বেড়াতে খুবই ভালোবাসি আমরা দু’জন। তাই সুযোগ পেলেই ধারেকাছে বা দূরে কোথাও বেরিয়ে পরি। এতো ঘুরাঘুরি হলেও কখনোই ক্যাম্পিং যাওয়া হয়নি আমার। সত্যি বলতে খুব একটা আগ্রহও কখনো হয়নি। বনেবাদাড়ে তাবু খাটিয়ে ঘুমানোর অংশটা মোটামুটি মজার মনে হলেও, বাথরুম কেমন হবে এই চিন্তাই অস্থির করে ফেলতো। তবুও গতবছর কাছের দুই বন্ধুর পিড়াপিড়িতে ভাবলাম, সবকিছুরই অন্তত একবার অভিজ্ঞতা থাকা উচিত।
প্রথমেই ঠিক করলাম, টেন্টটা কিনতে হবে ভালো দেখে। রাতে ঘুম যদি ঠিকমতো হয় তাহলে সবকিছুই এঞ্জয় করা যায়। তাবু কেনা হলো, এয়ার ম্যাট্রেস, পোর্টেবল ফ্যান, লাইট ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। লম্বা একটা লিস্ট করা হলো প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের। রান্নার জন্য ছোট্ট স্টোভ, একটা কাস্ট আয়রনের হাড়ি, চায়ের সরঞ্জাম, এস্কি। আয়োজন করতে গিয়ে দেখলাম, মাত্র দুইদিনের জন্য যাওয়া, তাও যে কতকিছু দরকার! কাঁথা বালিশ থেকে শুরু করে কাপড় শুকানোর ক্লিপ পর্যন্ত। আমাদের সাথের দুইজনের আগে বহুবার ক্যাম্পিং করার অভিজ্ঞতা আমাদের মতো আনাড়িদের জন্য ছিলো খুবই হেল্পফুল। দুইদিনের মিল প্ল্যান করা হলো। পরিচিত হালাল বুচার যখন শুনলো আমরা ক্যাম্পিং যাচ্ছি, যত্ন করে মাংসগুলো ভ্যাকুয়াম প্যাক করে দিলো। এস্কিতে খুব ভালো ছিলো।

ক্যাম্পিং সাইট হিসেবে নির্বাচিত হলো, ইডিথ ফলস। ডারউইন থেকে আড়াই ঘন্টার পথ। যাবো জুলাই মাসে। আমাদের এখানে অস্ট্রেলিয়ার বাকি মেজর শহরগুলোর মতো ঠান্ডা পড়ে না। সত্যি বলতে এখানে শীতকাল ব্যাপারটাই নেই। ডারউইন বা এর আসেপাসের এলাকায় দুইটা সিজন। ড্রাই আর ওয়েট। মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর/অক্টোবর পর্যন্ত ড্রাই সিজন। এই সময়টায় আবহাওয়া খুবই সুন্দর। দিনের বেলা ঝকঝকে রোদ, বাতাসের আর্দ্রতা কম তাই কোনো ঘাম হয় না। আর নভেম্বর থেকে এপ্রিল হলো ওয়েট সিজন। নভেম্বর/ডিসেম্বরে ভয়ংকর গরম, বাতাসে অনেক বেশি আর্দ্রতা একটা ভ্যাপসা আবহাওয়া তৈরি করে। এই সময়টা বাধ্য না হলে কেউ বাইরে যেতে চায় না। ডিসেম্বরের শেষের দিকে বৃষ্টি শুরু হলে তখন গরমটা কিছুটা সহনীয় হয়। ওয়েট সিজনে সব আউটডোর এক্টিভিটি বন্ধ থাকে। তাই ড্রাই সিজনের মাস কয়টায় সবাই বেড়ানোর জন্য পাগল হয়ে যায়।
নির্ধারিত দিনে, গাড়িতে জিনিসপত্র বোঝাই করে আমরা চারজন রওয়ানা দিলাম । গন্তব্য, নিটমিলুক ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে ইডিথ ফলসের ক্যাম্প গ্রাউন্ড। ক্যাম্পগ্রাউন্ডটা বেশ ছড়ানো আর বড়। একটা কিয়স্ক আছে ক্যাম্পগ্রাউন্ডে ঢুকতেই। সেটা অফিস কাম ক্যাফে কাম কনভিনিয়েন্স স্টোর। কিন্তু বিকাল ৪ টায় বন্ধ হয়ে যায়। আমাদের থাকার জন্য পাওয়া গেলো ৬ নাম্বার সাইট। প্রতি এডাল্টের প্রতি রাতের জন্য $৮.৮০। ইডিথ ফলসের ক্যাম্পগ্রাউন্ড নন পাওয়ারড সাইট। মানে এখানে ইলেক্ট্রিসিটির কোনো লাইন নেই। সন্ধ্যা হলে হারিকেন, মোমবাতি আর চার্জার লাইটই ভরসা। পৌঁছে প্রথমে টেন্ট দাড়া করালাম। সাথে একটা হ্যামক নিয়েছিলাম, সেটাও ঝুলানো হলো। জুলাই মাসের সুন্দর ঝিরিঝিরি হাওয়ায় হ্যামকে ঝুলতে ঝুলতে মনে হলো, এসে খুব ভুল করি নি।
দুপুরে বাসা থেকে বানিয়ে নেয়া স্যান্ডউইচ দিয়ে লাঞ্চ করে আমরা উপরের ফল দেখতে রওয়ানা দিলাম। পার্কিং লটের পাশের ট্র্যাক ধরে গেলে, আপহিল রাস্তায় ২০ মিনিট থেকে আধা ঘন্টার হাটা পথে উপরের ফলে পৌঁছে যাওয়া যাবে। আপনার ফিটনেসের উপর ডিপেন্ড করবে এই ট্র্যাকটা আপনার জন্য কতটা সহজ বা কঠিন হবে। তবে ব্রেক নিয়ে নিয়ে এগুলে, প্রপার ফুটওয়্যার থাকলে আর হাইড্রেটেড থাকলে কারো জন্যই খুব কঠিন হওয়ার কথা না। আর সত্যি বলতে উপরের ফলটা এতোটাই সুন্দর যে পৌঁছানোর পর এই কষ্টকে কোনো কষ্টই মনে হবে না।
উপরের ফলের পানিতে নামা যায়। পাহাড়ের উপরে বলে এখানে কুমিরের ভয় নেই। তবে এখানে চেঞ্জ করার বা শাওয়ার নেয়ার সুবিধা নেই। পানি থেকে উঠে সেই কাপড়েই আবার হেটে নিচে নামতে হবে। নামার সময় আমরা আরেকটা পথ দিয়ে নামলাম। এখান থেকে সুর্যাস্ত সুন্দর দেখা যায়। সময় কিছুটা বেশি লাগলেও নেমে আসছি বলে কষ্টটাও কম হয়। এই পথ নেমে ঠেকে নিচের ফলের কাছে। এই ফলটাও সুন্দর। কিন্তু কখনই কুমির থাকবেনা সেই গ্যারান্টি দেয়া সম্ভব না। মানুষজন তারপরেও পানিতে নামে।








রাতের জন্য আমাদের টেন্টের কাছেই বার্বিকিউ পিটে স্টেক করা হলো। সাথে কর্ন, এভোকাডো আর চেরি টমাটোর সালাদ। সব শেষে চা নিয়ে তাবুর সামনে বসে আড্ডা। খুব মোটা গরম কাপড় না লাগলেও এই সময় হালকা একটা চাদর গায়ে থাকলে আরামই লাগে।
পরদিন ভোরে উঠে নাস্তা রেডি করে খেয়ে আমরা গেলাম ক্যাথরিনে। ক্যাথরিন শহরটা আমাদের ক্যাম্পগ্রাউন্ড থেকে ৪০ মিনিটের ড্রাইভ। একদমই ছোট্ট শহর ক্যাথরিনে একটা ন্যাচারাল হট স্প্রিং আছে, ছোট্ট একটা মিউজিয়াম আছে। দিনটা কাটিয়ে আমরা আবার দুপুর বিকাল নাগাদ ফিরলাম ক্যাম্পগ্রাউন্ডে। আজকে রাতে টেন্টের সামনেই রান্না বান্না করে খাওয়া দাওয়া ধোয়াধোয়ি সেরে নিলাম। রাতের বেলা হাটতে হাটতে নিচের ফলের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। অন্ধকার রাতে ঝকঝকে আকাশ ভরা তারা দেখা একটা অন্যরকম অনুভূতি।
প্রথম ক্যাম্পিংয়ের জন্য ইডিথ ফলস বেশ আইডিয়াল। ক্যাম্পগ্রাউন্ডটা ঘাসে ঢাকা, অতএব খুব বেশি ধুলা উড়ে না। বাথরুমের ব্যাবস্থাও একদম টপ লেভেল না হলেও যথেষ্ট ভালো। শাওয়ার নেয়ার সুন্দর ব্যাবস্থা আছে। ক্যাম্পসাইট নন পাওয়ারড হলেও বাথরুমে আলো আছে। রান্না বান্নার ঝামেলায় না যেতে চাইলে সামনের ক্যাফে থেকে খাবার কিনে নেয়া সম্ভব। শুধু ওপেনিং আওয়ারটা মাথায় রাখতে হবে। সব শেষে বলবো, ক্যাম্পিং এ যাওয়াটা আমাদের সবসময়কার ছুটিতে যাওয়ার মতো না। বেশ ভালোরকম পরিশ্রম করতে হয়। টেন্ট উঠানো, বিছানা পাতা, রান্না করা, সেই থালা বাটি হাড়ি আবার কমন স্পেসে গিয়ে ধুয়ে আনা, ভাবতেই পারেন এতো কষ্ট করলে আর হলিডে কিসের? তবে প্রকৃতির এতো কাছাকাছি থাকার এই ইউনিক অভিজ্ঞতা হোটেল, রিসর্ট বা ক্যাবিনে থাকলে পাওয়া যাবে না। প্রথম দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে বের হয়ে দেখি টেন্টের পেছনে ওয়ালাবি ঘুরে বেড়াচ্ছে! মাঝরাতে ঘুম ভেংগে গেলে চারপাশের নিঝুম খোলা জায়গায় যে কতরকম আওয়াজ শোনা যায়! প্রকৃতির এতো কাছাকাছি থাকার অনুভুতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তাই বলবো, একবার হলেও ক্যাম্পিং এর অভিজ্ঞতা সবারই নেয়া উচিত। কে জানে, একবার গিয়ে আপনিও আমার মতো কনভার্ট হয়ে যেতে পারেন। আমাদের ডারউইনে মাত্র ড্রাই সিজন শুরু হচ্ছে। আমি এখনই এই বছরের ক্যাম্পিং এর প্ল্যান শুরু করে দিয়েছি।