অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ডের ইস্ট গিপসল্যান্ড (East Gippsland) হলো এমন একটা জায়গা যেখানে অস্ট্রেলিয়ার আলপাইন (Alpine) পর্বতমালা থেকে বাস (Bass) প্রণালীর উপকূল পর্যন্ত বিশাল একটি অংশজুড়ে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ধারাবাহিকতা লক্ষণীয়। এই বিশাল অংশটি হল ভিক্টোরিয়ার তথা অস্ট্রেলিয়ার বন প্রান্তরের সবচেয়ে বিস্তৃত এলাকা এবং বৈচিত্র্যের দিক থেকে এই নাতিশীতোষ্ণ (temperate) রেইনফরেস্টটি পৃথিবীর সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ইকোসিস্টেমগুলোর মধ্যে একটি। এই বন প্রান্তরের ছোট একটি অংশ ইরিনুন্দ্রা ন্যাশনাল পার্ক যার আয়তন ২৬৮ বর্গকিলোমিটার। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে নানা কসরত করে ইরিনুন্দ্রা ন্যাশনাল পার্কে পৌঁছাতে পেরেছিলাম। আজ সে গল্পই শোনাচ্ছি আপনাদের।

ইরিনুন্দ্রা ন্যাশনাল পার্কের সবচে কাছের বড় শহরের নাম অর্বস্ট (Orbost)। মেলবোর্ন শহর থেকে প্রায় ৪৫০কিলোমিটার, রাজধানী ক্যানবেরা থেকে প্রায় ২৭৫ কিলোমিটার এবং সিডনি থেকে প্রায় ৫৫০কিলোমিটার অর্থাৎ মূল শহরগুলো থেকে প্রায় এক দিনের পথ।

২০১৭ সালে এনভায়রনমেন্টাল জাস্টিস অস্ট্রেলিয়া (Environmental Justice Australia), ফৌনা এন্ড ফ্লোরা রিসার্চ কালেকটিভ (Fauna and Flora Research Collective) নামের একটি অর্গানাইজেশনের পক্ষ নিয়ে ভিক্টোরিয়ান ডিপার্টমেন্ট অফ এনভায়রনমেন্ট, ল্যান্ড, ওয়াটার অ্যান্ড প্ল্যানিং এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করে দেয়। এই মামলার মাধ্যমে যে সকল বন থেকে কাঠ আহরণের বা লগিং জন্য পূর্বে নির্দিষ্ট করা হয়েছিল সে এলাকাগুলো থেকে হাই কনসারভেশন এলাকা যেমন পুরোনো গাছ (old -growth forest) এবং বিপন্ন প্রাণিকুল বসবাস এলাকাগুলো সংরক্ষণে সরকারকে আইনগতভাবে বাধ্য করা হয়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ভিক্টোরিয়ান সরকার ঘোষণা করে যে ২০৩০ সালের পরে নেটিভ ফরেস্টগুলো থেকে আর কাঠ আহরণ হবে না। ইস্ট গিপসল্যান্ডের সি টু সামিট ট্র্যাক (sea to summit) একটি বিশাল ট্রেইল (প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ) যার শুরু উপকূলীয় শহর বেম নদী (Bemm River) থেকে এবং শেষ হয়েছে ইস্ট গিপসল্যান্ডের সর্বোচ্চ পর্বত মাউন্ট এলারির চূড়ায়। পর্যটকেরা সেই ট্র্যাক থেকে কখনো কখনো কাঠ আহরণ প্রক্রিয়া দেখতে পেতেন, যাকে অনেকেই চরম নিষ্ঠুরতা বলে আখ্যায়িত করতেন। ২০১৯ সালের মার্চ মাসে  ভিক্টোরিয়ার জ্বালানি, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী কাঠ আহরণ বন্ধ হবার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে কুয়ার্ক (Kuark) ফরেস্ট (যা কিনা সি টু সামিটের বড়ো একটি অংশ) বরাবর কাঠ আহরণ বন্ধ করার নির্দেশ দেন। উল্লেখ যে এই ট্রাকের বর্ধিত অংশ ইরিনুন্দ্রা ন্যাশনাল পার্ক পূর্ব থেকেই (১৯৮৮) সুরক্ষিত।

দীর্ঘ দুই বছরের এই আইনি মামলার ঘটনাটি আমাকে বেশ নাড়া দেয়। উল্লেখ্য যে, এই মামলায় আমার ভূমিকা ছিল ভিক্টোরিয়ান গভর্মেন্টের ফরেস্ট ডাটা এক্সপার্ট হিসেবে। সি টু সামিট, কুয়ার্ক ফরেস্ট এবং ইরিনুন্দ্রা ন্যাশনাল পার্কের নানা তথ্য, সেমিনার, গবেষণা, ফটোগ্রাফি এবং ভিডিও আমাকে এই এলাকার বিষয়ে ব্যাপকভাবে আগ্রহী করে তোলে। এছাড়া, ইস্ট গিপসল্যান্ডের এমেরাল্ড লিঙ্কের একটি ভিডিও আমাকে খুব অনুপ্রাণিত করে। ইস্ট গিপসল্যান্ডের প্রিন্সেস হাইওয়ে ধরে বেশ কয়েবার ক্যানবেরা, বেটম্যানস বে (Batemans Bay) এবং সংলগ্ন এলাকাগুলোতে ট্রাভেল করলেও ইস্ট গিপসল্যান্ডের এই অংশে তেমন উল্লেখযোগ্য সময় কাটানো হয়নি।  ইচ্ছে ছিল এই এলাকার কিছু অংশ কাছে থেকে দেখার।

গত ডিসেম্বরে (২০২০) ভিক্টোরিয়াতে বেশ কয়েক সপ্তাহ ট্রাভেল করার জন্য কোনো কোভিড রেস্ট্রিকশন ছিল না। গত ডিসেম্বরে (২০২০) ভিক্টোরিয়াতে বেশ কয়েক সপ্তাহ ট্রাভেল করার জন্য কোনো কোভিড রেস্ট্রিকশন ছিল না। সেই সুযোগে ক্যাম্পিংয়ের যাবতীয় সরঞ্জাম নিয়ে কয়েকদিনের জন্য পরিবারসহ বার হয়ে গেলাম। তাড়াহুড়ো করে ট্যুর পরিকল্পনা করাতে যা হবার তাই হলো অর্থাৎ প্রয়োজনীয় দরকারি অনেক কিছু যেমন ডিটেইল ম্যাপ কিংবা হ্যান্ডহেল্ড জিপিএস আনার কথা ভাবিনি। ইরিনুন্দ্রা ন্যাশনাল পার্কে যাবার চেষ্টা করে রাস্তায় পথ হারিয়ে আর পার্ক অবধি পৌঁছাতে পারলাম না। উল্লেখ যে, ন্যাশনাল পার্কের কাছাকাছি ছোট শহরগুলোও প্রায় ৫০কিলোমিটার দূরে। এই ৫০কিলোমিটার রাস্তা বেশ পাহাড়ি এবং ভয়ঙ্কর আঁকাবাঁকা। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা, এখানে কোনো মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক কাভারেজ নেই।

বরাবরের মতো এবারও খুব ভোরে রওনা হয়ে গেলাম। মেলবোর্ন থেকে পূর্ব দিকে যেতে আমি সাধারণত সূর্যোদয়ের আগেই যাত্রা শুরু করি। সূর্যের তির্যক আলো চোখে অনেকে সময় ঠিকমতো তাকাতে না পাড়া যায় না। এমন অবস্থায় আসার আগেই মেট্রোপলিটন মেলবোর্ন থেকে অনেক দূরে চলে যাই। অনেক ভোরে রাস্তায় গাড়ি খুব কম থাকে। এগুলো আমাকে রাস্তায় নিরাপদে গাড়ি চালাতে সাহায্য করে। সকালের পরিবেশ হয় নির্মল এবং পরিছন্ন, ভোরের সূর্য দিগন্তরেখায় মেঘ আর ধূলিকণায় বিচ্ছুরিত হয়ে যে আবহ সৃষ্টি করে তা গ্রামীণ পরিবেশে দেখতেই আমার বেশি ভালো লাগে।

মেলবোর্ন থেকে ইস্ট গিপসল্যান্ডের পুরোনো শহর অর্বস্ট প্রায় ৩৭৫ কিলোমিটারের লম্বা পথ। একটানা গেলে প্রায় সাড়ে চারঘন্টা সময় লাগার কথা। অর্বস্ট শহরে আমাদের থামার পরিকল্পনা ছিল না, তারপরেও কিছুক্ষনের জন্য বিরতি নিলাম। অর্বস্ট শহরের পাশ ঘেসে প্রবাহিত প্রশস্ত স্নোয়ি (Snowy) নদীর পাশে ফরেস্ট পার্কে (Forest Park) থামলাম। এটি মূলত অর্বস্ট ভিজিটর ইনফরমেশন সেন্টারের বর্ধিত অংশ।

ক্ষণস্থায়ী বিরতি শেষে অর্বস্ট থেকে উত্তর দিকে যাত্রা শুরু করলাম। অর্বস্ট থেকে দুটো রাস্তা চলে গেছে পূর্বে মেলবোর্ন, পশ্চিমে মালাকোটা-ইডেন হয়ে সিডনি, দক্ষিণে প্রিয় শহর মারলো আর উত্তরে গন্তব্য পথ। প্রায় ৫০ কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে এসে নূররান (Nurran) নামে একটা ছোট শহর পৌঁছরার কথা ছিল। তবে, এখানে শহর থাকার কথা থাকলেও কোনো কিছুই দেখতে পেলাম না এমনকি কোনো সাইনবোর্ড পর্যন্ত দেখলাম না। আঁকাবাঁকা রাস্তায় ৫০ কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে বেশ ক্লান্ত হয়েই এখানে থামতে হলো।

রাস্তার পাশেই গাড়ি পার্ক করে পুড়ে যাওয়া বনের দিকে খানিকটা সামনে এগিয়ে যেতেই গাছের ফাঁকা দিয়ে বড় মাটির ঢিবির মতো কি যেন লেখা যাচ্ছিলো। আরেকটু এগিয়ে যেতেই বিষয়টি স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। এটি ছিল কয়েক ফুট উঁচু উইয়ের ঢিবি। কোথাও পড়েছিলাম উইরা অন্ধ। অন্ধ হলেও তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে, নানান কাঠামোর ঘরবাড়ি (ঢিবি) বানায়। আশে পাশের বিভিন্ন প্রকারের খনিজ উপাদান সংগ্রহ করে কাঠামোতে ব্যবহার করে। ফলে, কাঠামো শক্ত হয়, নানান রং হয় এবং নানা আবহাওয়ায় টিকে থাকে। আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম।  

যেহেতু এখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক কাভারেজ নেই কাজেই মোবাইল জিপিএস নেটওয়ার্ক না পেয়ে আর রুট প্ল্যান করলো না। আমরা কাগজের ম্যাপ ধরে সামনে আগালাম। নূররান থেকেই রাস্তা অনেকে সরু হয়ে গেছে। এই সরু পথে প্রায় ২০ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি জমিয়ে গুঙ্গেরাহ (Goongerah) নামক এক জায়গায় আসলাম। অর্বস্ট থেকে গুঙ্গেরাহ আসার পথে মাত্র ১/২টি গাড়ি বিপরীত দিক থেকে আমাদের পাশ কেটে চলে যেতে দেখলাম। পথের পাশে বেশির ভাগই বুশফায়ারে পুড়ে যাওয়া বন।  ২/৪টি ফার্ম হাউস, একটা সিএফের (CFA) ফায়ার সেশন দেখলাম কিন্তু আর কোথাও কোনো জন মানবের চিহ্ন নেই। গাড়ি থামিয়ে এদিক ওদিক কিছুক্ষন হাটাহাটি করলাম। ২/৩ মিনিটের হাঁটার পথে দুটো খাড়ি (creek) দেখলাম একটার নাম ডেড বুল ক্রিক আরেকটা ডেড ক্যাল্ফ ক্রিক। দুটোর একটাতেও কোনো পানির চিহ্ন নেই।  কারা যেন রাস্তার পাশে নষ্ট হয়ে যাওয়া অদ্ভুত সুন্দর একটা রঙিন ভিনটেজ ফ্রিজ ডাম্প করে গেছে। আমরা সেই  ফ্রিজের হ্যান্ডেল টেনেটুনে দেখলাম, সাথে ছবিও তুললাম।

২০১৯-২০ সালের ভয়াবহ বুশফায়ারে (দাবানল) অস্ট্রেলিয়ার প্রায় ৪.৩মিলিয়ন হেক্টর এলাকা পুড়ে গিয়েছিলো এর মধ্যে ১.৪ মিলিয়ন হেক্টর ছিল ভিক্টোরিয়াতে। নূররান, গুঙ্গেরাহ এলাকার কিছু অংশ বাদে বাকি অংশটুকু পুড়ে গিয়েছিলো। দাবানলে বনের ছোট গাছ, লতানো জঙ্গল, গাছের পাতা এগুলো পুড়ে যায়, বনের মাঝে ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। তবে মজার ব্যাপার হলো, দাবানলে পুড়ে গেলেও বেশির ভাগ গাছ মরে যায় না। গত একবছরের মৃদু আবহাওয়ায় বনের পোড়া গাছের নিচের ফাঁকা হয়ে জায়গাগুলোতে ঘন ঘাসের আর লতানো গাছের জঙ্গল হয়ে উঠেছে। গাঢ় সবুজ পাতার আড়াল থেকে পোড়া গাছের কালো কালো গুড়ি উঁকি দিচ্ছে। গাছগুলো প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে রক্ষা করতে ডালগুলো থেকে এপিকর্মিক (Epicormic growth) শ্যুট ছেড়ে কেমন অদ্ভুত লোমশ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সাথে থাকা ছেলে নোমানের দাবানল এবং নানা পরিবেশ বিষয়ক প্রশ্নের ব্যাখ্যা করতে করতে ততক্ষনে প্রায় বেলা ২টা বেজে গেছে। আমাদের কাগজের ম্যাপ অনুসারে গুঙ্গেরাহ থেকে ন্যাশনাল পার্কের দূরত্ব তখনও কমপক্ষে ২০ কিলোমিটার। আমরা যতই সামনে এগোচ্ছি রাস্তা ততো সরু আর আঁকাবাঁকা হচ্ছে এবং এক পর্যায়ে পাকা রাস্তাও শেষ হয়ে গেলো। আমাদের গাড়ির গতিও কমিয়ে ৪০-৫০ কিলোমিটার/ঘন্টার মধ্যে নামিয়ে আনতে হলো। কোথাও কোথাও ১০ কিলোমিটার/ঘন্টায় চালাতে হচ্ছিল।

আমরা যে রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছিলাম তার নাম বোনাং (Bonang) রোড। এই এলাকার এটাই একমাত্র পাকা রাস্তা যা অদূরে গিয়ে বেন্ডক (Bendoc) শহরের পাশ দিয়ে গিয়ে আরো সামনে নিউ সাউথ ওয়েলসের শহর বোম্বালায় (Bombala) চলে গেছে। নিরিবিলি, আঁকাবাঁকা, অদ্ভুত সুন্দর এই পাহাড়ি রাস্তা। এই রাস্তায় ১০ কিলোমিটার পথ আসতেই অনেকে সময় লেগে গেলো।

এই ট্রিপে আমরা একাই একটা গাড়ি নিয়ে এসেছি, মানে আমাদের সাথে আর অন্য কেও আসেনি। এখানে নেটওয়ার্ক নেই, রাস্তার কন্ডিশন ভালো না এবং অজানা পথ কাজেই আমাদের মাঝে খানিকটা দুঃচিন্তা চলে এলো। যদিও আমাদের সাথে ক্যাম্পিং করার যাবতীয় উপকরণ এবং বেশ কয়েকদিনের খাবার ইত্যাদি ছিল তথাপি ভাবছিলাম যদি কোনো কারণে গাড়ি খারাপ হয়ে যায় তবে একদম আটকে যাবো। তারপরেও সাহস করে পার্কের দিকেই যাচ্ছিলাম।

বোনাং রোড ধরে গুঙ্গেরাহ আসার আগেই একটি রাস্তা পার্কে যাবার কথা যার নাম “সার্ডিন ক্রিক ট্র্যাক” (Sardin Creek Track)। কিন্তু সার্ডিন ক্রিক ট্র্যাক ছিল গ্রাভেল রোড  কিংবা মাটির রাস্তা এবং খুবই সরু। সার্ডিন ক্রিক ট্র্যাক আমরা খুঁজে পাইনি। হয়তো কোনো ফার্মে যাবার রাস্তা মনে করে আমরা ঐ রাস্তাকে গুরুত্বও দেইনি, ফলে আমরা আস্তে আস্তে পার্ক থেকে দূরে চলে যাচ্ছিলাম। পেপার ম্যাপে নিজেদের অবস্থান সনাক্ত করতে পারছিলাম না। ম্যাপ অনুসারে কিছুদূর গেলে পার্কে যাবার আরো দুইটি রাস্তা থাকার কথা। কিন্তু প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথ গাড়ি চালিয়েও  কোথাও কোনো রাস্তা খুঁজে পেলাম না। হতাশ হয়ে এবং বউ বাচ্চার পিড়াপিড়িতে গাড়ি ঘুরিয়ে একই পথে অর্বস্ট শহরের দিকে রওনা করলাম।

অর্বস্ট থেকে মালাকোটা (Mallacoota) ১৫০ কিলোমিটার, প্রিন্সেস হাইওয়ে ধরে পূর্ব দিকে। বলা যায় এটি ভিক্টোরিয়া রাজ্যের দক্ষিণ পূর্বের শেষ শহর।  মালাকোটার অবস্থান ৩৭ ডিগ্রী দক্ষিণ হওয়ায় এখানে ডিসেম্বর মাসের  দিনগুলো অনেক লম্বা হয়, অর্থাৎ এ সময়ে সূর্যাস্ত হয়ে থাকে প্রায় ৯টার সময়।  এখান থেকে খুব সহজেই বিকেলের মধ্যে মালাকোটা পৌঁছানো যাবে ভেবে আমরা মালাকোটার দিকে যাত্রা করলাম। এখানেই আমরা রাতে ক্যাম্পিং করবো এবং পরদিন ক্রোয়াজিংওলোং (Croajingolong) ন্যাশনাল পার্ক হয়ে বেম রিভার (Bemm) যাবো বলে ঠিক করলাম।

২০২০ সালের ভয়াবহ দাবানলে পুড়তে পুড়তে শেষ পর্যন্ত রক্ষে পাওয়া ইস্ট-গিপসল্যান্ডের ছোট একটি শহর মালাকোটা। প্রায় হাজার খানেক লোকের বাস এই শহরে । প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা মালাকোটা শহর । এক পাশে সমুদ্র, এক পাশে খুব অগভীর খাঁড়ি, ওয়ালাগারাহ (Wallagaraugh) নদীর মোহনা। আপনার হয়তো অনেকেই টিভি নিউজে দেখে থাকবেন ২০২০ সালের ভয়াবহ দাবানলে হাত থেকে জীবন বাঁচতে এখানে আশ্রয় নিয়েছিল হাজারো হাজারো মানুষ  পর্বত সমান আগুন ধেয়ে এসেছিল, এমনকি এক পর্যায়ে জীবন বাঁচাতে অনেকেই পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এই ওয়ালাগারাহ নদীতে। সারাবেলা পাখির কলরবে আর সাগরের ঢেউয়ের গর্জনে মুখর হয়ে থাকে পুরো মালাকোটার প্রাকৃতিক পরিবেশ। বৈচিত্র্যময় পরিবেশ উপভোগ  করতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন পর্যটকরা এবং অবস্থান নেন বিচের তীর ঘেসে থাকা ক্যাম্প গ্রাউন্ড কিংবা ক্যারাভান পার্কে।

মালাকোটার ফ্লোরা (গাছপালা) এবং ফনা (প্রাণিকুল) অস্ট্রেলিয়ার অন্নান্য এলাকার তুলনায় অন্যতম এবং ব্যাতিক্রমী কারণ এই জায়গাতেই দক্ষিণের  শীতল (কূল-টেম্পারেট) বনভুমি আর পূর্বদিকের উষ্ণ (ওয়ার্ম-টেম্পারেট) বনভুমির মিলন হয়েছে। এই মিলন-সন্ধীতে গড়ে উঠেছে ব্যাতিক্রমী বাস্তুতন্ত্র। এখানে যে সকল গাছপালা, স্তন্যপায়ী, উভচর, মেরুদন্ডী (ভার্টিব্রাটা), সরীসৃপ, মাছ, কীট-পতঙ্গ  এবং পাখিসহ অন্যান্য যে সকল প্রাণিকুল দেখতে পাওয়া যায় সেগুলো বেশ বিরল প্রজাতির।

বিকালে মালাকোটায় পৌঁছে আমরা ক্যাম্পগ্রউন্ডে চলে গেলাম। কপাল ভালো থাকায় যেখানে ক্যাম্পিংয়ের জায়গা পেলাম তার ১৫-২০ মিটার দূরেই ওয়ালাগারাহ নদীর মোহনা যেন একটি ঢিল ছুড়লেই পানিতে গিয়ে পরবে। মোহনার দিকে মুখ করে ক্যাম্প অর্থাৎ তাবু খাটানো হলো। গাড়ি থেকে ফোল্ডিং টেবিল, চেয়ার এবং ক্যাম্পিংয়ের দরকারি জিনিসগুলো নামিয়ে তাঁবুর মাঝে কিছু জিনিস গুছিয়ে তাঁবুর বাইরে চেয়ার পেতে বসে গেলাম। ততক্ষনে বেলা আরো গড়িয়েছে। অস্ট্রেলিয়া সহ পশ্চিমা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ডিনার টাইম বিকেল ৬-৭টার। ক্যাম্পিংয়ের জায়গাতে ইলেক্ট্রিসিটির সাপ্লাই ছিল, লম্বা তার দিয়ে লাইন টেনে তাঁবুর ভিতরে লাইট জ্বালাবার ব্যাবস্থা করা হলো এবং আরেকটা তার মাল্টিপ্লাগে জুড়ে রান্নার আয়োজন করা হলো। প্রথম রাতের খাবার বাসা থেকেই রান্না করে আনা হয়েছে। চিলার বাক্স থেকে খাবার বার করে গরম করা হলো, কাটাকুটি করে ফ্রেশ সালাদ তৈরী করা হলো। আমরা ডিনারের বসে গেলাম। খাওয়া শেষে সবকিছু গুছিয়ে রেখে আমরা গাড়ি নিয়ে কাছাকাছি একটা বিচে আসলাম। কাঁচা রাস্তাটি একটা ছোট এয়ারপোর্ট ঘেসে চলে গিয়েছে। এই এয়ারপোর্ট থেকেই ছোট প্লেনে চড়ে গাবো দ্বীপে (Gabo Island) যাবার ব্যবস্থা। সূর্য অস্ত যাবার ঘন্টাখানেক বাকি, যদিও সূর্য পাহাড় আর বনের আড়ালে চলে গিয়েছে। খুবই ছোট এই বিচ, লম্বায় ৭০ মিটাররের কম হবে। আমরা ছাড়া আর কেউ নেই এখানে। যদিও আসার পথটা দুরহ, কাঁচা রাস্তা এসে তারপর পাহাড় বয়ে নিচে নামতে পারলেই এই সিক্রেট বিচে (Secret Beach) পৌঁছাতে পারবেন এবং এর নামকরণের সার্থকতা বুঝতে পারবেন। আমি আর আরজু এপাশ ওপাশ ঘুরে ঘুরে দেখলাম আর কিছু ছবি তুললাম। নোমান বরাবরের মতো বিচের বালিতে গাছের ডাল দিয়ে আঁকিবুকি করতে থাকলো। সূর্য ডুবে গেলে আমরা ক্যাম্পে ফিরে এলাম।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে গাড়িতে সারাদিনের রসদ নিয়ে রওয়ানা হয়ে গেলাম। আজকের দিনের পরিকল্পনা সি টু সামিট ট্র্যাকের অংশবিশেষ ঘুরে দেখা। ক্রোয়াজিংওলোং ন্যাশনাল পার্কের ভেতরের কাঁচা রাস্তা দিয়ে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বেম রিভার পৌঁছানো যায়। আমরা মালাকোটা থেকে রওনা হয় ক্যান রিভার (Cann River) হয়ে ক্রোয়াজিংওলোং ন্যাশনাল পার্কের ভিতরে ঢুকে গেলাম। অদ্ভুত সুন্দর এই অংশটি। বনের ভেতরে ঢুকার কিছুক্ষনের মধ্যেই একটা বড়ো গোআনা (Goanna) বা গুইসাপ আমাদেরকে স্বাগতম জানালো। আমরাও গাড়ি থামিয়ে ওর সাথে ভাব জমাতে চেষ্টা করলাম। তবে আমাদেরকে, মোটেও পাত্তা না দিয়ে ও একেবেঁকে লেজ দুলিয়ে রাস্তা পার হয়ে বনের ভেতরে হারিয়ে গেলো। উল্লেখ্য যে বুশ ফায়ারে ন্যাশনাল পার্কের এই অংশটুকু ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। সামনে এগিয়ে যেতে পথে আমরা একটু ফাঁকা জায়গায় চলে এলাম। ফাঁকা বলতে আসলে এই জায়গায় গাছের পরিমান কম, তবে এখানে রয়েছে লক্ষ লক্ষ গ্রাস ট্রি (Grass tree)। গ্রাস ট্রি হলো অস্ট্রেলিয়ার একটি আইকনিক উদ্ভিদ যা বৈজ্ঞানিকভাবে জ্যানথোরিয়া (Xanthorrhoea) নাম পরিচিত। এ গাছগুলো খুব ধীরে বড়ো হয়। সুবিধাজনক আবহাওয়ায় বছরে সর্বোচ্চ ১ থেকে ২ মিলিমিটার পর্যন্ত বড় হতে পারে। কাজেই আপনি ১ মিটার লম্বা কোনো গাছ দেখলেন মানে হচ্ছে আপনি প্রায় ১০০ বছর পুরোনো একটি ঘাসের গাছ দেখলেন। কোথাও কোথাও এই গাছের ৪/৫টি মাথা রয়েছে। এগুলোর আনুমানিক বয়স ৫০০বছরের উপরে। এই অংশটিকে একটি জীবন্ত জাদুঘর বলতে পারেন।

ক্রোয়াজিংওলোং ন্যাশনাল পার্কের অন্যতম আকর্ষণ গোল্ডেন হুইসলার (Golden Whistler)। এর পিঠ ও মাথা কালো এবং পেটের দিকে উজ্জ্বল-হলুদ রঙের। পুরুষ পাখিটির গলা গলা সাদাটে, মনে হয় গলায় একটা সাদাকালো বিব পরে আছে। কিন্তু এদের বাচ্চা ও স্ত্রী প্রজাতি দেখতে একেবারেই অন্যরকম। খুব সুন্দর করে ডাকে এই পাখি। কান পেতে খেয়াল করলে বারবার তীক্ষ্ণ শিষ শুনতে পাবেন। আসে পাশের মাঝাড়ি উচ্চতার গাছের ডালে চোখ রাখলে দেখবেন ও আপনার উপরও নজর রাখছে। গ্রীস্মকালের রোদেলা সকালে গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে শোনা হলদে পাখির সুমুধুর শিষ এখনো কানে বাজে।

বিশাল বনভুমির বিভিন্ন অংশ দেখতে দেখতে বেম শহরের প্রায় কাছাকাছি চলে এলাম। বেম নদীর ব্রিজ থেকে আমরা একটা নির্ঝর বা ক্যাসকেড দেখতে পেয়ে গাড়ি ঘুরিয়ে নদীর পাশে থামলাম। খানিকটা হেটে গিয়ে নির্ঝরের কাছাকাছি পৌঁছানো গেলো। খুব শান্ত গতিতে পানি নদীতে পড়ছিলো। গরমের সময় বলে নদীতে পানির প্রবাহ কম। ব্রিজে কোনো গাড়ির চলাচল ছিল না। নদীর পার ঘুড়ে আমরা ব্রিজের উপরে চলে আসলাম। জায়গাটা খুবই চমৎকার, নির্জন। চারপাশ বেশ সবুজ, এমনকি পানিও দেখতে সবুজ। নিচের পাথুরে মাটিতে শ্যাওলা হয়ে থাকবে সম্ভবত।

এখান থেকে ৫ কিলোমিটার পরে একটা বড়ো ইনলেট। বেম নদী এখানে তার গতি হারিয়ে মন্থর হয়েছে। ভাটায় সময় অদূরের মোহনা বন্ধ হয়ে যায়। এই ইনলেটটি গভীর বন দিয়ে চারপাশ থেকে ঘেরা। ইউক্যালিপ্ট জাতের গাছের পাশাপাশি রয়েছে টি ট্রি (লেপ্টোস্পার্মাম) জাতীয় গাছের জঙ্গল। মনে হচ্ছিলো বাইরের জগৎ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ইনলেটের পানি অগভীর, নিচে এক জাতীয় সরু ঘাস জন্মেছে। লম্বা ঘাসগুলো হালকা স্রোতের তালে তালে দোল খাচ্ছিলো। এখানে রয়েছে ছোট একটি জেটি, একটি নৌকা নামানোর জায়গা (বোট রাম্প) এবং মাছ কাটাকাটির ব্যাবস্থা। একজন বাবা তার ছেলে সহ মাছ ধরছিল, আরেকজন নৌকা ভাসিয়ে সমুদ্রের দিকে চলে গেলেন। কয়েকটি নৌকা বাধা ছিল এখানে।

এখানকার জেটি দেখে মনে হলো এটি হাজারো পেলিকানের বিশ্রামের জায়গা। পেলিকান পানিতে বসবাসকারী বৃহৎ আকারের পাখি, বস্তুতঃ পেলিকান পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম উড়ন্ত পাখি। ছোট বেলায় মিরপুর চিড়িয়াখানায় এই পেলিকান খুব অবাক করেছিল আমায়, নামটাও আরো অদ্ভুত ছিল – “গগণবেড়”। আমরা বাঙালিরা হয়তো জানিই না যে পেলিকানের বাংলা নাম গগণবেড়। মাছ এদের প্রধান খাবার। এদের বড়ো ঠোঁট দিয়ে বড় কোনো মাছ, পাখি এক নিমিষেই গিলে ফেলতে পারে। ঠোঁটের নিচে একটি চামড়ার থলি থাকে এবং যা খায় তা সেখানে জমিয়ে রাখে। আমরা জেটির দিয়ে এগিয়ে গেলাম। আমাদের দেখে পেলিকানগুলো বেশ বিরক্ত হয়ে সরে যাচ্ছিলো কিন্তু উড়ে যাচ্ছিলো না। আমরা পেলিকানগুলোর খুব কাছাকাছি গেলাম, এদের কেউ কেউ উড়ে যাবার প্রস্তুতি নিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে আমাদের দেখছিলো। দুই একটা আবার টেনশন সহ্য করতে না পেরে উড়ে গেলো অথবা পানিতে ঝাপিয়ে পড়লো। কোনো কোনো টি আবার লম্বা ঠোঁট উঁচিয়ে ঠক ঠক শব্দ করে ভয় দেখাতে চাইছিলো আমাদের। অবাক করা বিষয় হলো ১০ কেজি ওজনের একটা পাখি কয়েক সেকেণ্ডে উড়ে যেতে পারে আবার জেটির রেলিঙে বসার সময় বেশ সময় নিয়ে আকাশে ভেসে বসে পড়ে। আমরা ওদের নানা কার্য কলাপে মুগ্ধ হচ্ছিলাম। আসে পাশে দেখতে দেখতে বেশ সময় গড়িয়ে গিয়েছিলো। আমরা জেটি থেকে বের হয়ে পাশের ছোট পার্কের বেঞ্চিতে কিছুক্ষন বসলাম।

সি টু সামিট ট্র্যাক শেষ হয়েছে বেম নদীর পাশেই গড়ে ওঠা ছোট্ট শহর বেম (Bemm) রিভারে। বেম রিভারকে একটা জেলেপাড়াও বলতে পারেন। এই জায়গায় ব্রিম (Bream) মাছের প্রাচুর্য, তাছাড়া, পার্চ, স্যামন, মালেট, ফ্লাট হেড, ট্রেভালি প্রচুর ধরা হয়। মাছের জন্য বিখ্যাত এই শহরে বেম রিভার অ্যাঙ্গলিং (Angling) ক্লাব মাছ ধরার টুর্নামেন্ট আয়োজন করে থাকে। বেম শহরের জনসংখ্যা মাত্র ৬০ জন। এখানে রেস্তুরাঁ খোঁজার চেষ্টা বৃথা, যদিও পরে একটা দোকান দেখতে পেয়েছিলাম। যাইহোক, আমরা আমাদের সাথে থাকা খাবারই খেলাম। খেতে খেতে জেটিতে লোকজনকে আনাগোনা ও পেলিকানগুলোর কর্মকান্ড দেখতে পাচ্ছিলাম। বেম শহর থেকে ম্যানোরিনা (Manorina) হয়ে আবার প্রিন্সেস হাইওয়েতে উঠে আসা যায় আর এটাই শর্টকাট রাস্তা। আমরা বনপথে না গিয়ে ম্যানোরিনা হয়ে মালাকোটা ফিরবো বলে ঠিক করলাম। পথে যেতে যেতে দুই বন্ধুর ফোন পেলাম। ওরাও মালাকোটার দিকে আসছে। আমরা ওদের সাথে ক্যান রিভারে দেখা করার পর একসাথে মালাকোটার পানে যাত্রা করলাম।

মালাকোটায় পৌঁছে বন্ধুদের ক্যাম্পগ্রউন্ডে নিয়ে এলাম এবং আমাদের পাশেই ওদের ক্যাম্প সেটআপ করতে সাহায্য করলাম। এতগুলো চেনা মুখ একসাথে হয়ে আমরা বেশ হৈচৈ করতে শুরু করলাম। বেলা গড়িয়ে বিকেল হতেই আমরা রাতের খাবার শেষ করে কোয়ারি বিচে (Quarry) গেলাম। রঙিন পাথরের খাড়া পাহাড়ের গায়ের ভাঁজগুলো খুব সুন্দর বোঝা যাচ্ছিলো, স্যান্ডউইচের মতো নানা স্তর দিয়ে গঠিত সেই ভাঁজ। দেখতে দেখতে আকাশে মেঘ ঘনিয়ে এলে কনে দেখা আলোর মতো নরম আলো তৈরি হলো। আমরা ঝটপট কিছু ছবি তুলে নিলাম। সূর্যাস্তের সময় না হলেও সূর্য পাহাড়ের পেছনে চলে গিয়ে অন্ধকার ঘনিয়ে এলো। খানিকটা ঝোড়ো বাতাস হচ্ছিলো| আমরা ফিরে আসার পথে মালাকোটা জেটিতে থামলাম। আকাশ পরিষ্কার হতে শুরু করেছিল আমাদের দিকে কিন্তু অদূরে বিশাল এক টুকরো মেঘ থেকে ক্ষনে ক্ষনে বজ্রপাত হচ্ছিলো। আমরা বেশ আগ্রহ নিয়ে বজ্রপাত দেখতে থাকলাম।

এবারের যাত্রায় বন্ধুদের পেয়ে আমরা আমাদের ভ্রমণের পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন আনা হলো। সকালে উঠে সবাই একসাথে নাস্তার আয়োজন করে ফেললাম। তাঁবুর পাশে বসে নাস্তা করার সময় দেখতে পাচ্ছিলাম একজন লোক ভ্যানগাড়ি করে কফি বিক্রি করতে এসেছে। ভ্যানগাড়ি করে সামারে আইসক্রিম বিক্রি করতে দেখেসি কিন্তু কফি বিক্রি করতে কখনো দেখিনি। ভ্যানগাড়িটি প্রতিটি ক্যাম্পের পাশে থেমে থেমে জিজ্ঞেস করছিল কারো কোন কফি লাগবে কিনা? কেউ কিনতে চাইলে গাড়ির চালক তথা বারিস্তা গাড়ি থামিয়ে পিছনের ডালা খুলে কফি বানাতে লেগে যায়। জানা গেলো এই কোভিডের সময়ে তার ক্যাফে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে ভ্রাম্যমান কফির দোকান দিয়েছে এবং বেশ ভালো চলছে। বেশ ভালোই চলছে সেটা না বললেও বুঝতে পারলাম। প্রায় প্রতিটি তাঁবুর পাশেই থামছিল আর ২-৪টি কফির অর্ডার সরবরাহ করছিলো। আমার এক বন্ধু সে মুহূর্তে বাংলাদেশী স্টাইলে দুধ চা বানাচ্ছিল, ফলে, আমরা আর কফি নিলাম না। তবে, পরে নাস্তা শেষে আমরা সবকিছু গুছিয়ে ক্রোয়াজিংওলোং ন্যাশনাল পার্কের মালাকোটার অংশে যাবার পথে শহরের একটি দোকান থেকে কফি নিয়ে নিলাম।

প্রথমে আমরা লেকসাইড ড্রাইভ (Lakeside drive) ধরে সামনে এগিয়ে কার্বিথং জেটির (Karbeethong Jetty) কাছে থামলাম। অপূর্ব চমৎকার ছিল লেকসাইড ড্রাইভ ধরে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা। প্রতি ৫০০মিটারের চাইতে কম দূরে দূরে এক একটি সুন্দর জেটি, আমরা কিছুক্ষন পরপরই থামছিলাম। গাড়ি চালিয়ে ক্যাপ্টেন ক্রিক ওয়াকিং ট্র্যাক (Captain Creek Walking Track) পর্যন্ত এসে আমরা গাড়ি থেকে নেমে গেলাম। এর পর আসলে আর গাড়ি যাবার রাস্তা নেই। ওয়ালাগারাহ নদীর পাশ ধরে ক্যাপ্টেন ক্রিক ওয়াকিং ট্র্যাক ক্রোয়াজিংওলোং ন্যাশনাল পার্কের ভেতরে ঢুকে গেছে। পার্কের প্রবেশ পথে ক্রোয়াজিংওলোং ন্যাশনাল পার্কের একটি বড়ো সাইবোর্ড দেখতে পেলাম। পাশে ওয়ালাগারাহ নদীর পাড় ঘেষে কয়েকটি বিশাল সাইজের রেড গাম (এক ধরণের ইউক্যালিপ্ট গাছ) দেখতে পেয়ে সবাই মিলে গাছ জড়িয়ে ধরে চট জলদি কিছু ছবি তুলে নিলাম। নদীতে একজন মহিলাকে দেখতে পেলাম যিনি একটা স্ট্যান্ড আপ প্যাডেল বোর্ডে চড়ে গর্ভীর নদীর দিকে চলে গেলেন। আমরা কয়েকজনকে খুব ধীর গতিতে স্পীডবোট চালিয়ে যেতে দেখতে পেলাম তবে অবাক হয়েছিলাম একজনকে দেখে যিনি ওয়ালাগারাহ নদীতে সাঁতার কাটছিলেন। লোকটিকে মাঝ নদী বরাবর অনেকক্ষন ধরে সাঁতার কাটতে দেখলাম। আমরা হাটতে হাটতে বনের ভেতরে প্রায় ২ কিলোমিটার চলে গিয়েছিলাম, তাই আর সামনে না এগিয়ে গাড়িতে ফিরে এলাম।

গাড়ি চালিয়ে কিছুদূর যাবার পর আমরা একটা শর্টকাট রাস্তা ধরলাম, সে রাস্তা আমাদেরকে বনের মধ্যে দিয়ে জেনোয়া-মালাকোটা (Genoa-Mallacoota) রোডে উঠিয়ে দিলো। এখন থেকে ২০কিলোমিটার দূরে ওয়ালাগারাহ নদীর উজানের অংশে রয়েছে জিপসি পয়েন্ট লেকসাইড (Gipsy Point Lakeside) বলে আরেকটি সুন্দর জায়গা। নদী এখানে অনেক শান্ত, চারপাশটা আরো অনেক সবুজ, অর্থাৎ আমরা দাবানলের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া আরেকটি অংশে এসেছি। আমরা গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেটে জিপসি পয়েন্ট জেটিতে (Gypsy Point jetty) চলে এলাম। দুজন দম্পতিকে দেখলাম গাড়ির ছাদ থেকে ক্যানো (canoe) নৌকা নামিয়ে নদীর দিকে হেঁটে যেতে। এখানে একটু পরপরই জেটি, মনে হচ্ছে প্রতিটি বাড়ির জন্যই আলাদাভাবে তৈরি এগুলো। ভালোকরে লক্ষ্য করে বুজতে পারলাম এগুলো ব্যাক্তিগত জেটি, কয়েকটিতে প্রাইভেট জেটি সাইনবোর্ডও লাগানো ছিল। একজন মহিলাকে বেশ আয়েশী ভঙ্গিতে জেটি থেকে বরশি পেতে রাখতে দেখলাম। এতো সুন্দর জায়গা পেয়ে আমরা বেশ সময় ধরে ছবি তুললাম।প্রায় ঘন্টাখানেক সময় কাটিয়ে আমরা এখান থেকে অল্প দূরের একটা নদী দেখতে এলাম। এখানে এসে বুঝতে পারলাম বাম দিকে অর্থাৎ পূর্ব দিক থেকে এসেছে জেনোয়া (Genoa) আর ওয়ালাগারাহ নদী উত্তর দিক থেকে এসে এখানে একসাথে মিলে গিয়েছে। এখানেও অনেককেই দেখলাম জেটি থেকে প্যাডেল বোট পানিতে ভাসিয়ে চলে যেতে। পথে কয়েকটি নৌকা ভাড়া নেবার দোকান দেখেছিলাম যেখান থেকে নৌকা, কায়াক, প্যাডেল বোট এবং মাছ ধরার বরশি দিনের বিশেষ সময়ের জন্য কিংবা সারাদিনের জন্য ভাড়া করতে পারেন। জেনে রাখা ভালো যে ভিক্টোরিয়ার সকল সামুদ্রিক এলাকা, মোহনা এবং অভ্যন্তরীণ নদী এবং লেকে মাছ ধরার জন্য লাইসেন্স (Recreational Fishing Licence) অত্যাবশ্যক।

দেখতে দেখতে বেলা গড়িয়ে প্রায় দুপুর হয়ে গেলো। আমারা ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে হালকা কিছু খেয়ে নিবো চিন্তা করলাম, সকালবেলায় ভারি নাস্তা খাওয়ায় লাঞ্চ খাওয়ার জন্য কারো তেমন আগ্রহ ছিল না তাই, আমরা জামাকাপড় পাল্টে বিচে যাবার প্রস্তুতি নিলাম। আমাদের ক্যাম্প থেকে ২ কিলোমিটার দূরেই বেটকা (Betka) নদী, নদীর মোহনার পানি অগভীর, স্বচ্ছ, টলমলে। ৫০-১০০ মিটার দূরেই সমুদ্র, তবে ভাটার সময়ের কারণে তখন অনেকে স্রোত ছিল। এই অংশটি একটি ইনলেটের মতো হওয়ায় জায়গাটিকে নিরাপদ মনে করে অনেকেই ছোট বাচ্চাদের নিয়ে এসেছেন। সাথে থাকা ছেলে নোমান সবার আগে ওর সার্ফ বোর্ড নিয়ে অগভীর পানিতে নেমে দাপাদাপি করতে থাকলো। সাথে থাকা সবাই পানিতে নেমে গেল মানে অগভীর পানিতে বসে গেলো। একফাঁকে নোমান এসে সবাইকে ভিজিয়ে দিয়ে গেলো। বিচের পাড়ে বারবিকিউ, গোসলখানা সবই আছে। জামাকাপড় পাল্টে ক্যাম্পে ফিরে চললাম সবাই।

গতকাল শেষ বিকেলে যখন কোয়ারি বিচে এসেছিলাম তখন এখানের বিচে পড়ে থাকা বড় বড় পাথর আর তার গেয়ে জমে থাকে গাঢ় সবুজ সামুদ্রিক শৈবাল দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। আজ বিকেলে সেগুলোর কিছু ছবি তুলবো বলে চিন্তা করলাম কিন্তু বিকেল নাগাদ আকাশ খানিকটা মেঘলা হয়ে গেলো, হালকা বাতাস শুরু হলো। করোনা কালে বহু মাস ছবি তোলা হয়না কাজেই চলে গেলাম। ঘুরে ঘুরে পাথর, গাছ, ঘাস সব কিছুরই ছবি তুলছিলাম। সমুদ্র স্রোত পাথরগুলো গায়ে বাড়ি খেয়ে হালকা কুয়াশার মতো হচ্ছে পাথরগুলোর আশে পাশে। আবার কোনো কোনটি ছোট ঝর্ণার মতো তৈরী করছিলো। ঝর্ণার পানি ১৫-২০ সেকেন্ডের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। ঘন্টাখানেক এ এলাকায় ছবি তুলে পানিতে নামলাম। হাঁটুপানিতে দাঁড়িয়ে একটি পাথরে বেড়ে ওঠা কিছু শৈবালের ছবি তুলছিলাম হঠাৎ মধ্যে বড় একটি স্রোত এসে আমার ক্যামেরার কিছু অংশ এবং আমাকে মোটামুটি ভিজিয়ে দিয়ে গেলো। আরো কিছুক্ষন এখানে থাকার ইচ্ছে থাকলেও ভিজে যাবার কারণে সব গুটিয়ে ক্যাম্পে চলে এলাম।

ক্যাম্পে ফিরে দেখি ছোট গ্যাস বার্নারের চুলায় রান্নার বিশাল আয়োজন চলছে, খিচুড়ি, বারবিকিউ চিকেন, সালাদ ইত্যাদি। ক্যাম্পে আমাদের সাধারণত এত আয়েশি খাবার খাওয়া হয়না তবে বাঙালি কয়েকটি পরিবার একসাথে হবে আর খানাপিনা হবে না তা কি করে হয়। অনেক সময় নিলো চুলায় সে রান্না হতে। ততক্ষনে সূর্যর আলো চলে গিয়েছে। আমাদের তাবুগুলো এবং ডাইনিং টেবিলের আশেপাশের অংশটুকু মরিচ বাতি আর রিচার্জেবল ক্যাম্পিং লাইট জ্বালিয়ে আলো আধারিতে খেতে শুরু করলাম দেশি খাবার দেশি ডিনার টাইমে। আমাদের তাঁবুর কয়েকটি তাঁবুর পাশে বেশ কতগুলো পরিবার একসাথে হয়ে বাদ্য বাজিয়ে গান গাওয়া শুরু করলো। তাদের গান বাচ্চাদের হৈ হুল্লোর শুনতে শুনতে আমরা খাবার শেষ করলাম। সবকিছু গুছিয়ে আনতে সাড়ে দশটা বেজে গেলো। ততোক্ষনে গান থেমে গিয়েছে, চারপাশ একেবারে শান্ত।

বাসা থেকে বের হয়েছি আজকে চার দিন। দুশ্চিন্তা হচ্ছিলো আমাদের মেলবোর্নের বাসায় হরেক রকমের গাছ মৌসুমী ফল, হরেক পদের বেরি, স্থানীয় এবং বাংলাদেশী মৌসুমী শাকসবজির জন্য । অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ অংশে সামারে (ডিসেম্বর – ফেব্রুয়ারী) প্রচন্ড গরম পড়ে। তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত উঠে যায়। ২০০৯ সালে মেলবোর্নের কাছে হোপটন (Hopetoun) শহরে ৪৮.৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা পরিলক্ষিত হয়। মেলবোর্ন শহরে টানা তিনদিন তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশি ছিল, ফলে, বিশাল দাবানল শুরু হয় যা “ব্ল্যাক স্যাটারডে ফায়ার” নামে বিশেষ পরিচিত। এখানে একদিনের গরমে গাছের, পাতা, ফুল, ফল, এমনকি আস্ত গাছ শুকিয়ে পুড়ে যেতে পারে। কাজেই, এখানে গাছ লাগালে কাঠের বা আখের মালচিং (mulching) করতে হয়, প্রায় প্রতিদিনই গাছের গোড়ায় পানি দিতে হয়। একদিন দুদিন পানি না দিলেই গাছগুলো দুর্বল হতে ঢলে পড়তে থাকে। এছাড়া বাসাতে দুটো বিড়ালছানা “টাই” আর “গার” রয়ে গেছে। বাগান, বিড়াল সবকিছু সামলে লম্বা সময়ের জন্য কোথাও বেড়াতে যাওয়া দীর্ঘ পরিকল্পনা আর সমন্বয়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা, পানি, কিটেন লিটার সব গুছিয়ে রেখে বের হয়েছিলাম। এর মাঝে আমাদের আন্তরিক বন্ধু প্রায় প্রতিদিন এসে বিড়ালদের এবং আমার বাগানদের খোঁজ নিয়ে যাচ্ছিলেন। এত সবকিছুর পরও বাসার জন্য মন টানছিল।

সকালে উঠে আমরা অন্যান্য দিনগুলোর মতোই নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে নাস্তা করতে বসলাম। নাস্তার টেবিলের আলোচনায় সবাই ক্যাম্প গুটিয়ে বাসা মানে মেলবোর্নের দিকে যাবার মতামত দিলো এবং আমরা ফিরতি পথে কয়েকটি জায়গায় থামবো সে রকম সিদ্ধান্ত হল। আসলে ক্যাম্পিং ট্রিপ ৩/৪ দিনের বেশি হলে আমাদের মতো নবীশদের বেশ কষ্ট পোহাতে হয়। গোছাতে গিয়ে মনে হচ্ছিল কয়েকদিনের জন্য ক্যাম্প করতে আমরা এক ট্রাক জিনিসপত্র নিয়ে এসেছি। সবাই মিলে ঘন্টাখানেক কসরৎ করার পর আমাদের দুইটি তাবু এবং ক্যাম্পিং এর আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র ঠেসে ঠুসে যার যার গাড়িতে ঢুকাতে পারলাম। বেলা বাড়ার আগেই ছোট্ট কফিশপ থেকে গতকালের মতোই কফি নিয়ে মালাকোটা শহরের মায়া থেকে মুক্ত হলাম।

ভিক্টোরিয়াতে আমার খুব পছন্দের দুটি ছোট্ট শহরের নাম মারলো (Marlo) এবং কেপ কনরান (Cape Conran)। মালাকোটা থেকে অর্বস্ট এবং মারলো হয়ে কেপ কনরান (Cape Conran) আসা যায়। তবে, প্রিন্সেস হাইওয়ে থেকে ক্যাবেজ ট্রি রোড ধরে ক্রোয়াজিংওলোং ন্যাশনাল পার্কের পাশ দিয়েও এখানে পৌঁছানো যায়, এটাই আমার পছন্দদের রাস্তা। ক্রোয়াজিংওলোং ন্যাশনাল পার্কের কথা বারেবারে আসতে অনেকেই কনফিউজড হতে পারেন। আসলে এই পার্কটি অনেকে বড়ো, আয়তনে ভিক্টোরিয়ার ৭ম (৮৭০ বর্গকিলোমিটার) এবং আজকে আমরা এই পার্কের সর্ব পশ্চিম প্রান্তের দিকে যাচ্ছি। সমুদ্রের এই অংশটি বিওয়্যার রিফ সামুদ্রিক অভয়ারণ্য (Beware Reef Marine Sanctuary) নামে পরিচিত।

কেপ কনরানে আসলেই আমি সবার আগে গাড়ি থামাই স্যামন রক (Salmon Rock) কার পার্কে কারণ, এখানে পাবলিক টয়লেট আছে। মালাকোটা থেকে যাত্রার পর থেকে পথে প্রায় দেড় ঘন্টা কোথাও থামেনি আমরা। কাজেই, সবারই আগ্রহ ছিল বাথরুমে যাওয়ার। কার পার্কিং এলাকাটি বেশ ছোট, সর্বোচ্চ ৫/৬ টি গাড়ি পার্ক করতে যতটুকু জায়গা লাগে ঠিক ততটুকুই। এখান থেকে সংকীর্ণ একটি পথ হাতের বামে চলে গেছে স্যামন রকের দিকে এবং আরেকটি পথ সোজা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেছে বিচের দিকে। দুই পথেই সমুদ্রে নামা যায় তবে এখান থেকে দক্ষিণ দিকের অংশ অর্থাৎ স্যামন রকস বোট রাম্প পর্যন্ত পাথুরে। স্যামন রকে যাবার পথেই ছোট একটি কাঁঠের বেঞ্চ টেবিল পেতে রাখা, আমরা সেখানে কিছুক্ষণের জন্য বসলাম। ক্যাম্প গুটিয়ে ফেলার আগেই পানি গরম করে বড় একটি ফ্লাক্সে নিয়ে নিয়েছিলাম, সাথে থাকা চা-কফি, মিক্সড নাট, স্ট্রবেরি আর সবচে উপযুক্ত খাবার আপেল এবং কলা নিয়ে টেবিল সাজিয়ে নাস্তা খেতে বসে গেলাম।

কার পার্কিং এলাকা থেকে স্যামন রক বড়জোর ২০০-৩০০ মিটার হবে, তবে এই পথটুকু সবার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। এখানকার পাথরের গায়ে গাঢ় হলুদ এবং কমলা রঙের একধরণের শ্যাওলা জন্মে। দূর থেকে সেই পাথর দেখতে খুবই চমৎকার। একেকজন ছোট ছোট পাথর বেয়ে মুহূর্তেই উপরে উঠে চূড়ায় উঠে বসে গেলাম। পাথরের উপর বসে স্যামন রক সংলগ্ন এলাকা এবং সমুদ্রের দৃশ্য এক কথায় অসাধারণ, যদিও, কিছুক্ষনের মধ্যেই আমরা সেলফি আর ফোটো সেশনে ব্যাস্ত হয়ে গেলাম। বুশফায়ারের তান্ডব থেকে এই এলাকাও রক্ষা পায়নি, তবে, স্যামন রক আর আশেপাশের সামান্য অংশ আগুন থেকে রক্ষে পেয়েছে। এখানে পাথরের ফাটলে এক জাতীয় লিজার্ড বাস করে। সৌভাগ্যবসত আমরা একটা লিজার্ড পরিবার দেখতে পেলাম । অনেকক্ষণ ধৈর্য্য ধরে বসে থাকার পর এদের খুব কাছ থেকে কয়েকটি ছবি তুলতে পেরেছিলাম।

আমরা হেঁটে হেঁটে পাথুড়ে অংশগুলো পার হয়ে স্যামন রক বোট রাম্প পর্যন্ত গেলাম। লোকজন গাড়ি থেকে নৌকা নামিয়ে মাছ ধরতে চলে যাচ্ছে গভীর সমুদ্রের দিকে। এখান থেকে আমাদের ঐতিহাসিক সেইলর্স গ্রেভ (Sailors Grave) যাবার কথা। ১৮ শতকের দিকে বিওয়্যার রিফে অনেক জাহাজ ডুবি হয়েছিল, উদ্ধার প্রচেষ্টার সময় যাদের মৃতদেহ পাওয়ায় গিয়েছিল তাদের এখানে সমাহিত করা হয়েছে। যদিও সেইলর্স গ্রেভ স্যামন রক থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার, আমরা গাড়িতে চড়ে যাবো এবং ওখানে বারবিকিউ লাঞ্চ করবো, আমরা ফিরে চললাম গাড়ির দিকে।

কয়েক বছর আগে মেলবোর্ন থেকে ক্যানবেরা যাবার পথে একরাত সেইলর্স গ্রেভের কাটিয়েছিলাম। বেশ নির্জন এই জায়গা, যে জায়গায় ক্যাম্প করে রাতে ছিলাম সেদিন সেখানে আর কেও ছিল না। কিন্তু আজ ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আলাদা, অনেক লোকের আনাগোনা এখানে। কার পার্কিংয়ে কিছুক্ষন অপেক্ষা করে তবেই জায়গা পাওয়া গেলো। বেশ বিপদজনক পাথুরে এলাকা এই সেইলর্স গ্রেভ। বিচের চারপাশে এবং পাশের খাড়া পাড়ে শুধু পাথর পরে আছে। বছরের পর বছর ধরে জোয়ার ভাটার তীব্র পানির স্রোতে পাথরগুলো কেটে গিয়ে বেশ ধারালো হয়েছে। বেকায়দায় পরে গেলে ভয়াবহ বিপদ হতে পারে।

গাড়ি থেকে নেমে বিচে এসে বেশ ভালো লাগছিলো। এখানে বিচের বালিতে গুল্মজাতীয় এক ধরনের গাছ প্রচুর পরিমাণে হয়েছে, সেই গাছের সাদা সাদা ফুল থেকে ফুলের মধু আহরণের জন্য সাদা রঙের এক ধরনের প্রজাপতি এসেছে অগণিত পরিমাণে। আমার ছেলে তাতে বেশ বেশ আনন্দিত হলো এবং সেই গুল্মঝোপের জঙ্গলে প্রজাপতির পিছনে ধাওয়া করতে করতে বিচের শেষভাগে চলে গেলো। বিচের শেষভাগে এসে মনে হলো কোনো ভাগাড়ে চলে এসেছি। বিচ ক্লিন করার জন্য নানা রকমের সামগ্রিক আগাছা (sea weed) গাছের ডাল এগুলো সংগ্রহ করে এনে বিচের পারে জমা করা হয়েছে। ভয়াবহ দাবানলে বিচ এবং সংলগ্ন এলাকার যাবতীয় গাছপালা এবং টুরিজম-এর কাজে ব্যাবহৃত নানা ইনফ্রাস্ট্রাকচার যেমন লুক আউট এগুলো কোনটির আর অস্তিত্ত নেই। প্রায় ৫০০মিটার লম্বা একটা বোর্ডওয়াক ছিল এখানে, তার থেকে আরো সামনে এগিয়ে একটা ছোট প্রাইভেট বিচের মতো জায়গা ছিলো, যা ছিল আমাদের খুব পছন্দের একটা জায়গা। নিরিবিলিতে সমুদ্রের গর্জন শুনতে এর চাইতে ভালো জায়গা আর কোথাও নেই। কিন্তু দাবানলের কারণে বোর্ডওয়াকের বেশিরভাগ অংশ এখন আর অবশিষ্ট নেই (ছবি দ্রষ্টব্য)। আমরা বেশ কসরৎ করে পা টিপে টিপে পাহাড়ি অংশ এবং ধারালো পাথুরে এলাকাগুলো পার হলাম, যদিও পাবলিক সেফটি নোটিশে বলা ছিল এই এলাকা বন্ধ। গত একবছর আগে এগুলো দাবানলে ধ্বংস হলেও কোভিড রেস্ট্রিকশনের কারণে আর পুনর্নির্মাণ করা হয়নি।

এখানে দাবানলে এতটাই ক্ষতি হয়েছে যে বিচের আশেপাশে পাথরের উপর উপর যে ঘাসগুলো জন্মে সেগুলো পুড়ে গেছে। সাধারণত, এ জাতীয় ঘাসগুলো জোয়ার-ভাটার পানি পাথরে ভেঙে গিয়ে যে কুয়াশার মতো তৈরী হয় তাতে একটু ভেজা ভেজা থাকে। তাছাড়া, এগুলো পাহাড় এবং বন থেকে আলাদা, একদম পানির কাছাকাছি। লক্ষ করে দেখতে পেলাম যে আশপাশের এজাতীয় ঘাসের ঝোপ গুলো পুড়ে গেছে, খুবই অসম্ভব মনে হচ্ছিল আমাদের কাছে। আমরা বনের যে অংশটি দিয়ে যাচ্ছিলাম ঠিক ওই অংশই বোর্ডওয়াক ছিল পাশে ঘন ঝোপ জঙ্গল ছিল। সেগুলো সব একদম পুড়ে গেছে, শুধুমাত্র গাছের মূল কাঠামোগুলো সারিবেঁধে ভুতুড়ে কয়লার গাছ হিসাবে দাঁড়িয়ে আছে। আগেরবার যে বোর্ডওয়াক দিয়ে গিয়েছি ঠিক সে বরাবর নিচে পাথরের উপর দিয়ে এগুতে এগুতে কয়েকটি কংক্রিটের স্ট্রাকচার দেখতে পেলাম আর বাকি সবকিছু পুড়ে গেছে। যাবার পথে বোর্ডওয়াকের ছোট একটি অংশ দেখতে পেলাম যে অংশটি এখনো সবুজ, আগুনদের ছোয়া লাগেনি এই অংশে। আমরা কয়েকটি ছবিও তুললাম। হঠাৎ করেই ছেলে নোমানকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না। পেছনে খানিকটা পথ ফিরে গিয়ে দেখি সে ভীষণ মন খারাপ করে শুকনো মুখে রাস্তার পাশের পোড়া একটা গাছ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তার প্রিয় জায়গা, বোর্ডওয়াক, গাছ সব পুড়ে গিয়েছে, সেটা সে কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারছিলো না। আমরাও দমে গিয়ে আর বেশি সময় ওখানে না থেকে নোমানের সাথে কথা বলতে বলতে কার পার্কে চলে এলাম।

বেলা তখন প্রায় দুপুর গড়িয়েছে। এখানে কয়েকটি বারবিকিউ এরিয়া ছিল। এরকম জায়গাতে সাধারণত বারবিকিউ প্লেট পরিস্কার থাকেনা, তবে, আজ আমাদের আগে আর কেউ মেশিন গুলো ব্যবহার করো নি বলে খুবই পরিষ্কার ছিল। লকডাউনের কারণে এখানে আসা বেশিরভাগ লোকই এসেছেন ভিক্টোরিয়ার বিভিন্ন জায়গা থেকে এবং অনেকেই পাশেই ক্যাম্পিং করছিলেন কাজেই বারবিকিউ এলাকাতে তাদের চাপ নেই। আমরা বারবিকিউ প্লেট পরিষ্কার করে নিয়ে সেগুলোতে সাথে বয়ে আনা চিকেন বারবিকিউ করতে দিলাম। আমাদের সাথে যথেষ্ট উপকরণ ছিল, ঘন্টা খানেকের মধ্যে দুপুরের খাবার তৈরি হয়ে গেলো। নোমান খেলো না, সারাটা দুপুর জুড়ে মুখ ভার করে রইলো।

দুপুরের খাওয়া শেষ করে সব গুছাতে প্রায় ৩টা বেজে গেলো। নোমানদের সাথে সাথে আমাদেরও বিষন্নতা এবং ক্লান্তি চলে এসেছিলো। আমরা সরাসরি বাসায় চলে যাব সে রকম চিন্তা করেই গাড়িতে উঠে গেলাম। সেইলর্স গ্রেভ থেকে আমাদের মেলবোর্ন শহরতলির বাড়িতে পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হবে আরো পাঁচ ঘন্টার পথ।