সিডনি থেকে প্রায় ২,২০০ কিঃমিঃ দূরে, মরুময় লালমাটির দেশ ‘উলুরু’। হাজার খানেক লোকের ছোট্ট ছিমছাম শহর, অনেকটা সাজানো খেলনা শহর বলা যেতে পারে। যদিও বিশাল বিশাল চওড়া রাস্তা আছে, তবে জনশূন্য, চারিদিকে শুধু মরু বৃক্ষ আর লাল মাটি। টানা বয়ে চলা বাতাসের শব্দ। সূর্যের আলোর দিক বদলের সাথে সাথে প্রকৃতির দৃশ্যপটও বদলাতে থাকে। এই অঞ্চলে ভিন্ন রকমের ভূদৃশ্য নজরে পড়বে যা মূলত মরুভূমির সৌন্দর্য এবং তা হাজার হাজার বছর ধরে শত শত মাইল একই নিঃশব্দতায় বিরাজমান। অনিন্দ্য সুন্দরের আধার।

এই খেলনা শহরে, জনগোষ্টির বেশীরভাগ আবার পর্যটন শিল্পের সাথে যুক্ত। তবে ঐতিহ্যগতভাবে এই ভূমির মালিক আদিবাসীরা, যারা আনংগু জনগোষ্টি নামে পরিচিত, এদের আবাস শহরের কাছে ও দূরে। চলার পথে দেখা মিলেছে সামান্য কয়েকজনের সাথে তবে সবাই খুব ধীর স্থির, চুপচাপ রকমের ও ছবি তোলার ব্যাপারে আগ্রহী নয়। এ্যবোরোজিন’স জনগোষ্টির কাছে অতি পবিত্রস্থান এই আদি ভূমি, হাজার হাজার বছর পূর্ব থেকেই এখানে তাদের আবাস।

দেশ-বিদেশের পর্যটকদের জন্য মরুভূমিতে রাতে ভোজনের আয়োজন হয়ে থাকে বিশেষ ব্যবস্থায়। আমার পরিবার সেই ভোজ সভায় উপস্থিত হলাম। আমাদেরকে স্বাগত জানান হলো ‘পালয়া’ বলে। হোটেল, রেস্টুরেন্ট বা যে কোন জায়গায় প্রবেশ মুখে আমন্ত্রিতদেরকে ‘Palya’ বলে গ্রহন করা হয় যার অর্থ স্বাগতম। আমরা অতিথিরা, যার যার আসনে গিয়ে বসলাম। ভোজন মেনুতে আদিবাসীদের খাবারের অভিজ্ঞতার সুযোগ আছে, যেমনঃ ক্যাঙ্গারুর স্টু, ইমু পাখীর ডিম, কুমিরের কিমা দিয়ে বানানো এক রকমের সালাদ, সাথে ঐ এলাকার মাছ, সেদ্ধ করে রান্না, ওদের বাগান থেকে তুলে আনা সবজি, সেটাও সেদ্ধ ও সাথে সবুজ সালাদ। সাথে চেনা খাবারও ছিল, তবে খাবার টেবিলে আমি ও আমার ছোট কন্যা চেনা খাবারের মাঝেই ছিলাম, ঝুঁকি নিতে পারিনি।

রাতের আঁধারে আকাশের তারা আর মরুভূমিতে আলোর ময়দানের (field of light) আয়োজনটি ছিল ভীষণ রকমের সুন্দর। যেখানে ভোজন পর্ব চলছিল তার খুব কাছেই অগ্নিকুন্ডের পাশে চলছিল এ্যাবোরজীন ডিজেরিডুর (didgeridoo) বাজনা, অন্ধকার রাতে ছিল অভিজ্ঞ তারকা কথকের চমৎকার বর্ননা ও আলোচনা। সবশেষে ছিল field of light এ হেটে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা। তবে রাত বাড়তেই, খোলা ময়দানের কনকনে ঠান্ডা হাওয়া, বেশ কাবু করে তুলেছিল সবাইকে। পরিবারের নতুন সদস্য মেয়ে জামাইকে নিয়ে উলুরু ভ্রমণে এই বিশেষ রাতটি ছিল আমার পরিবারের জন্য স্মরনীয় একটি অভিজ্ঞতা।

আমার চোখে ‘উলুরু’ অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের সম্পূর্ণ ভিন্ন ও অনন্য একটি রূপ! ভূদৃশ্যের দিকে অপলক তাকাতেই মনে হয় প্রকৃতির এমন সুন্দর রং ও রূপ আমি আগে আর কখনো দেখিনি। গাড় লাল ও হাল্কা কলা পাতা রংয়ের ঝোঁপ-ঝাঁড় আর পেছনের নীল আকাশ মিলে মিশে কি যে এক অপার্থিব রূপ, আহা! কি সুন্দর! কি সুন্দর! ভ্রমণ পিয়াসীদের তীর্থ ভূমি।