মানালি আমার কাছে এক অলস শহর। কেননা এই একটা শহর যে শহরে গেলে আমার আর কোথায় যেতে ইচ্ছে করেনা, চুপচাপ এক যায়গায় বসে থাকতে ইচ্ছে হয়। কখনো কোন পাহাড়ের আড়ালে আধ শোয়া হয়ে, কখনো কোন নির্জন অরণ্যে হারিয়ে গিয়ে, কখনো কোন আপেল বাগানের গাছে হেলান দিনে, কখনো বয়ে চলা বিয়াসের মাঝে কোন পাথরের উপরে আবার কখনো জনাকীর্ণ মল রোডের কোন এক কর্নারে। মোট কথা মানালির যে কোন যায়গাই আমার অসম্ভব প্রিয়, একান্ত অলস সময় কাটানোর জন্য। তাই আমি আমার মত করে এই শহরের নাম দিয়েছি অলস শহর মানালি।
 
লাদাখ ট্রিপের সময় পুরো একটা দিন আর দুটি রাত রেখেছিলাম এই অলস শহরে অলস সময় কাটাতে, যে যার ইচ্ছে মত শুয়ে, বসে, হেটে, বেড়িয়ে বা নদীর তীরে কাটিয়ে দিতে। সেই একদিন আর দুই রাত শুধু বিয়াসের তীর ছাড়া আর কোথাও একদম যাইনি আমি। চুপচাপ বসেছিলাম বিয়াসের তীরে, পাথরের উপরে, পাহাড়ের পায়ের কাছে। অবশেষে, অলস শহর মানালি থেকে পরদিন শেষ রাতে লেহ এর দিকে যখন পথ চলতে শুরু করেছিলাম তখন বিয়াসের জন্য এক অজানা ব্যাথায় বুকের মধ্যে হুহু করে উঠলো। কারন যে কোন ভ্রমণে চলতি পথে বা বিশ্রামের যায়গায় আমি মনে মনে খুব খুব করে নদী খুঁজি।
 
যদি চলার পথে কোথাও কোন নদী পাই, আমার খুব আনন্দ হয়, ভ্রমণে সুখের মাত্রা আর প্রাপ্তির খাতাটা যেন একটু বেশী করে ভরে যায়। মনটা খুশিতে নেচে ওঠে। আর তাই মানালি থেকে যখন পথ চলতে শুরু করলাম বিয়াস ধীরে ধীরে অনেক অনেক দূরে সরে যেতে যেতে একটা সময় চোখের আড়ালে চলে গিয়ে রুক্ষ পাহাড়ি পথে চলতে শুরু করতেই খুব মন খারাপ হয়ে গেল, এই ভেবে যে আর বোধয় নদীর সাথে দেখা হবেনা? আর বোধয় পথ চলতে বা বিশ্রাম নিতে নদীর স্পর্শ পাবোনা! যদিও সেই মন খারাপ খুব বেশীক্ষণ স্থায়ী হতে পারেনি, পাহাড়ের নানা রঙ, রূপ, ধরন আর অপার্থিব নানা আকর্ষণে ভুলে গিয়েছিলাম নদীর কথা।
 
এভাবে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা এক টানা পথ চলার পরে সবাই বেশ ক্ষুধা অনুভূত করাতে সকালের নাস্তার জন্য বিরতি নেয়ার যায়গা খুঁজে ফিরছি সবাই মিলে। কয়েকটা ধাবা (রাস্তার ধারের ভোজনালয়) চোখে পড়েছে বটে তবে সেগুলো আমাদের চাহিদা পূরণ করতে পারবেনা বলে থামিনি। কারন যে কোন ভ্রমণে, আমাদের খাওয়া আর বিশ্রাম মানে শুধু ধাবা বা হোটেল হলেই চলবেনা, সেখানে অবশ্যই প্রাকৃতিক মুগ্ধতা থাকতেই হবে। যদি তেমন কোন যায়গায় ভ্রমণে যাই। যেমন এখানে আমাদের চাওয়া ছিল, মন মাতানো কোন পাহাড়ের ঢাল, অথবা পাহাড় থেকে ঝরে পরা কোন ঝর্ণার গান, নয়তো সুর তুলে চলে যাওয়া কোন নদীর তান, অথবা পাহাড় আর পথের অপূর্ব কোন বাঁক।
 
এমন ভাবনা নিয়ে চলার পথে পথে আমরা মনের মত কোন যায়গা খুঁজে ফিরছি। যেন পেটের সাথে মনের ক্ষুধাও মেটে একই সাথে। প্রকৃতির মাঝে কোন খাবার যায়গা। বেশ রুক্ষ পাথুরে পাহাড়ের মাঝ দিয়ে যেতে যেতেই গাড়ি হুট করে অনেকটা উপরে উঠে একটা বাঁক নিল। বাঁক পার হতেই ঝমঝম একটা শব্দ কাছে এলো। তার মানে কাছাকাছি কোন লোহার ব্রিজ আছে যেটা দিয়ে ভারী যানবাহন পার হচ্ছে। কয়েক মিনিট পরেই দেখি হ্যাঁ আসলেই তাই!
 
বেশ বড় একটা লোহার ব্রিজে উঠতে যাচ্ছে আমাদের গাড়ি। যে ব্রিজের নিচ থেকে বয়ে চলেছে টলটলে জলের নাম না জানা পাহাড়ি এক নদী! জাস্ট মনটা ভরে গেল তাকে দেখেই। মনে মনে ভাবলাম ইস এখানে, এই ব্রিজের সাথেই যদি একটা ধাবা থাকতো, তবে কি দারুণই না হত? বিধাতার কি অসীম ইচ্ছা, গাড়ি ব্রিজ পার হতেই দেখি একদম নদীর গাঁ ঘেঁসে একটা ধাবা! উচ্ছ্বাসের চিৎকার করে উঠে গাড়ি থামিয়ে এক লাফে নেমে গেলাম। আর তারপর এক দৌড়ে একদম নাম না জানা এই পাহাড়ি স্বচ্ছ জলের নদীর কাছে।
ওদেরকে বললাম, আমার জন্য নুডলস অর্ডার করতে, আর আমি নদীর তীরে নেমে একদম ওর ওপারে এক পাথরের উপরে গিয়ে ঠায় বসে পড়লাম। কি যে অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছিল তখন তা বলে বোঝাবার নয় আদৌ। শুধু নাম না জানা এই নদীর পাড়ে হিম ঠাণ্ডায় পাথরের উপর বেশ খানিকটা রোদ এসে আরামের আবেশ বুলিয়ে দিচ্ছিল প্রানজুড়ে।
 
আমার চারদিকে রুক্ষ পাহাড়ের আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতা, পাশে বয়ে চলেছে নাম না জানা এই পাহাড়ি নদী, কনকনে শীতের মাঝে সকালের রোদের আলতো আদর, একটা হিম শীতল বাতাস, বয়ে চলা নদীর কলকল, অন্য বন্ধুদের ছবি তোলার ধুম, এখানে ওখানে ছোটাছুটি, পাশের ধাবায় তৈরি হচ্ছে গরম গরম খাবার আর চলছে অবিরত সবার ক্যামেরায় ক্লিক, ক্লিল। আমি শুধু বসে ছিলাম অলস ভাবে, নদীর তীরে, পাহাড়ের ভাঁজে, আকাশের নিচে, শীতকে উপেক্ষা করে নরম রোদে।
 
সে এক অদ্ভুত আর অবাক করা, ভালোলাগার, মুগ্ধ হবার মত সকাল ছিল, নাম না জানা সেই নদীর তীরে। যে সকালের রেশ যেন এখনো রয়ে গেছে, এখনো যেন চোখ বন্ধ করলেই চলে যাই মানালি-লেহ হাইওয়ের সেই অপূর্ব সকালের কাছে, নদীর পাড়ে, পাথরের উপরে। যেন এখনো তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করি সেই অপার্থিব সকাল।