আজ থেকে প্রায় মাস ছয়েক আগে একটা গ্রুপ ট্যুরে হঠাৎই একজন প্রস্তাব রাখে, আমরা শুধু মেয়েরা একটা ট্রিপে গেলে কেমন হয়? ছেলেরা বাচ্চাদের দেখবে, সংসার সামলাবে; শুধু আমাদের নিজেদের দুটো দিন। গ্রুপ গ্যাদারিংয়ে কোন কথা উঠলে দেখা যায় তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় অনেকগুলো হ্যা ভোট তখন তখনই চলে আসে। কিন্তু সেরকম সুবিধাজনক তারিখ মেলে এই মার্চ মাসে এসে।
ছেলেরা কেউ হেসেছে, কেউ বলেছে আমরা ছাড়া কেন আবার কেউবা বলেছে যাও যাও, আমরাও যাবো তোমরা এলে পরে। তবে কথায় বলে হুজুগের ভুত মাথা থেকে নেমে যেতে সময়ও লাগেনা বেশী সময়। কাজেই মাস ছয়েক পেরোতে পেরোতে মেয়েরা ভুলেই যাবে এই ট্রিপের কথা সে তো বলাই বাহুল্য। তারপরও মাস তিনেক পেরোতে যখন কথা ওঠে কে কে যাবে, তখন দেখা যায় একে একে না সূচক ভোটের ঘরে সংখ্যা বাড়তে থাকে। শেষমেষ এমন অবস্থা দাঁড়ায় সাতজন থেকে কমতে কমতে তিনে এসে দাঁড়ায়। আমরা তিনজন সিদ্ধান্তে অটল থাকি কেবলমাত্র তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লেগে না গেলে আর কেউ অসুস্থ না হলে আমরা যাবোই যাবো।
সকাল নয়টার মধ্যে বের হবার সিদ্ধান্ত থাকে আগে থেকেই। যেহেতু বাচ্চাকাচ্চা নেয়ার ব্যাপার নেই নয়টার মধ্যেই বেরিয়ে পড়া যায় গাড়ি নিয়ে। সিদ্ধান্ত ছিল একজনের ক্লান্ত লাগলেই আরেকজন গাড়ি চালাবে। আমরা হাহা হিহি তে এতো ই ব্যস্ত ছিলাম যে দুই ঘন্টা সময় কখন পেরিয়ে যায় টেরই পাইনি। প্রথম স্টপেজ ছিল ওয়াইকেরি। ওখানে একটু কফি ব্রেক নেয়া হবে এরকম প্ল্যান আগেই ছিল। এই ক্যাফেটাতে আমরা আগেও এসেছি। চমৎকার এক ব্যালকনিমত বসার জায়গা আছে ক্যাফেটার পেছন দিকে যেখান থেকে নদী দেখা যায়। ঝকঝকে রোদেলা দিন, নদীর বুকে আলোর ঝিলমিল আর থেকে থেকে মৃদু বাতাসে বসে থেকে মনে হলো এরকম একটা ব্রেকের আসলেই দরকার ছিল খুব।
দুপুর দেড়টা নাগাদ ঠিক করে রাখা হোটেলে পৌঁছাই। আগে থেকেই বাইরে খাবারের অর্ডার করা ছিল। হোটেলে পৌঁছে এপার্টমেন্ট দেখেই সবার মন ভালো হয়ে যায়। চারদিকে আলো ঝলমলে পানি, নীচে মাছ ধরার ছোট ছোট বোট দাঁড়িয়ে সারি বেঁধে, যেন পানির ওপরেই ভাসমান কোন জাহাজে আমাদের অবস্থান। সবারই চায়ের তেষ্টা পেয়েছিল বিধায় ব্যাগ নামিয়ে রেখে আগে চা বানানো হয়। বারান্দায় বসে গল্প করতে চায়ে চুমুক দেয়া আর যার যার বাসার মানুষজনের একটু খোঁজ নিতে নিতেই নীচে খাবার চলে আসে।
দুপুরের খাবার শেষে একটু গড়িয়ে নেয়ার পালা। রোদ একটু নেমে এলেই বের হয়ে যাই তিনজনে। একটু কেনাকাটা করতে হবে কারণ রাতে আমাদের একজনের বন্ধুর বাসায় দাওয়াত। এডিলেড শহরের সবচেয়ে বাজে ব্যাপার যেটা সেটা হলো পাঁচটা না বাজতেই লোকে পাততাড়ি গুটিয়ে যে যার ঘরে রওয়ানা দেয়। অগত্যা অল্প কিছু কেনাকাটা করে ফিরে আসা পোর্টের ধারে। আমাদের হোটেলটা পোর্টের খুব কাছাকাছি হওয়াতে গাড়ি ছাড়াই আমাদের ঘোরাঘুরি করা সহজ হয়ে যায়। পোর্টের বাঁধানো পাড় ধরে হেঁটে বেড়াই অনেকটা সময়। এক দলছুট ডলফিন সঙ্গ দিতে বুঝি কাছাকাছি এসে কিছুক্ষণ খেলা দেখিয়ে আবার হারিয়ে যায়।





Previous image
Next image
রুমে ফিরে আবারও খানিক বিরতি। রাতে জম্পেশ খানাদানার আয়োজনে ভুলেই গেছিলাম হোটেলে ফিরতে হবে। আমাদের ইচ্ছে ছিল রাতে ফিরে পানির ধারে বসে থাকবো খানিক সময়। কিন্তু ঘরে ফিরতেই বেজে যায় রাতের বারোটা। অতঃপর বারান্দায় বসে চাঁদের আলোতে আবারও জমে আড্ডা কিছুটা সময়ের জন্য।সকাল সকাল উঠতে হবে বলেই শুয়ে পড়ার তাড়া থাকলেও মনে হচ্ছিল আরো কিছুটা সময় গল্প করি। ভীষণ ক্লান্ত হয়ে শুলেও ঘুম ভেঙে যায় মাঝরাতে। বেড়াতে এলে এই একটাই শুধু সমস্যা, নিজের বিছানা ছাড়া ঘুমাতে কষ্ট হওয়া। উঠে, ঘুমিয়ে, এ কাত ও কাত হয়ে অবশেষে সাড়ে সাতটায় উঠেই পড়ি।
আজকের গন্তব্য এডিলেড শহর থেকে ঘন্টাখানিক দূরত্বের বারোসা ভ্যালি। ঘুম থেকে উঠেই মন ভালো হয়ে যায় আরেকটি আলো ঝলমলে দিন বলে। সকাল সকাল ভরপেট নাস্তা খেয়ে নয়টার মধ্যে তিনজনে বের হয়ে পড়ি গন্তব্যে।
আমরা ভাড়া করেছিলাম রেড ভিনট্যাজ ক্যাব ট্যুর। এক কোম্পানী ভিনটেজ গাড়িতে করে আমাদের পুরো বারোসা ভ্যালির উল্লেখযোগ্য জায়গা ঘুরিয়ে দেখাবে চার ঘন্টা ধরে এরকমভাবেই বুকিং দেয়া ছিল। নির্ধারিত জায়গায় গাড়ি পার্ক করার আগেই দেখতে পাই আমাদের জন্য গাড়ি রাস্তার পাশে অপেক্ষমাণ। পুরোদস্তুর বিদেশী কেতায় শোফার গাড়ির দরজা খুলে দিলে পরে একে একে ঢুকে যাই তিনজনে গাড়ির ভেতরে। মনে হয় গায়ে একটা গাউন, মাথায় হ্যাট আর হাতে সাদা দস্তানা না পরে আসাটা ভুল হয়েছে ভীষণরকম।
এই বেলা একটু বারোসা ভ্যালি সম্পর্কে বলে নেই। জার্মানী থেকে আঠারশো শতকের পরপর বেশ কিছু সংখ্যক ধনী গরীব মেলানো জার্মান পরিবার এসে আস্তানা গাড়ে এই ভ্যালিতে। যাদের পয়সা ছিল তারা এখানে নিজেদের বসবাসের জন্য প্রাসাদোপম বাড়ি নির্মাণের পাশাপাশি ওয়াইন ফ্যাক্টরী চালু করে। এখানকার মাটিতে আঙ্গুরের ফলন ভীষণরকম ভালো হবার দরুন তাদের ব্যবসার উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটতে থাকে। তাদের উৎপাদিত ওয়াইনের বেশীরভাগই রপ্তানী হয়ে যেতো ইউরোপের সবগুলো দেশে। যুগে যুগে কালে কালে ব্যবসাগুলো পারিবারিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে রেখেছে। সাউথ অস্ট্রেলিয়াতে বেড়াতে এলে লোকে এই বারোসা ভ্যালিতে অবশ্যই আসে শুধুমাত্র এখানকার নানা স্বাদের ওয়াইন চেখে দেখা এবং সাথে কিনে নেবার জন্য। ছোট বড় মিলিয়ে ওয়াইনারি আছে প্রায় দেড় শতাধিক এবং প্রায় সব ওয়াইনারির সাথেই আছে ছোট বড় ক্যাফে। প্রসঙ্গক্রমে আরো জানা যায় এখানকার অধিবাসীরা সবাই ভীষণরকম ধার্মিক এবং কমবেশী সবাই চার্চে যায় বলে বেশ অনেকগুলো চার্চও রয়েছে এখানে।

বুকিংয়ের সময়েই আমরা বলে রেখেছিলাম আমরা ওয়াইন টেস্টিং করবোনা, কাজেই একটা বা দুটির বেশী ওয়াইনারি দেখতে নেবার দরকার নেই। আমাদেরকে তাই কেবল দুটো বড় ওয়াইনারি দেখাতে নেয়া হয় এর চারপাশের সৌন্দর্য দেখাতে। পথে পথে দেখা মেলে জার্মানদের নির্মিত পুরোনো ধাঁচের পরিত্যক্ত বাড়িগুলো।
প্রথম যেই ওয়াইনারীতে যাই সেখানে যেয়ে বেশ ভালো লাগে চারদিকের সবুজে ঘেরা শান্তভাব দেখে। নাম ইয়ালুম্বা ওয়াইনারী। পুরো ওয়াইনারী জুড়ে গাছে গাছে ফুঁটে থাকা রং বেরংয়ের ফুল দেখে মনে হচ্ছিল কোন ডিজাইন করা বোটানিক্যাল গার্ডেন। সেখান থেকে বেরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় মূল শহরে চিজ ফ্যাক্টরীতে চিজ টেস্টিংয়ের জন্য। চারপদের চিজের কোনটাই আমাদের মুগ্ধ করতে পারেনি। কিছু চকোলেট, চিজ কুকিজ কিনে বেরিয়ে আসি আমরা। প্রসঙ্গত জানিয়ে রাখি দোকানে সব কিছুর দাম বেশ চড়া মনে হয়েছে।
তারপরের গন্তব্য ছিল বারোসা পায়োনিয়ার মেমোরিয়াল। ওখানে বেশ কিছু স্কাল্পচার রাখা ছিল। সাথে সেই এলাকাটাতে একটা পাহাড়ের ওপর হওয়ায় সেখান থেকে পুরো বারোসা ভ্যালি দেখা যাচ্ছিল। চারদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। সেই পাহাড় চূড়া থেকে এবার নামিয়ে আনা হয় একটা ছোট মিউজিয়ামে। সেটা আসলে একটা পুরোনো দিনের বাসা। নাম ল্যুর কটেজ মিউজিয়াম। দুই বেডরুমের সেই বাসা সাজিয়ে রাখা হয়েছে সে সময়ের আদলে। বেডরুম ছাড়াও বাসায় রয়েছে বসার জায়গা, ডাইনিং, কিচেন, সেলার, বাইরে টয়লেট, চাষবাসের জিনিসপত্র সহ একটা ছোট স্কুলঘর। স্কুলঘরে সে সময়ে ব্যবহৃত বই, স্কুলের ব্যাগ, কলম, ট্রাংক সব এমনভাবে সাজিয়ে রাখা আছে যেন একটু আগেও কেউ পড়ে গেছে এখান থেকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই বাসাটাতে ঢুকতে কোন টিকেট লাগেনা। পুরো বাসা খোলা। বাইরে একটা ডোনেশন বাক্স রাখা আছে কেউ খুশী হয়ে কিছু দিতে চাইলে দেয়ার ব্যবস্থা। সেখান থেকে ফিরে যাবার পথে নামি চকোলেট ফ্যাক্টরীতে। এদেশের দোকানের চকোলেটে মিষ্টির পরিমাণ এতো বেশী থাকে যে চকোলেট খেয়ে আরাম পাওয়া যায়না। তবে এখানকার চকোলেটে মিষ্টি কম দেখে দুই কন্যার জন্য কিনে নেই চকোলেট দিয়ে বানানো দুটো জুতা। ছোটকন্যা খুব আগ্রহভরে জানতে চেয়েছে, মাম্মি ক্যান আই ওয়্যার দ্যাট শু’স?
চকোলেট ফ্যাক্টরী থেকে বের হতে হতে ততক্ষণে রোদ বেশ মাথার ওপরে উঠে যাওয়ায় আমরা ফিরে যেতে চাইছিলাম। কিন্তু আমাদের ট্যুর গাইড নাছোড়বান্দার মতো ঝুলে রইলো। তাই না চাইতেও যেতে হলো ম্যাগি বিয়ার এর ফার্মহাউজে। ভদ্রমহিলা মাস্টারশেফের একজন সম্মানিত জাজ। বিশাল এলাকা জুড়ে তার ফার্মহাউজ। ভেতরে রয়েছে ক্যাফে এবং রেস্টুরেন্ট। চমৎকার একটা লেক রয়েছে ভেতরে। বিশাল ডেকে লেকের বাতাস গায়ে লাগিয়ে কফি খাবার ব্যবস্থা রয়েছে। আমাদের মাথায় তখন ঘুরছে কখন দুপুরের খাবার খাবো। তাই কফি খাবার চেয়ে এডিলেড ফেরার তাড়াটাই বেশী ছিলো।
ফিরতে চাই বলা সত্ত্বেও ট্যুর গাইড এবার গাড়ি ঘোরায় মূল বারোসা ভ্যালি এস্টেটের কাছাকাছি এক এলাকায় যেখান পাঁচ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে লাগানো হয়েছে সারি সারি খেজুর গাছ। দুইপাশে বিস্তীর্ণ আঙ্গুরের ক্ষেত। মাঝখানে সেই জার্মান ধনাঢ্য ব্যবসায়ীক পরিবার সেপেল্ট পরিবারের পাহাড়ের ওপর তৈরী করা প্রাসাদোপম কবরখানা। তাদের নামানুসারে এই এলাকার নাম সেপেল্টসফিল্ড। সেই পাহাড় বেয়ে উঠে আবার নেমে এতোটাই ক্লান্ত হয়ে যাই সবাই যে তারপরের চমৎকার একটা বাগানঘেরা ওয়াইনারিতে নামার কোন আগ্রহই আর হয়না কারো। সাজানো গোছানো বারোসা ভ্যালির সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে পথের দুধার আলোকিত করে ফুঁটে থাকা এক ধরনের সাদা ও গোলাপী ফুল দেখে। যার নাম নেকেড লিলি। একটা কান্ডের ওপরে কোন পাতা ছাড়া একগুচ্ছ করে ফুল ফুঁটে আছে যেন কেউ ফুলের স্টিক গুঁজে রেখেছে পথের দুধার ধরে।
আমাদের ট্যুর গাইড নামিয়ে দেয় একদম আমাদের গাড়ির সামনে। ক্ষিধেয় তখন পেট অস্থির। এদিকে আমাদের প্ল্যান আজ দেশী চাইনিজ খাবো। দোকানে ফোন দিয়ে খাবার অর্ডার করে জানাই, খাবার তৈরী করে রাখতে যেন আসার সাথে সাথেই আমাদের সার্ভ করতে পারে। মজা করে দুপুরের খাবার খেয়ে হোটেলে ফিরে আসি। সবাই এতো ক্লান্ত ছিলাম ভেবেছিলাম আর আপাতত বের হওয়া হবেনা। কিন্তু দেখা যায় ঘন্টা পেরোতেই সবাই আবার চাঙ্গা।
আবার পথে বেরিয়ে পড়া। এবারের গন্তব্য এক রেস্টুরেন্ট। উপলক্ষ্য নারী দিবস উপলক্ষ্যে একটু জমায়েত হওয়া। ঘর সংসার ফেলে তিনজনের বেরিয়ে পড়ার গল্প শুনে বাকীরা ভীষণ ইনস্পায়ার্ড হয়ে জানায় তারাও খুব শিগগির এমন একটা কিছু করবে। রাতের খাবার খেয়ে অনেকটা সময় আড্ডাবাজি শেষে হোটেলে ফেরা আবার। রাতের পোর্ট ঘোরা হয়নি আগের দিন বলে, আবার বেরিয়ে আসি আধঘন্টা না পেরোতেই। চমৎকার একটা লাইটহাউজ রয়েছে আমাদের হোটেলের একদম কাছাকাছি। সামনে গিয়ে দেখা গেলো রানী এলিজাবেথ এসেছিলেন এই লাইট হাউজ উদ্বোধন করতে। আকাশে আধেকটা চাঁদ আর রাতের ঝিরিঝিরি হাওয়ায় খানিকটা সময় কাটানো শেষে আরো দুজন পরিচিত মুখ দেখা করতে আসে আমাদের সাথে। সবাই মিলে রুমে ফিরে এসে তাই বসে রাতের চা আর আড্ডা।
তিনদিনের ছুটির দুটো দিন শেষ। কাল বাড়ি ফেরার পালা। এসেছিলাম ব্যস্ত জীবন থেকে দুটো দিনের বিরতিতে। আরো যেন ভীষণরকম ব্যস্ততায় পার করলাম। মনের ভেতর কিছু আনন্দময় স্মৃতি সঞ্চয় করে নিয়ে যাচ্ছি, এই যেন বিরতি নামক ব্যস্ত সময়ে কাটানো ছুটির সবচেয়ে বড় পাওয়া। আগের দিন রাতে কথা প্রসঙ্গে বলছিলাম বারোসা ভ্যালির মূল ওয়াইনারিটা দেখা হলোনা। এতো টায়ার্ড হয়ে গেলাম আমরা যে সবচেয়ে সুন্দর ওয়াইনারীটাতেই নামা হলোনা। একজন সাথে সাথে বলে উঠলো, যাওয়ার পথেই তো পড়বে কাল, না হয় একবার ঢুঁ মেরেই যাবো। ভাবলাম এমনি হয়তো বলছে। কিন্তু দেখা গেলো সকালবেলার ট্যুর প্ল্যানে আবারও জায়গা করে নিলো বারোসা ভ্যালি।
আজ হোটেল ছেড়ে দেবো সকাল দশটার মধ্যে। গ্রামে থাকি বলে বাজার করে নিতে হবে। সাথে রোজা আসছে বলে কিছু ফ্রোজেন আইটেম অর্ডার করে রেখেছিলাম এক জায়গায়। সেগুলো গাড়িতে তুলতে হবে। আগের দিন ফুচকা খাওয়া হয়নি। তাই আজ ফুচকা খেতে হবে। দেখা গেলো রুটিনের সব শেষ করে এডিলেড থেকে বের হতে হতেই প্রায় দুপুর হয়ে যাবে। ঘুম থেকে উঠে নাস্তা খেয়ে ঝটপট তৈরী হয়ে নেমে এলাম নীচে। আমাদের হোটেলের পাশেই ছিল ফিশারম্যানস হোয়ার্ফ। বলা চলে সানডে মার্কেট। যার যার বাড়ির পুরোনো জিনিসের বাজার। সেখানেও কতক্ষণ ঘোরাঘুরি শেষে রওয়ানা হই বাংলা দোকানে। জালাল ভাইয়ের দোকানে বাজার সেরে এলাম জামাল ভাইয়ের দোকানে ফুচকা খেতে। এখানে একটা কথা বলে রাখি আপনারা যারা এডিলেড থাকেন বা যারা বেড়াতে যাবেন এবং বাংলাদেশী চাইনিজ এবং দেশী খাবার খেতে উৎসাহী তারা অবশ্যই কারি এক্সপ্রেসে ঢুঁ মারতে ভুলবেন না। একশো ভাগ দেশী স্বাদ না পেলেও কাছাকাছি পাবেন এতটুকু জোর দিয়ে বলতে পারি। ফুচকা আর নুডল্স খেয়ে আগের দিন অর্ডার করে রাখা বাসার জন্য খাবার নিয়ে গাড়িতে উঠে বসি। এবার বের হবার পালা এডিলেড শহর থেকে।গন্তব্য বারোসা ভ্যালি ওয়াইনারি।
ঘন্টাখানেক দূরত্বের এই ওয়াইনারীতে ঢুকেই মন ভালো যায়। কি ছিমছাম আলো ছায়া ঘেরা এক জায়গা। থেকে থেকে বয়ে যাওয়া মিষ্টি হিমেল হাওয়া। বাতাসের শব্দ ছাড়া ভীষণ রকম নিস্তব্ধ। রোদের কারণে গাছের নীচে ছায়ায় পেতে রাখা টেবিলে বসতেই মনে হলো এক গ্লাস ঠান্ডা লেবুর শরবত যদি পাওয়া যেতো। নিদেনপক্ষে একটা হিমশীতল লেমোনেড। খোঁজ নিতে উঠে গেলো একজন। হতাশ হয়ে ফেরত এলো। তখনই মনে হলো ম্যাগী বিয়ারের দোকানে নাকি ভালো কফি ও ননএলকোহলিক ড্রিংক্স পাওয়া যায়। তবে সেখানেই কেন যাইনা। লেকের ধারে বসে একটু শীতল গ্লাসে চুমুক, ভ্রমনের শেষাংশটাকে আরো একটু স্মরনীয় করে রাখবে তাহলে। ওয়াইনারীতে কয়েকটা ছবি তুলে তাই উঠে পড়া। পথিমধ্যে রাস্তা থেকে তুলে নিয়েছিলাম কিছু বুনো লিলি। এতো চমৎকার তাদের রং যে সামনাসামনি না দেখলে বিশ্বাস হবেনা এতো দারুন কিছু পথে ঘাটে ফুঁটে থাকতে পারে।
আগেই বলেছি বেশ গরম ছিল সেদিন। তাই বাইরে বসে লেকের দিকে তাকিয়ে বরফশীতল গ্লাসে চুমুক দেবো এমন ইচ্ছে থাকলেও কাঁচঘেরা ভেতর অংশে জায়গা পেয়ে সেখানেই বসি। এতো চমৎকার করে কাঁচের দেয়ালের ধার ধরে টেবিলগুলো বসানো হয়েছে যেন লেকের জলে তাকিয়ে থেকে শান্তি পাওয়া যায়। আমাদের দেখেই কিনা লেকের ভেতরের তিন কচ্ছপও আড্ডা দিতে বসে যায়।
হঠাৎ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি বিকেলের পথে ঘড়ির কাঁটা চলতে শুরু করেছে। মাঝে রেনমার্ক থামার কথা থাকলেও আর কোথাও স্টপওভার দেয়া হয়না। যার যার ঘরের মানুষরা যে ততক্ষণে অস্থির হয়ে উঠেছে তাদের দেখার জন্য।
একটা চমৎকার ছুটি কাটিয়ে এলাম তিনজন মেয়ে মিলে। তিন বয়সের তিনজন মানুষ যাদের একে অপরের সাথে পরিচয়ের বয়স বছরও পেরোয়নি এখনও, যাদের প্রত্যেকেরই নিজের মনে ভয় ছিল কিভাবে সময় কাটাবে পুরো আড়াই দিন, কি করবে একসাথে এতোগুলো দিন; ট্রিপ শুরুর আগে তারা কেউই ভাবতেও পারেনি তাদের জীবন স্মৃতির অন্যতম প্রায় তিনদিন তারা একসাথে এতোটা আনন্দ নিয়ে পার করবে।
Post Views: 123