ফজর পড়ে ঘুমাতে যাবার আগে মনে হলো বাচ্চাদের স্কুল হলিডেতে কোথাও নিয়ে যাওয়া হয়নি অনেকদিন। এদিকে ফেসবুক মেমোরিতে এলো গত বছর এ সময় আমরা গ্রামপিয়ানস (Grampians) ন্যাশনাল পার্ক থেকে ফেরার পথে ক্যানোলা ফিল্ডে ঘুরতে গিয়েছিলাম। ফেসবুকে অনেকের ওয়ালে ক্যানোলা ফিল্ডের ছবি দেখে মনে হলো যাই ঘুরে আসি আজকে। ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে উঠে বড়কন্যাকে বললাম আমার প্ল্যান। সে বললো চলো যাই। আমাদের লক্ষ্য ছিল যেতে যেতে যেখানে ক্যানোলা ফিল্ড প্রথম পড়বে তার নিকটবর্তী গ্রামই হবে আমাদের গন্তব্য।
সকাল সাড়ে নয়টার মধ্যে গাড়িতে তেল আর খাবার মজুদ করে উঠে পড়ি দুই কন্যাকে নিয়ে। আমি একা গাড়ি চালিয়ে অনেকটা পথ গেছি এর আগে একবারই। এডিলেড (Adelaide)পর্যন্ত সেবার গিয়েছিলাম, আমার মা সাথে ছিল তখন। আমার উদ্দেশ্য ছিল আমি একটানা তিনঘন্টা গাড়ি চালাবো। এর মধ্যে যদি ক্যানোলা ফিল্ড না পড়ে তাহলে ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন। কারণ তিনটার মধ্যে আবার ঘরে ফিরতে হবে ছোটকন্যার বান্ধবী আসবে বাসায় তাই।


মিলডুরা থেকে যত সামনে এগিয়েছি তত আলো ঝলমলে দিন আসছিল বলে ড্রাইভ করতে বোর লাগেনি একদমই। প্রায় একশো আশি কিমি যাবার পর অবশেষে দেখা মেলে কাঙ্খিত ক্যানোলা ক্ষেতের। কি যে নরম একটা হলুদ রং দিগন্ত জুড়ে ছড়ানো তার বুঝি কোন ভাষায় প্রকাশ হয়না। যাবার পথেই দেখে নিলাম কোন পথে গেলে ক্ষেতের ভেতরে ঢুকতে হবেনা কিন্তু ছবি তোলার মতো পজিশন নেয়া যাবে। গুগল ম্যাপ জানালো পরের গ্রাম হোপটন (Hopetoun)। গ্রামটার কথা মনে আছে কারণ এখানে চমৎকার কিছু সাইলো ট্রেইল চোখে পড়েছিল গত বছর।
ছোট একটা গোছানো শহর। খাবারের দোকানে ঢোকার আগেই রাউন্ড এবাউটে দেখলাম একটা ডিরেকশন, বামে লেইক লাসেলস (Lake Lascelles)। এ শহরে আসার আগেই আরেকটা ছোট শহর পড়েছিল এই নামে। খাবারের দোকানীর জিজ্ঞেস করতেই বললো দুইশো মিটার ভেতর দিকে গেলেই লেইক। খাবার কিনে গাড়ি ঘোরাতেই পৌঁছে গেলাম লেইকের পাড়ে। কি চমৎকার শান্ত একটা লেইক। রোদের আলোয় ঝিকমিক করছে যেন আমাদের অপেক্ষায়। যে ব্যাপারটা খুব ভালো লেগেছে লেইকের পাড়েই প্রাইমারী স্কুল। অনেকটা সেই ছোটবেলায় গ্রামে আমাদের যেমন বড় দীঘির পাড়ে স্কুল থাকতো সেরকম। লেইকটায় পানির কাছাকাছি যাবার জন্য একটা ছোট ব্রিজ মতো করা হয়েছে। চাইলেই সেখানে বসে পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকা যাবে ঘন্টার পর ঘন্টা।

ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছিলো এখন রওয়ানা না দিলে তিনটায় দেয়া সময়ে পৌঁছানো যাবেনা। বাচ্চারা পার্কে বসেই লাঞ্চ করে নিলে পরে রওয়ানা দেই বাসার দিকে। ফেরার পথে আর মনে হয়না আর কতক্ষন লাগবে কারণ এবারের গন্তব্য যে অজানা নয়। দশ কিমি পরে ক্যানোলা ফিল্ডের পাশে গাড়ি পার্ক করে কিছুক্ষণ নির্নিমেষ চেয়ে থেকে মন ভরিয়ে নেই অবারিত হলুদ ক্যানোলা ফুলের সৌন্দর্য। পথে আরেকটা গ্রামে থামি কিছুক্ষণ। হেঁটে আসি ওখানকার সাইলো ট্রেইল। একটা স্যুভেনিরের দোকান দেখে একটু ঢুঁ মেরে আসি ওখানেও। কোথাও আর গাড়ি না থামানোতে আড়াইটার মধ্যেই পৌঁছে যাই মিলডুরা। ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ছোটকন্যা তো বলেই ফেলে, বেস্ট ডে এভার ইন মাই লাইফ মাম্মি।