অনেক পুরোনো স্মৃতি মনে পরে গেলো। জুন মাসের প্রথম দিকের কথা, তখনো বর্ষা পুরোপুরি আসেনি, উদেশ্য ছিল বাংলাদেশের একমাত্র মিঠা পানির বন “রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট” এর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা।

নৌকায় বসে বসে পাখির গান শোনা, বানরের সাথে দুষ্টামি করা, হরেক রকম সাপেদের সাথে গাছে ঝুলাঝুলি করা। কিন্তু কপাল খারাপ ছিল তাই আর সোয়াম্প ফরেস্টের আসল সৌন্দর্য দেখা হয়নি কারণ রাতারগুলে কোনো পানিই ছিলো না। তাতে কি? কিশোর ভাই (আমাদের টিম লীডার) তো আর ঘরে বসে থাকার লোক না, উনার উৎসাহে চলে গেলাম লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে।

বনবিভাগের গেস্টহাউজে কোন রকম রাতটা কাটিয়ে সকাল ৯টার দিকে “হামহাম ঝর্না” দেখার উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলাম আমরা ১৩ জন। ৩টা সিএনজি ভাড়া করে রওনা দিলাম। যাত্রা পথে আমাদের একটা সিএনজি বৃষ্টির পানিতে ভিজে অসুস্থ হয়ে পরে। সেই সুযোগে কাছের একটা চা বাগানের উপর হামলা চালালাম ছবি তোলার জন্য।

সব ঝামেলা চুকিয়ে আমরা যখন হামহাম ঝর্নার প্রবেশ মুখে আসি তখন ঘড়িতে প্রায় ১২টা। গাইড হিসাবে পেয়ে গেলাম “ছবিলাল” ভাইকে, আর প্রস্তুতি হিসাবে সবাই নিজ নিজ শরীরে লবন ও তেল মেখে যাওয়ার জন্যে রেডী। সবার হাতে ৫ ফুট সাইজের লাঠিও ছিল, হাটা শুরু করলাম। প্রায় ঘন্টা খানেক পথ হাটার পর একটা গ্রুপ এর সাথে দেখা হয়ে গেলো, যারা ব্যাক করছে। কথা হলো তাদের সাথে, তাদের একটাই কথা “ভাই আপনারা এখন যাইয়েন না, ফিরতে পারবেন না”। কিন্তু কিশোর ভাই কি কারো কথা শোনে?? আমরা যাবোই। যাওয়ার সময় নতুন একটা বন্ধুর সাথে খুব খাতির হয়ে যায়, এতো খাতির যে সে আমাদের কাউকেই ছাড়্তে চায় না। সবসময় গায়ের সাথে লেগেই থাকে, আমি “জোঁকের” কথা বলছি হাহাহাহা। আমাদের সবার হাতে পায়ে এমন ভাবে লেগে ছিলো যেনো মনে হয় সুপার গ্লু দিয়ে লাগানো হয়েছে।

খাল জঙ্গল পাহাড় পেরিয়ে আসলাম সব চেয়ে ভয়ানক “মোকাম টিলার” নিচে। বৃষ্টি হবার কারনে পিচ্ছিল খাড়া টিলা বেয়ে বেয়ে উঠতে যে কি কষ্টটাই না হয়েছিলো! আমরা যখন হামহাম ঝর্নায় গিয়ে পৌছাই তখন সন্ধ্যা হতে প্রায় ১ ঘন্টা বাকি। আধা ঘন্টা ঝর্ণার পানিতে ডুবাডুবি করে মোকাম টিলায় উঠতে শুরু করলাম। মোকাম টিলায় ওঠার আগেই সন্ধ্যা হয়ে গেলো। ছবিলাল ভাইয়ের সহায়তায় বহু কষ্টে পথটি পার হলাম।

কিছক্ষনের মধ্যেই সন্ধা পেরিয়ে রাত। চাদের আলোয় আমরা হাঠছি আর সাথে মায়া হরিন এর মায়া কান্না শুনছি। থমথমে পরিবেশ আমরা ছাড়া এই জঙ্গলে আর কোন মানুষ নেই। সাথে আমাদের সঙ্গী জোক, প্রায় ৩ ঘন্টা হাটার পর টর্চের আলো দেখে অনেক খুশি হলাম। পরে বুঝতে পারলাম গ্রামের মানুষ আমাদের দেরি দেখে দলবল নিয়ে খুঁজতে বের হয়েছে। অবশেষে, তাদের সাথে কথা বলতে বলতে গ্রামের ভিতর প্রবেশ করলাম। সবাই নিজ নিজ শরীর থেকে আমাদের ভ্রমন সঙ্গী অনেকগুলো জোঁক ছাড়িয়ে ট্রাকে উঠে বাজারে, সেখান থেকে আবার সিএনজিতে বসে রওনা হলাম লাউয়াছড়ার গেস্ট হাউজ এর উদ্দেশ্যে। রাত প্রায় ২টার সময় গন্তব্যে পৌছলাম।

দুঃখ বলতে একটা জিনিসই রয়ে গেছে, ভয়াবহ সেই রাতের কোন স্মৃতি ক্যামেরা বন্দি করতে পারিনি…