ঘুরে-বেড়াতে কমবেশি সকলেরি খুব ভাল লাগে । এমন কাউকে খুজে পাওয়া যাবে না যিনি ঘুরে-বেড়াতে পছন্দ করেন না। ঘরের বাহির হওয়া মানেই বাঁধন ছিড়ে আকাশে ডানা মেলে উড়া। যান্ত্রিক যুগে একি ছাদের নিচে বসবাস করেও মানুষ অনেকসময় খুব একা। অনেকেই নিজের মতো আলাদা রুমে বা হাতে মোবাইল ফোন টেপাটিপি করেই সময় কাটিয়ে দেয়। এমন টানাপোড়েনের যুগে পরিবারের সাথে সময় কাটানো বা ঘুরে-বেড়ানো হচ্ছে উত্তম উপায়। একজন একজনকে খুব আপন করে কাছে পাওয়া যায়।
অস্ট্রেলিয়া একটি মহাদেশ। দেশটির মধ্যেখানে রয়েছে মরুভুমি আর চারিদিকে ঘিরে রয়েছে সমুদ্র সৈকত। তাইতো সমুদ্রেকে কেন্দ্র করেই এদের বসবাস গড়ে উঠেছে। প্রতিটি জায়গাই অনন্য সুন্দর। এবার আমরা কয়েকটি জায়গায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। ভিক্টোরিয়ার গ্রামীণ পরিবেশে অবস্থিত জায়গাটির নাম “ভেনাস বে”। লোকমুখে শুনেছি, এটি এখনও নাকি মানুষের কাছে ওতো পরিচিতি লাভ করেনি। দেখেশুনে মনে হোল এই জায়গাটি এখনও অনেকের কাছে অজানা রয়েছে। এলাকাবাসীর মুখে শোনা, ইদানিং অনেক মানুষ এখানে আসতে শুরু করেছে। মেলর্বোন সিটি থেকে যেতে সময় লাগবে খুব বেশি হলে আড়াই ঘন্টা। আমাদের বাড়ি থেকে সময় লাগেছিল দুই ঘন্টা। যাবার পথটাও দারুণ সুন্দর, সাউথ গিপসল্যান্ড হাইওয়ে ধরে গেলে ডানদিকে ফিলিপ আইল্যান্ড ফেলে সোজা যেতে থাকলে আরও একটি অদ্ভুত সুন্দর শহর আপনাদের চোখে আটকে যাবে। শহরটির নাম কিলকুন্ডা। বীচ, আর কিছু বাড়িঘর ছারা তেমন কোনকিছুই দেখার নেই সেখানে । কিন্তু মনোরম পরিবেশ সকলকে মুগ্ধ করবে। হাইওয়ের একদিকে অল্পকিছু বাড়ি, দুএকখানা দোকান তারপরে যেদিকে চোখ যায় শুধু ধুধু মাঠ। অন্যদিকে রয়েছে সাগর তার পাড় ঘেসেও রয়েছে কিছু বাড়িঘর। এখানকার মানুষের বাজার করতে বোধহয় যেতে হয় ওঁনথাগ্গি, সান রেমো অথবা ইনভেরলচ।

প্রকৃতি ছুয়ে দাড়িয়ে রয়েছে এই কিলকুন্ডা। তবে দেখে মনে হোল মেলবোর্ন থেকে আসা টুরিস্ট এখানে খুব একটা থামে না একটানে চলে যায় ওঁনথাগ্গি, ফিলিপ আইল্যান্ড অথবা ইনভেরলচ। ওঁনথাগ্গি এই এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বড় একটি টাউন । তবে টুরিজমের দিক থেকে ইনভেরলচ শহরটির নাম রয়েছে অনেক । এটা নিয়ে পরে কোন এক সময় আবার লিখব। যাহোক কিলকুন্ডা তে রয়েছে পাশাপশি দুটো চমৎকার বীচ। প্রথমটি পাথরে ঘেরা বাচ্চারাদের সুইমিং এর জন্য বেশ উপযোগী। অন্যটিতে বড়রা ঢেউয়ের সাথে তাল মিলিয়ে সার্ফিং করতে ব্যাস্ত। আমরাও লোভ সামলতে না পেরে গাড়ি থামিয়ে নেমে পরলাম। নাতি জায়দান আর নাতনী ইউসরা নুনা পানিতে ঝাপিয়ে পরলো। আমরাও পা ভিজিয়ে দাড়িয়ে রইলাম, উঠতে মন চাইছিল না । ইতিমধ্যেই দেখি দুপুর গড়িয়ে সূর্য তার সোনালী আভা ঢেলে শহরটিকে রাঙিয়ে তুলেছে। মনে হচ্ছিল পুরো আকাশ নেমে এসে শহরটিকে ভালবেসে আলিঙ্গন করে রেখেছে। চোখের পলকে জায়গাটির রুপ বদলে গেলো। উচু পাহড়ের গা ঘেষে দুচারটে দোকাপাট। পাহড়ের চুড়ার উপরে দাড়িয়ে থাকা বাড়ি আর সাগরের নীল পানি। নিচে নেমে গেছে সরু পথ সেখান দিয়ে কানে ভেসে আসবে শুধু গর্জন। সমুদ্রের তলদেশ থেকে নানান ধরনের নানান রঙের ঝিনুক পাথর নিয়ে নুনা পানি এসে আছড়ে পরছে ডাঙায়। সব মিলিয়ে মুগ্ধতায় ভরপুর, মহা শান্তির একটি জায়গা এই কিলকুন্ডা। যেখানে গেলে মন প্রান জুড়িয়ে যাবে, মনে যদি কোন ব্যাথা থাকে তাও ধুয়েমুছে পরিস্কার হোয়ে যাবে।
কিলকুন্ডা থেকে আরও একঘন্টা ড্রাইভ করলে ভেনাস বে। তার আগে পরবে তারউইন নদী। তারউইন নদী থেকে ভেনাস বে এর দুরত্ত পাঁচ কিলোমিটার। তারউইন নদী-ও খুব সুন্দর একটি জায়গা। নাম শুনেই বুঝতে পারছেন এই জায়গাটিকে জড়িয়ে রেখেছে অনেক বড় একটি নদী। তেমন কোন দোকাপাট বা বাড়ি ঘর চোখে পরল না। শুধু ক্যাম্পিং এর জায়গা পাবলিক টয়লেট, ছোট একটি হোটেল রয়েছে সেখানে, এখানে অনেকেই মাছ ধরতে আসেন । তারউইন নদী এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ মস্ত বড় এই নদীটি । পুরো নদীর পাড় জুরে জায়গায় জায়গায় মানুষের বসে মাছ ধরবার জন্য চমৎকার ব্যাবস্থা রয়েছে । কেউ কেউ আবার মাছ ধরে সেখানেই বারবিকিউ করে খাচ্ছে। যারা মাছ ধরতে পছন্দ করেন তাদের জন্য জায়গাটি শুধু সুন্দর বললে ভুল হবে, এক কথায় চমৎকার। যদিত্ত অনেককিছু করারার বা দেখবার না থাকলেও শহরের কোলাহল থেকে দুদিন গিয়ে বেড়িয়ে আসলে মন ভাল হোয়ে যাবে নিচিৎ।
ভেনাস বে ভিক্টোরিয়ার অনেক ছোট টাউনের মধ্যে একটি। টাউন বলতে ঔষধের দোকান সহ খাবারের দোকান, পিজা, ক্যাফে, চুল কাটার দোকান আর দুটি রিয়েল এস্টেটে এজেন্ট এর অফিস চোখে পরলো। আরও রয়েছে হোটেল, মোটেল এবং ক্যারাভান পার্ক। এই জায়গাটিতে বাড়ি ঘরের তুলনায় দোকাপাট নাই বললেই চলে। ছোট এই শহরটিকে কেন্দ্র করে গরে উঠেছে মানুষের সমাগম। শীতের পাখিদের মতন ছুটিছাটায় মানুষ এসে ভির করে এখানে। তবে এই ভেনাস বে এর আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্য সাধারণ কোনো শহরে পাওয়া যায় না। শহরটিতে ঢুকতেই শুধু সমুদ্রের শো-শো শব্দ কানে ভেসে আসে। এইটুকু ছোট টাউনকে ঘিরে রয়েছে পাচটি ধবধবে সাদা এবং সোনালী বালুর সমতল বীচ। বীচ এক, দুই, তিন, চার, পাচ এমন নামে। একটি বীচ থেকে অন্যটির দুরত্ত এক থেকে দুই কিলোমিটার পথ। আমার কাছে মনে হয়েছে এই প্রথম এমন একটি জায়গার দেখা পেলাম এর আগে এমনটি দেখিনি। আমরা মাত্র কয়েক ঘন্টার জন্য গিয়েছিলাম। সবকটা বীচ ঘুরে দেখতে পারিনি হয়তো সঠিক বর্ণনা দিতে পারলাম কিনা জানিনা, অনেক কিছুই অজানা রইল। জায়গাটিকে জানতে হোলে তার সাথে প্রানের বন্ধন গড়তে হলে দুদিন গিয়ে থাকা অবশ্যই জরুরি ।
যারা ভ্রমণ পিয়াসী তারা অবশ্যই সেখানে যাবেন এবং উপভোগ করে আসবেন। ভেনাস বে এর প্রতিটি বীচ প্রতিটি জায়গায় পা ফেলে ঘুরে দেখে এসে আবারও লেখার ইচ্ছা রইল। আগেই বলেছি বীচ অস্ট্রেলিয়ার সবখানেই আছে, তবে এটা আমার কাছে আলাদা মনে হয়েছে। একবার গিয়ে দেখে আসুন, আপনারও খুব ভাল লাগবে নিশ্চয়ই ।
ঘুরতে সময় ছবি তোলা হয়নি, সালাহউদ্দিনকে ছবিগুলোর জন্য অনেক ধন্যবাদ।