অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম কোনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মারি সানসেট (Murray Sunset) ন্যাশনাল পার্কের অবস্থান। এর আয়তন ৬,৩৩০ বর্গকিলোমিটার অর্থাৎ বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা রাঙামাটির সমান। বিশ্বে মাত্র অল্প কয়েকটি আধা-শুষ্ক (semi -arid) অঞ্চল রয়েছে, মারি সানসেট ন্যাশনাল পার্ক তাদের মধ্যে অন্যতম। ইউরোপিয়ানরা অস্ট্রেলিয়াতে বসবাস শুরু করার আগে এখানে মিলেওয়া-মালি (Millewa-Mallee) আদিবাসীরা বসবাস করতেন। বলা হয়ে থাকে যে এখানকার পরিবেশ তুলনামূলকভাবে অস্পৃশ্য অর্থাৎ ইউরোপিয়ানরা অস্ট্রেলিয়াতে বসবাস শুরু করার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এই অঞ্চলে পরিবেশর উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি।

পার্কের প্রবেশ পথ

পার্ক ইনফরমেশন বোর্ড
মারি সানসেট ন্যাশনাল পার্কের অবস্থান মেলবোর্ন থেকে প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার, এডিলেড থেকে ৩৪০ কিলোমিটার এবং মিলদুরা (Mildura) থেকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দূরে। মেলবোর্ন থেকে সরাসরি গাড়ি চালিয়ে চলে যাওয়া যায়। যারা লম্বা ড্রাইভ পছন্দ করেন না তারা বিমানে মিলদুরা গিয়ে সেখান থেকে গাড়িতে করে পার্কে আসতে পারেন। উল্লেখ্য যে, পার্কটির অনেকগুলো প্রবেশ পথ রয়েছে তবে বেশিরভাগ পথগুলো ছোট গাড়ির জন্য নয় অর্থাৎ ফোর হুইল গাড়ির প্রয়োজন হবে। তিনটি প্রধান মহাসড়ক ক্যাল্ডার (Calder), ম্যালি (Mallee) এবং স্টুর্ট (Sturt) দিয়ে এই পার্কটি সংযুক্ত।

বিগত বছরগুলোতে আমি বেশ কয়েকবার ভেবেছি এই পার্কটিতে বেড়াতে যাবার। তবে নানা কারণে সেটা আর হয়ে উঠেনি। এবার ছেলের স্কুল ছুটিতে পরিবারের সবাই মিলে বেড়াতে যাবো সেভাবে পরিকল্পনা করলাম। রোজার সময় ক্যাম্পিং করা কঠিন বা ক্যাম্পিং করা যায় না এমন ধারণা থেকে বেড়ে হয়ে আসতে পারা ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। রোজা শুরু হয়ে যাওয়াতে পরিকল্পনা ছিল একটু ভিন্ন ধরণের। শনিবার বিকেলে সব গুছিয়ে বের হয়ে গেলাম। সাথে ইফতার, সেহরি এবং আগামী কয়েকদিনের রসদ। প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝেই মেলবোর্ন থেকে যাত্রা শুরু করলাম।

মেলবোর্ন থেকে অনেকে দূরের পথ এবং ভোগোলিক অবস্থান ভিন্ন হওয়াতে মারি সানসেট ন্যাশনাল পার্ক এলাকার ভূপ্রকৃতি এবং আবহাওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। টানা ২ ঘন্টা পথ পাড়ি দিয়ে বিউফোর্ট (Beaufort) শহরের কাছাকাছি আসতেই মাঝে বৃষ্টি খানিক ধরে এসেছিলো। ইফতারের সময়ও হয়ে গিয়েছিলো। ওয়েস্টার্ন হাইওয়ে ধরে শহরে ঢুকতেই বিউফোর্ট ব্যান্ড রোটুন্ডা আর তার সাথে কয়েকটি টেবিল চেয়ার পাতা। গাড়ি থেকে নেমে ইফতারের আয়োজন করার সময় আবার ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। তারাতারি করে আবার সবাই মিলে গাড়িতে গিয়ে বসলাম। এর মধ্যেই আজান হয়ে গেলো। একদল স্থানীয় কিশোর বয়সী ছেলে বৃষ্টিতে ভিজে হৈহুল্লোড় করতে থাকলো। আমরা ইফতারে মন দিলাম।

লবণের ঢিবি
ইফতারের পর্ব সেরে পাশের ফিশ এন্ড চিপসের দোকান থেকে কফি নিয়ে আবার যাত্রা করলাম। আমাদের আজকের গন্তব্য হরসাম (Horsham) পর্যন্ত। এখানে রাত কাটিয়ে পরেরদিন সাকলে ন্যাশনাল পার্কে যাওয়া হবে। বিউফোর্ট থেকে কিছুটা পথ এগিয়ে যাওয়াতে বৃষ্টির প্রকোপ খানিকটা কমে গেলেও আকাশ ভর্তি মেঘ আর বৃষ্টির কারণে চারপাশ ছিল ঘন অন্ধকারে নিমজ্জিত। রাস্তায় মাত্র দুটো লেন, আলো জ্বালিয়ে গাড়ি আসছে সামনে থেকে, আদ্রতা বেড়ে গিয়ে গাড়ির কাচ কিছুটা ঘোলাটে। এরকম আবহাওয়ায় গাড়ি চালানোটা সহজ নয় তবে রাস্তায় তেমন কোনো গাড়ি ছিল না। গত বৃহস্পতিবার – শুক্রবারের পরিস্থিতি হয়তো ভিন্ন ছিল। ড্রাইভ করার সময় এরকম পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে যখন রাস্তার পার্শবর্তী বন এলাকায় ক্যাঙ্গারুর আনাগোনা থাকে। রাস্তায় ক্যাঙ্গারু না দেখলেও হঠাৎ কোথা থেকে যেন ২টি কোয়ালা গাড়ির ঠিক সামনে রাস্তার উপর দিয়ে দৌড়ে পার হয়ে গেলো। অল্পের জন্য কোয়ালা দুটি এবং আমাদের গাড়ি সবই রক্ষা পেলো। যাই হোক নিরাপদে হরসাম পৌঁছে, গাড়িতে ফুয়েল নিয়েই চলে গেলাম আগে থেকে ঠিক করা এক বাসায়।


সেহরি খেয়ে কিছুক্ষন ঘুমিয়ে উঠে ক্যাম্পিংয়ে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে নিলাম। হরসাম থেকে মারি সানসেট ন্যাশনাল পার্ক প্রায় তিন ঘন্টা পথ। হরসাম থেকে হেনটি (Henty) হাইওয়ে দিয়ে মারি সানসেট ন্যাশনাল পার্ক প্রায় তিন ঘন্টা পথ। অস্ট্রেলিয়ার সাইলো আর্ট ট্রেইলের অংশ এই পথে আগেও বেশ কয়েবার গিয়েছি। পথে পড়লো ব্রিম (Brim ), রোজবেরি (Rosebery) এবং প্যাচেওলোক (Patchewollock) সাইলো আর্ট। ভিক্টোরিয়াতে মোট ২২টি সাইলো আর্ট। সবগুলোতেই আগে গিয়েছি কাজেই সময় বাঁচাতে এবার আর আমরা সাইলো আর্টে থামলাম না। আরজু দুই ঘন্টা ড্রাইভ করে ওয়ালপেআপ (Walpeup) শহরে এসে গাড়ি থামলো। সেই সুযোগে ছোটো এই শহরটি দেখার সুযোগ হয়ে গেলো।

একটি পেট্রল স্টেশন, জেনারেল স্টেশন, পোস্ট অফিস, একটি প্রাইমারি স্কুল, ছোট একটি পাঠাগার, একটি ক্যাথলিক এবং একটি লুথেরান চার্চ এই নিয়ে ওয়ালপেআপ শহরের জনসংখ্যা মাত্র ১৫০ জন। হোপেটাউন-ওয়ালপেআপ (Hopetoun-Walpeup) রোড দিয়ে শহরে ঢুকতেই ক্রিয়েগান (Creagan) স্ট্রিট এবং মারফি (Murphy) রোডের কোণে একটি ক্যারাভান পার্ক রয়েছে। এখানে বিশ্রামের যাবতীয় ব্যবস্থা যেমন বারবিকিউ এরিয়া, বাচ্চাদের খেলার জায়গা এবং খেলার সরঞ্জাম রয়েছে। আমার আসে পাশে খানিকটা হেটে দেখলাম। পথের ধরে বিশেষ এক ধরণের ইউক্যালিপ্ট ফুচিয়া গাম (Eucalyptus Forrestiana) গাছ দেখতে পেলাম। ফুচিয়া গামের ফুলগুলো খুব ভিন্ন ধরণের এবং এই ধরণের ইউক্যালিপ্ট আগে কখনো দেখিনি।

