ভোরে ঘুম থেকে উঠে দেখি তুমুল বৃষ্টি । এতো বৃষ্টিতে কীর্সতং রুংরাং সাইংপ্রা (সাইংপ্রা ঝর্না) যাওয়া প্রায় অসম্ভবই বটে। আরো কিছু অলস সময় পার করলাম। আমাদের গাইড খিচুড়ি আর মুরগীর মাংস রান্না করলো। খেতে খেতে দেখি বৃষ্টি একদম বন্ধ হয়ে গেলো। খেয়ে উঠেই আমরা রেডি, উদ্দেশ্য – সাইংপ্রা ঝর্না জয়।
এদিন আমরা যার বাসায় ছিলাম তাকেই গাইড করে নেই। তার নাম পাদুই। আমরা গতকাল ৯ জনের টীম এদে খেমচং পাড়া পৌঁছাই। তবে আজকে আমাদের সংখ্যা ৫। বাকীরা পাড়ায় বিশ্রাম করবে। গতকালের ক্লান্তি অনেরই দূর হয়নি। সত্যি বলতে আমিও ক্লান্ত ছিলাম। তবে মনের জোরে আর অদেখা স্বপ্নের সাইংপ্রা জয়ের প্রবল ইচ্ছা আমার শরীরকে ক্লান্ত হতে দিচ্ছিলোনা। তার উপর আমাদের গাইড সতর্ক করলো যে এই ট্রেইল মারাত্মক দুর্গম, সঙ্গে জোঁকের ভয় তো আছেই। যাহোক সাত পাঁচ না ভেবেই রওনা করলাম।


যাওয়ার পথের শুরুতেই ২ টি ঝিরি পড়ে। এরপর ৩ টা পাহাড় বেয়ে উঠলে একটা ভীষণ সুন্দর জুম ক্ষেত। আমাদের চোখ, মন – প্রান সব জুড়িয়ে যাচ্ছিলো এতো সুন্দর দৃশ্য দেখে। আমরা একটু থেমে আবার হাঁটতে শুরু করলাম। খাড়া পাহাড় বেয়ে আরো ২ টা পাহাড় পাড়ি দিতেই সামনে চলে আসে খুবই দুর্গম বাঁশ বাগান। পুরো পাহাড়েই শুধু বাঁশ আর বাঁশ। এমনও স্থান আছে এই পাহাড়ে যেখানে সূর্যের আলোই পৌঁছায়না, এতো ঘন বাঁশঝাড়। যাহোক আমরা নেমে কিছুদূর ঝিরি আবার পাথরের পাহাড় আবার ঝিরি এভাবেই পথ চলছি। এর মধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়। বলে রাখি আমরাই এই বর্ষায় প্রথম সাইংপ্রা জয় করি। তাই রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ ছিলো। পাথর ছিলো পিচ্ছিল, পথে ছিলো নানান বাঁধা। আমাদের গাইড আমাদের জন্য পথ তৈরি করে নিয়ে যাচ্ছিলো।

এবার খাড়া পাথর বেয়ে একদম চূড়ায় উঠলেই সাইংপ্রার সর্বোচ্চ ধাপে উঠে যেতে পারবো৷ এই পাহাড়ি বনটাকে আমি আমাজনের সঙ্গে তুলনা করেছি। এতো উঁচু উঁচু গাছ যে এখানে সূর্যের আলো পৌঁছায়না। ভঙ্গুর পাথর বেয়ে উঠতে উঠতে একটু একটু করে উঁকি দিচ্ছিলো সাইংপ্রার এক একটি ধাপ। এত গর্জন আমাদের উৎসাহিত করছিলো।

এভাবে এক পা এক পা করে উঠে গেলাম চূড়ায়, এবার বামে নামলেই সাইংপ্রার দেখা মিলবে। ব্যাস আমি গাছের ফাঁক দিয়ে একটু দেখেই ইয়া ইলাহী বলে চিৎকার মারলাম। আর তর সইছিলোনা ৷ কিন্তু অতি আবেগী হওয়া যাবে না। একটু পা পিছলে গেলে কোথায় গিয়ে পড়বো হদিস নাই।
আস্তে আস্তে নেমে দাঁড়ালাম এই দানবীয় ঝর্নার সামনে। এখন পর্যন্ত আমার দেখা সেরা ঝর্না এটি। সামর্থ ও শক্তির সর্বোচ্চ পরীক্ষা নিবে এই সাইংপ্রা। আল্লাহর এ অপরূপ সৌন্দর্য্যের নিদর্শন আমরা যতই দেখছি ততই মন্ত্রমুগ্ধ হচ্ছি। প্রায় ৩০ মিনিট আমরা এখানে ছিলাম।
এবার ফেরার পালা, ফেরার পথ আরো অনেক বেশী দুর্গম মনে হচ্ছে আমার। যাহোক ধীরে ধীরে এগিয়ে সহযোগী টিমমেট দের হাতে হাত রেখে ভঙ্গুর পাথরের পাহাড়, পিচ্ছিল ঝিরি, বাঁশবাগান আর উঁচু খাড়া পাহাড় বেয়ে একটা জুম ঘরে এসে পৌঁছালাম। এখানে আমরা প্রায় আধ ঘন্টা আড্ডা দেই, মুহুর্তেই আমাদের সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।
এখানে আমরা শীতল বাতাসে গা লেলিয়ে দেই আর মেঘেদের আনাগোনা দেখতে দেখতে খালি গলায় গান ধরি ❝চল দোতং পাহাড় জুম ঘরে, পুর্নিমা রাত বর্ষা জুড়ে………….

বি.দ্র: এই ট্রেইল মারাত্মক দুর্গম। এখানে ভ্রমণ করলে অবশ্যই সতর্ক থাকবেন। লেখক তার ভিডিওটা সাইংপ্রায় নিহত হওয়া আতাহার ইশরাক রাফী’র নামে উৎসর্গ করেছেন।