ভোর ৫ টা। মুশুলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। ভোরে চট্টগ্রাম নগরীর নতুন ব্রীজ থেকে মারছা বাসে উঠে চলে গেলাম চকরিয়াতে। এখানে আমার টীমমেট দের সঙ্গে প্রথম মিট হলো। তারা সবাই ঢাকা থেকে এসেছে। চকরিয়া থেকে আবারও বাসে করে এলাম আলীকদমে। সকালের নাস্তা খেয়ে চাঁদের গাড়িতে করে আমরা থানচির দিকে রওয়া দিলাম। আলীকদম থেকে একুশকিলো নামের একটা স্থানে এসে তিন্দু রাস্তার মাথায় আমাদের চাঁদের গাড়ি থামলো। গাইড সহ আমাদের মোট ১০ জনের দল ছিল।
এখানে নিচের ইটের রাস্তা থেকেই আমাদের ট্রেকিং শুরু হল। একদম মেঘের ভিতর দিয়ে হাঁটছিলাম আমরা। মনে হচ্ছিলো কুয়াশার চাদরে ঢাকা কোনো এক ভোরে হাঁটছি। একটু দুর যেতে রাস্তার পাশে চমৎকার পাহাড় দেখা যাচ্ছিলো, তবে মেঘের জন্য যতটুকুই দেখছিলাম অন্যরকম লাগছিলো। পাহাড়ের এমন দৃশ্য আমরা কেওই আগে কখনো দেখিনি। যতই দেখি এই দৃশ্য কোন ভাবেই পুরানো হয় না।

অন্যান্য সব ট্রেকিংয়ের চেয়ে এই ট্রেকিংটা একটু কষ্টের ছিল কারণ এখানে আমাদের খাবারের প্রয়োজনীয় সামগ্রী আমাদের নিজেদেরকে বহন করতে হয়েছিলো তার উপর বৃষ্টি সাথে পিচ্ছিল পথ। এপথে আরেকটা বড় সমস্যা হচ্ছে খাবার পানি। পুরো যাত্রা পথে কোথাও কোন পানির দেখা আমরা পাবো না। খাবার পানি আমাদের নিজেদের বহন করে নিতে হবে!
যখন আমরা হাটা শুরু করলাম তখন দুপুর দুইটা বাজে। আমাদের গন্তব্য খেমচং/ক্ষ্যামচং পাড়া নামের একটা জায়গা। সেখানে যেতে আমাদের পুরো দিন লেগে রাত হয়ে যাবার কথা। সত্যিই তাই, আমরা হাঁটছি তো হাঁটছিই। হাঁটা যেন আর শেষ হয় না। কাঁধের ব্যাগটা যেন ভারী থেকে আরো ভারী হচ্ছে। পা যেন আর চলে না। তবে আশে পাশের দৃশ্য আমাকে ঠিকই মুগ্ধ করছিলো। মনে হচ্ছিলো যেন এখানে আমি হাঁটছি অনন্তকাল থেকে। আমাদের মোটামুটি ৩০-৩৫ টি পাহাড়ে উঠতে হয়েছিলো এবং নামতে হয়েছিলো। আমাদের মুগ্ধ করেছিলো নাম না জানা হাজারো লম্বা লম্বা গাছ গুলো। কত বড় বড় আর পুরানো ! যেন আকাশ ভেদ করে দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে!!

যাত্রা পথে একটা জিনিস খেয়াল করলাম। পথে প্রচুর গাছ কাটা হয়েছে। কিছু মানুষ এই বনের গাছ কেটে (মনে হচ্ছে পাচার করছে) ফেলছে। পথের পাশে গাছে আগুন ধরিয়ে দেওয়া রয়েছে কাটা অবস্থায় পড়ে আছে কত গাছ! এগুলো যেন দেখার কেউ নেই।
আস্তে আস্তে রাত নেমে আসছিলো। অন্ধকার নেমে আসলো পাহাড়ি পথে, আমাদের তখনও ৩ ঘন্টা হাঁটতে হবে। এর মধ্যে বৃষ্টিও বেড়ে গেলো। আর পুরো টীমের মধ্যে শুধু আমার টর্চ লাইট ছিলো। এই পথে প্রচুর টাইগার জোঁক। নানা ভয় আমাদের হাঁটার গতি কমিয়ে দিচ্ছিলো। আমাদের দলের কয়েকজন রাতে অনেক বেশি ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। যখন আমরা পাড়াতে পৌছালাম তখন রাত ১০টা বেজে গেছে।



পাড়ার নাম খেমচং। এর আগে আর কখনো পাহাড়ি পাড়ায় রাত্রিযাপন করিনি। পাড়ার দুই পাশে ছোট দুইটা ঝিরি আছে। এই পানি দিয়েই পুরো পাড়ার পানির চাহিদা মিটে। এছাড়া আর কোন পানির উৎস এখানে নেই। আমরা অনেক কষ্টে সেই পানি দিয়ে হাত মুখ ধুলাম, গোসল সারলাম। তারপর ফিরে এলাম ঘরে। গাইড আমাদের জন্য নুডলস রান্না শুরু করে। সেগুলো খেয়ে আমরা রেস্ট নেই। এতো লম্বা হাঁটা পথের ক্লান্তি যে কীভাবে দূর হবে সেটাই ভাবছিলাম। পায়ে ভালো করে তেল মালিশ করি। যেখানে যেখানে ব্যাথা হওয়ার সম্ভাবনা সেখানে মুভ দেই।


ক্লান্তিতে কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ি। প্রায় ১ ঘন্টা পর আমাদের টীমের কয়েকজন আমাকে ডেকে তুলে। এরপর রাতের খাবার খাই। এই পাড়ার আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল এখানের টয়লেটের অবস্থা! নিচ দিয়ে ফাঁকা। কেউ ওয়াশ রুমের দিকে হাটা দিলে দুই তিনটা শুকর সেই ওয়াশরুমের নিচে চলে যায়। ফাঁকা স্থান দিয়ে তাকিয়ে থাকে উপরে !
রাতে খেয়ে আমরা দ্রুত শুয়ে পড়লাম। কাল আমাদের আরো লম্বা হাঁটা। যেতে হবে সাইংপ্রা ঝর্নায়।