বেলজিয়াম পশ্চিম ইউরোপের ছোট একটি দেশ। কিন্তু এ দেশের গুরুত্ব একেবারেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। আর ফুটবল বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের কথা কি আর ভুলে থাকা যায়?

ইউরোপের বড় বড় সব প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তর বেলজিয়ামে অবস্থিত। যেমন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট ও ন্যাটো ইত্যাদি। বেলজিয়াম ইউরোপের কেন্দ্রস্থল। তাই বেলজিয়ামকে ইউরোপের রাজধানী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।

এক কোটির কিছু বেশি মানুষ আর ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটারের কিছু বেশি জায়গার দেশ বেলজিয়াম। এ পরিসংখ্যান থেকেই বুঝতে পারছেন বেলজিয়ামের অবস্থান। বেলজিয়াম বেড়াতে গেলে আপনি খুব সহজেই চারটি দেশ ঘুরে আসতে পারবেন। কারণ এ দেশের বর্ডার নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, জার্মানি আর লুক্সেমবার্গের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
 

বেলজিয়ামের কয়েকটি শহর বেশ বিখ্যাত। তার মধ্যে রাজধানী ব্রাসেলস, অন্টারপন, ব্রুজ, ঘেন্ট, লিয়েশ ও মন্স অন্যতম। একেকটা সিটি দেখতে একেক রকম সুন্দর। পর্যটকরা মূলত সব সিটিতে ঘুরতেই পছন্দ করেন। ব্রাসেলস থেকে খুব সহজেই ট্রেনে করে সব সিটিতে যাওয়া যায়। বরফ দেখতে চাইলে বেলজিয়ামের জুড়ি নেই। বেলজিয়াম বেড়াতে গেলে ইউরোপের প্রায় সব দেশের লোকজনের সঙ্গেই আপনার দেখা হবে। এ দেশের লোকজন ফরাসি ভাষায় কথা বলেন। তাছাড়া জার্মান বা ডাচ ভাষাও চলে। তাই যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটু সমস্যা হতে পারে, কিন্তু বড় বড় সিটিতে সবাই কম বেশি ইংরেজি বলতে পারেন। ইউরোপিয়দের ইংরেজি উচ্চারণ শুনতে বেশ মজাই লাগে! তাই কথা বলতে কৃপণতা করবেন না।

বেলজিয়ামের রাণী মাথালির সঙ্গে তিনবার দেখা হওয়ার সুযোগ হয়েছিল । তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম বাংলাদেশ সম্পর্কে। তিনি বললেন, প্রফেসর ইউনুস তার ভালো বন্ধু এবং বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকার কথা। শুনে ভালোই লাগলো।

বেলজিয়ামে বেড়ানোর একটি সুন্দর জায়গা হচ্ছে ‘অটোমিয়াম’। ১৯৫৮ সালে ব্রাসেলস ওয়ার্ল্ড ফেয়ার এক্সপো এর জন্য এটি স্থাপন করা হয়েছিল। টিকেট কেটে ১০২ মিটার উঁচু অটোমিয়ামের উপরে উঠে ব্রাসেলস শহর দেখতে অদ্ভুত সুন্দর দেখায়। সিটি সেন্টার বা গ্রান্ড প্যালেস হচ্ছে বেলজিয়ামের বিখ্যাত টুরিস্ট স্পট। গ্রান্ড প্লেস সারা বছর পর্যটকদের ভিড়ের মধ্যেই থাকে। এখানে আপনি ১০ শতক থেকে শুরু হওয়া দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য সমৃদ্ধ অসাধারণ স্থাপত্য দেখতে পারবেন।

রাতের বেলা যখন বিভিন্ন রঙে গ্রান্ড প্লেসকে রাঙিয়ে তোলা হয় সেটা দেখার মজাই আলাদা। এটার পাশেই অনেকগুলো খাবারের দোকান আছে। আপনি চাইলেই বেলজিয়ামের খাবারের স্বাদ নিতে পারবেন। সেই ১৯৭১ সাল থেকে প্রতি ২ বছর পর পর এ প্লেসের ফাঁকা জায়গায় প্রায় শ’খানেকের বেশি ভলান্টিয়ার ৭৫ মিটার লম্বা আর ২৪ মিটার প্রশস্ত ফুলের কার্পেট বানিয়ে বিছিয়ে রাখেন। এটা দেখার জন্য বিশ্বের মানুষজন সেখানে বেড়াতে আসেন।

ব্রাসেলসের একটি বিখ্যাত দর্শনীয় জিনিস হচ্ছে ‘মানকান পিস’। মানকান পিস হচ্ছে ব্রোঞ্জের তৈরি এক ছোট বালকের উলঙ্গ ছবি যে কিনা সারাদিন ধরে ঝর্নাতে প্রস্রাব করে যাচ্ছে। দেখতে অনেক ছোট হলেও তার গুরুত্ব সারা বিশ্বে অনেক। কারণ এ ছবি দেখলেই মানুষ ব্রাসেলসের কথা মনে করে। গ্রান্ড প্লেস হতে ৫ মিনিটের দূরত্বে এ মানকান পিস। বেলজিয়াম যে একটি আমোদপ্রিয় ও স্বাধীনচেতা মনের মানুষের দেশ সেটা এ স্থাপত্যশৈলী প্রকাশ করে।

ব্রাসেলসে রাজপরিবারের থাকার জায়গার যেনো অভাব নেই। অনেকগুলো রাজ্প্রাসাদ আছে যেগুলো দেখলে একদিকে যেমন নয়ন জুড়িয়ে যাবে তেমনি সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে যাবেন। তাছাড়া সুন্দর গোছানো পার্কে যখন ফুল ফোটে তখন আপনি বেড়াতে গেলে আপনার মনে হবে আপনার নিজের বাগানে বসে আছেন। তাছাড়া অত্যাধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, উচ্চশিক্ষার জন্যও ব্রাসেলস বিখ্যাত। ইউনিভার্সিটি লিবার ডি ব্রাসেলস, ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি লুভেন বেলজিয়ামের বিখ্যাত কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম। এগুলো ঘুরে দেখতেও আপনার ভালো লাগবে।

ভালো কথা, ওন্টারপন সিটিতে গেলে ডায়মন্ডের দোকান ভিজিট করতে ভুলবেন না। তাছাড়া মন্স সিটিতে যাওয়ার পথে বীরযোদ্ধা নেপোলিয়ান যেখানে জীবনের শেষ যুদ্ধে পরাজিত হন সেই ওয়াটারলুতেও বেড়াতে পারেন। বেলজিয়ামের মানুষও সাইকেল চালাতে পছন্দ করে। সাইকেল ভাড়া নিয়ে আবার ঘুরে ফিরে জমাও দিতে পারবেন। আসলে উন্নত দেশের নাগরিক সুবিধা মানুষের জন্য অপেক্ষা করে, যে যার সুবিধামতো ব্যবহার করতে পারেন।

ফ্রেন্স ফ্রাই বা আলুভাজির কথা শুনলে মনে হবে এটা ফ্রান্সেই মনে হয় প্রথম চালু হয়। কিন্তু বেলজিয়ামের মানুষ গর্ব করে বলে এটা তাদের আবিষ্কার। বেলজিয়ামের সব জায়গাতেই আপনি এ ফ্রাই পাবেন। ক্ষুধা লাগলেই খেয়ে নিতে পারেন। অথবা বিখ্যাত ওয়েফারও খেয়ে দেখতে পারেন। তবে আমার হাঁসের মাংশ দিয়ে ফ্রাই খেতে খুব ভালো লেগেছিলো। ব্রাসেলস স্প্রাউট সবজি খেতে অসাধারণ লাগে। আর এটা প্রায় ৪০০ বছর ধরেই ব্রাসেলসে উৎপাদিত হয়।

ছোট দেশ হলে কি হবে, বৈচিত্র আর সৌন্দর্যের দিক থেকে অনেক বড় দেশ হচ্ছে এ বেলজিয়াম। অবশেষে বেলজিয়ামের মায়া কাটিয়ে ট্রেনে করে চলে যাই ইউরোপের আরেক ছোট দেশ লুক্সেমবার্গে।

 

ঘুরুঞ্চি ম্যাগাজিনের সকল কর্মকান্ড নট ফর প্রফিট, স্বেচ্ছাসেবকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে বর্তমানে সকল কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। আপনি এ সকল কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে চাইলে আমাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।

 

ঘুরুঞ্চির ওয়েবসাইট পরিচালনা করতে আমাদের সপ্তাহে ৮-১২ ঘন্টা কাজ করতে হয়। বর্তমানে আমাদের কাজ শুধুমাত্র স্বেচ্ছাসেবক এবং স্ব-অর্থায়নের উপর নির্ভর করে। আপনারা ঘুরুঞ্চিতে বিজ্ঞাপন দিয়ে, অনুদান দিয়ে, স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে সাহায্য করতে পারেন।

ঘুরুঞ্চির ভ্রমণ ছবি ব্লগের প্রায় ৭,০০০ ছবি থেকে আপনার পছন্দসই ছবি পেপার প্রিন্ট, ফাইন আর্ট প্রিন্ট, ওয়াল আর্ট এবং ডেস্ক আর্ট হিসাবে কেনার ব্যবস্থা রয়েছে। আপনারা ছবি কেনাকাটা করলে আমরা অল্প পরিমাণ পরিমাণ কমিশন পাব, যা ঘুরুঞ্চির ক্রমবিকাশ এবং সম্প্রসারে ব্যবহার হবে।

আমরা আপনার সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞ।