বৌদ্ধ ধর্মের শ্লোক গুলো এক সুরে আওড়ানো, এক অদ্ভুত মোহময় এবং আধ্যাত্মিক একটি পরিবেশ তৈরি করছে। কিছুক্ষণ থাকলাম। তারপর দেখলাম ও পরে জানলাম প্রথম ঘণ্টায় মন স্থির করতে হবে, দ্বিতীয় ঘন্টায় বুদ্ধকে স্মরণ করতে হবে, এরকম আরো কিছু আছে। আমি পুরোটা বুঝতে পারিনি। পুরো নিয়মকানুন শেষ হলে, প্রধান পুরোহিত ১০ মিনিট জাপানিজ ভাষায় বক্তব্য দিলেন। না বুঝলেও ধরে নিলাম গৌতম বুদ্ধের কোন কিছু বাণী বা শিক্ষাকে তিনি ব্যাখ্যা করলেন। সেটা শেষ হলে শিক্ষানবিশ সন্ন্যাসী এবং সন্ন্যাসীনীরা এক একজন এক একটি কাজ শুরু করল। আমি দাঁড়িয়ে দেখছি। একজন সন্ন্যাসী সামনের কাঠের বেড়াটি এমন ভাবে পরিষ্কার করছেন, ঘষে মেজে, যে মনে হচ্ছে এর চেয়ে আনন্দদায়ক কোন কাজ হতেই পারে না। এটি কেন এত উজ্জল এবং তেলতেলে সেটি বুঝতে আমার বাকি রইল না। এরা এমন প্রশিক্ষণ নিচ্ছে যে কাজ তারা করে গভীর মনোযোগ, ভক্তি এবং আনন্দের সাথে বিনিময় কোনো কিছুর প্রাপ্তি ছাড়াই করবে।
মনে হল তারা মনে মনে রবীন্দ্র সংগীত গাইছে সামনে বিশাল পুরোনো ও ধ্যানস্থ বুদ্ধ মূর্তিকে উদ্দেশ্য করে …..তব, শ্রী চরণ তলে – নিয়ে এসো মোর মত্ত বাসনা গুছায়ে… মলিন মর্ম…।
আমি বের হতেই একজন সন্যাসীকে বললাম, সুমিমাসেন, জিজ্ঞেস করলাম ইগিও হানাসেমাসুকা? তারমানে আপনি কি ইংরেজি জানেন? গুগল থেকে অনুবাদ করে নিয়েছি। সে মাথা নেড়ে, মাথা নিচু করে দুবার ঝাঁকিয়ে বলল, পারিনে। আমি বললাম, আমি তোমাদের এখানকার সম্পর্কে একটু জানতে চাচ্ছিলাম। এই মন্দিরটি কত পুরনো, বা লোকেরা কেমন আসে। সে ভেঙে ভেঙে একটু ইশারা ইংগিতে বলল, বেশি মানুষ আসে না। আমি ঠিক বুঝলাম না কি, বা কি বোঝালো, তবে মনে হলো যারা সন্ন্যাসী, ওদের কারো কারো অন্য কাজকর্ম আছে। সকালে এখানে এসে এই পোশাক পরে সন্ন্যাসীর দায়িত্ব নেয়। নতুন মানুষজন খুব বেশি পুরো সময় সন্ন্যাসী হতে চায় না। আমি বললাম, আমি যেখানে বড় হয়েছি, গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান এবং যেখানে বোধিবৃক্ষের নীচে তিনি নির্বাণ লাভ করেছিলেন, সেখান থেকে খুব দূরে নয়। তা শুনে সে কয়েকবার মাথা ঝুঁকিয়ে আমাকে শ্রদ্ধা জানালো।
একটু পরে দেখলাম বেশ কিছু মানুষ আসা শুরু হয়েছে। তারা অফিসগামী লোকজন মন্দিরের দিকে একটু মাথা ঝুঁকিয়ে শ্রদ্ধা প্রদান করে যার যার গন্তব্যে দিনের কাজে চলে যাচ্ছে। সকাল তখন। নিচে দেখলাম একটা বেজমেন্টের মত যেখানে বুদ্ধের দুজন শিষ্য আনন্দ এবং রাহুল এবং তাদের কিছু পুরোনো নিদর্শন বা রেলিক্স আছে। প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু ১৯৫৫ সালে ভারত জাপান সম্পর্ক উন্নতি করার জন্য নমুনা হিসেবে সেখানে প্রদান করেছেন। সেটি দেখার ইচ্ছে ছিল কিন্তু নির্দিষ্ট সময় ছাড়া এটা খুলে না। পরে বেশ সৌভাগ্য যে মিনাটো সিটি ফস্টিভেল উপলক্ষে পরে আরেকদিন সেখানে গিয়েছি ফিরে আসার আগে। পুরনো বিশেষ বৌদ্ধ মূর্তি, ওই সময়কার জাপানি রাজাকে, শগুন বলে, তাদের তৈরি বিভিন্ন নমুনা প্রদর্শন করা হচ্ছে অনেকটা মিউজিয়াম এর মত একটা জায়গায়। ওই রেলিক্স এর নমুনা ওখানে রয়েছে যদিও আমি খুব বেশি বুঝতে পারেনি।
তারপর দু একটি জায়গায় দেখলাম জাপানিজ ক্যালিগ্রাফি, পুরনো দিনের চিত্রকর্ম যেগুলো শুধুমাত্র বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের ই দেখার সুযোগ হয়। জাপানের প্রাকৃতিক বিভিন্ন বিষয়। নিচে বড় একটি বৌদ্ধ মূর্তি এবং বৌদ্ধদের বিভিন্ন ধর্মীয় পুস্তক, পাথরের উপর খোদাই করা গৌতম বুদ্ধের পায়ের চিহ্ন দেখলাম। এরকম অনেক জাপানিজ বৌদ্ধ মন্দির সেখানে রয়েছে । তাদের জীবনে অন্যদের প্রতি সাহায্য করার প্রবণতা নিঃস্বার্থভাবে কিছুটা বৌদ্ধ ধর্মের আদতে পেয়েছে, সেটি রবীন্দ্রনাথ জাপান যাত্রী তে অনেক লিখেছেন। এভাবে সারাদিন এই মন্দির এলাকায় অনুসারীরা আসতে থাকে। সময় মত সার্ভিস সম্পন্ন হয়। এভাবেই জাপানের ধর্মীয় বিশ্বাস সম্পর্কে আমার জানা হলো। তবে শুনেছি তারা বৌদ্ধ ধর্মকে কাস্টমাইজ করেছে জাপানের সাথে সংগতি রেখে এবং অনেক কিছু জাপানিজ ভাষায় অনুবাদ করেছে।
এরপর আমার ইচ্ছে ছিল শিন্টো ধর্ম নিয়েও একটু জানার ইচ্ছে ছিল। দেখলাম একটা সবচেয়ে বড় গেট বিখ্যাত মেইজি শিন্টো মাজারে। জাপানিজরা বলে শিন্টো তাদের জাগতিক ধর্ম যেটা বৌদ্ধ, কনফুসিয়ানিজম, তাওবাদ এগুলোকে সব মিলিয়ে মিশিয়ে প্রকৃতিকে উপজীব্য করে বানিয়েছে। আর যেখানে আধ্যাত্মিকতা, মৃত্যুর পর কি হবে বা মানসিক শান্তি কিভাবে পাওয়া যাবে, সেগুলোর জন্য তারা বৌদ্ধ ধর্মের উপর নির্ভরশীল। এগুলোকে বলা হয় জিনজা, ওদের বিশ্বাসের জায়গা। মন্দিরে ঢুকতেই একটি গেট থাকবে। গেটের উপরের কাঠ নিদের্শক হিসেবে কাজ করে। বৌদ্ধমন্দির না শিন্টো শ্রাইন তা দেখে বোঝা যাবে। সাধারণত একটা পোস্টের উপরে দুটো কাঠ থাকবে, যাকে বলে টরি এবং এটি কিছুটা বাঁকানো, নৌকোর মতো। ভিতরে দেবতা, সাধারনত: কোনো জন্তু। বাইরে টেমিজু বেসিন নামে ছোট্ট একটি জলাধার যেখান থেকে পানি ছিটিয়ে শুচি হতে হবে। তারপর ভিতরে গিয়ে দেবতার উদ্দেশ্যে দুবার মাথা নিচু করে দুবার হাততালি দিতে হবে। তারপর আবার পয়সা দিয়ে, আবার একবার মাথা নিচু করে পিছন দিক দিয়ে আসতে হবে মন্দির এবং দেবতা কে সামনে রেখে। সেখানে কাঠের এমা বলে, ঝুলানো আছে, যেখানে যারা মাজারে যাবে তারা তাদের ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে, পূরণের জন্য দেবতার কাছে। সব ধরনের তাবিজ-কবজ বিক্রির ব্যাবস্থা রয়েছে। যেমন মোটরসাইকেল অ্যাক্সিডেন্ট যেন না হয়, পরীক্ষায় ভালো করা, চাকরীতে পদোন্নতি, স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক যেন ভালো থাকে ইত্যাদি। আমার মনে নেই সব, একটা করে নাম লেখা এবং তার কত খরচ হবে তা লেখা। পারিবারিক শান্তির জন্য ২০০০ ইয়েন বা ১২০০ টাকা। সবচেয়ে বেশী রেট মনে হলো ওটারই। সবচেয়ে বড় শ্রাইন টোকিওতে মেইজি সেন্টারে গিয়েছিলাম তা দেখতে।
এবারে এগুলো দেখতে দেখতে আমার মনে হল, একটি দেশ যত বড়ই হোক না প্রযুক্তিতে এবং আধুনিকতায়, সংস্কৃতির রক্ষা, তার প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিজের পূর্বপুরুষের পরিচয় জানা এক জাতিসত্তার জন্য অনেক জরুরী। সংস্কার সংস্কৃত শব্দ। আমরা যে বলি পরম্পরা, সেটার মূল্য জাপানিরা অনেক ভালো বোঝে ও জানে মনে হলো। এবং তাদের জীবনযাত্রার মধ্যেও ধরে রেখেছে সেটা বুঝতে পারি।
আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের দেশে ও নতুনদের মধ্যে এ মূল্যবোধগুলো দ্রুত বিলুপ্তি ঘটছে। তবে কুসংস্কার ধরে রাখার দরকার নেই। এটা সত্যি তাদের সবাই এক নয় চিন্তায়, তাদের মধ্যেও পার্থক্য আছে। তাদের মধ্যে প্রকৃতিগতভাবে একটু জড়তা, লজ্জাবোধ, পারফেকশনিস্ট ভাব আছে। আমার এখন ইচ্ছা হচ্ছে নিহংগ বা জাপানিজ দেশ সম্পর্কে আরো পড়ার। জাপানিদের সোশ্যাল হারমনি বজায় রাখা, সেটা কনফুসিয়াস এবং বুদ্ধ দর্শন থেকেই মূলত এসেছে। সেটা বাবা মার প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য, শিক্ষক, সমাজ এবং পূর্বপুরুষদেরকে প্রাধান্য দেয়া নিজস্ব ব্যক্তিগত খুশী ও সুখের চেয়ে। পরিচ্ছন্নতাবোধ, মিতব্যয়িতা, পরিমিতিবোধ সারা পৃথিবীর সম্প্রদায় শিখতে পারে। তারা অত্যন্ত প্রযুক্তিগতভাবে দক্ষ, মেটিকুলাস, পরিশ্রমী, কিছুটা ইন্ট্রোভার্ট যদিও। বিশাল উন্নত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে, পৃথিবীর দ্বিতীয় অর্থনীতিতে স্থান করে নেয়া সহজ ছিল না। তাদের নিয়মানুবর্তিতা, পরিশ্রম, কাজের প্রতি শ্রদ্ধা তাদেরকে সেই জায়গাটায় নিয়ে গিয়েছে। আমরা কি পারি না তাদের সে সব ভাল গুনগুলি নিতে?